মাথা তুলে দাঁড়ানো সেই মানুষ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা চার কোটি বাঙালির মধ্যে কেবল এই একজনই মানুষ সৃষ্টি করেছেন! আমাদের এই অপমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না।’

অনেক বছর পরে ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাসাগরের উপর দেয়া বক্তৃতায় বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক বিনয় ঘোষ বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজে , দেবতার চেয়ে অনেক বেশি দুর্লভ মানুষ। তপস্যা করে জীবনে দেবতার দর্শন পাওয়া যায়, কিন্তু সহজে এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না যিনি মানুষের মতো মানুষ। তাই যখন দেখতে পাই বিদ্যাসাগরের মতো একজন মানুষ পর্বতের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন  কোনো অতিমানবিক অলৌকিক শক্তির জোরে নয়, সম্পূর্ণ নিজের মানসিক শক্তির জোরে , তখন বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতে হয়। ‘

এই মানুষটি ২০২০ সালে তাঁর জন্মের দুই‘শ বছর অতিক্রম করবেন। ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজের নামের জায়গায় স্বাক্ষর করতেন ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা। তাঁর স্বাতন্ত্র্যবোধ ছিলো তীব্র। অনেকে বলেন, জীবনের মহত্তজ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন বলেই তার চরিত্রের মেরুদণ্ডটি ছিলো এত দৃঢ়। এই বিদ্রোহী মানুষটি একটি সময়ের সমাজের কাঠামোকে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করেছিলেন, পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন।

‘নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে, ক্লীবে চ পতিতে পতৌ’

অর্থাৎ, স্বামী নিখোঁজ বা মৃত্যুবরণ করলে কিংবা নপুংসক বা পতিত হলে স্ত্রী আবার বিয়ে করতে পারেন।

বিদ্যাসাগর সংস্কৃত এই বাক্যটি পেয়েই বলে উঠেছিলেন, ‘পেয়েছি পেয়েছি’। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যিনি ঊনিশ শতকের সমাজ সংস্কারক, যিনি এনেছিলেন নবজাগরণের আলো। তাঁর অন্যতম এক সংস্কারকাজ ছিলো বিধবা বিবাহ প্রচলনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

সেসময় তিনি রাত দিন একাকার করে শাস্ত্র পড়তেন। একদিন বিদ্যাসাগরের মা ভগবতীদেবী প্রতিবেশী এক কিশোরী কন্যার অকালে বৈধব্য দেখে, আকুল হয়ে পুত্রের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিধবাদের বাঁচার কি কোনো উপায় আছে?

বিদ্যসাগর জানান, বিধবাদের বিয়ে শাস্ত্র সিদ্ধ। তিনি এই বিষয়ে লিখবেন কিন্তু সমাজে বেশ একটা হট্টগোল হতে পারে এনিয়ে। কারণ, বিধবারা আবার বিয়ে করবে, কোনো পুরুষ বিধবা নারীকে বিয়ে করবে- একথা সেইসময়কার সমাজে কেউ ভাবা দূরে থাক, কল্পনাতেও বোধহয় আনতে পারতো না।

বিধবা বিবাহ প্রচলনের প্রতি বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত উপলব্ধি জন্মায় সম্ভবত আরো আগে। ছোট বেলায় গ্রামে রাইমনি নামে এক সঙ্গী ছিলো তার। রাইমনির বিয়ে হয়ে গেল খুব অল্প বয়সেই৷ স্বামীর বাড়ি চলে যায় সে। কিছু বছর বাদে রাইমনি বিধবা হয়ে গ্রামে ফিরে আসে একমাত্র ছেলে গোপালকে সঙ্গে নিয়ে।

বিদ্যাসাগরও একদিন গ্রামে ফিরে দেখলেন রাইমনি ফিরে এসেছে কিন্তু তার মুখে স্থায়ী বিষণ্ণতার ছাপ। বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করলেন, হিন্দু বিধবা নারীদের বৈধব্য থেকে মুক্তি দিতে হলে, পুনর্বিবাহ দেয়া ছাড়া গতি নেই।

বিদ্যাসাগর তখন দিনরাত পড়শোনা করতেন। শাস্ত্র পড়তে গিয়েই তিনি সেই সংস্কৃত বাক্যটি খুঁজে পেয়েছিলেন। সেটা ১৮৫৩ সালের কথা।

পরের বছর, সময়টা যখন ১৮৫৪ সাল, ডিসেম্বর মাসে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে “সমাজোন্নতি বিধায়িনী সুহৃদ সমিতি” নামক সভা হয়। সেই সভায় হিন্দু বিধবার পুনর্বিবাহ, বহুবিবাহ রোধ ও বাল্যবিবাহ বর্জন নিয়ে কিশোরীচাঁদ মিত্রের প্রস্তাব ওঠে। অক্ষয়কুমার দত্ত প্রস্তাব সমর্থন করেন। প্রস্তাবের প্রতিলিপি পাঠানো হয় বৃটিশ লিগ্যাল কাউন্সিলে।

১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয় বিদ্যাসাগরের বইটি। বিধবা বিবাহ নিয়ে লেখা তার প্রথম বইয়ের দুই হাজার কপি অল্পসময়ে শেষ হয়ে যায়। এই বই নিয়ে বেশ আলোড়ন তৈরি হয়। সংস্কারবিরুদ্ধ সমাজ থেকে প্রতিবাদ আসে। সমালোচনা আসে। বিদ্যাসাগরও পালটা জবাব চালিয়ে যেতে থাকেন।

সেবছরই অক্টোবরে ৯৮৬ জনের সই নিয়ে বিদ্যাসাগর সরকারের কাছে বিধবা বিবাহ প্রচলনের দাবি তোলেন।  সমাজ যেন দুইভাগে ভাগ হয়ে গেলো। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও বিদ্যাসাগরের বিপক্ষে ছিলেন তখন। সমালোচনার তীর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে বিদ্যাসাগরের দিকে।

কিন্তু এই আন্দোলনও থেমে ছিলো না। ১৮৫৬ সালে বর্ধমান থেকেও বিধবা বিবাহের সমর্থকদের আবেদন গেলো সরকারের কাছে। বর্ধমানের রাজা মহতাব সিং বিদ্যাসাগরের পক্ষে সই করলেন। দীনবন্ধু মিত্র, প্যারিচাঁদ মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখও বিদ্যাসাগরের পক্ষে প্রস্তাব সমর্থন দিয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেন।

কিন্তু, প্রতিবাদে বিরোধী পক্ষের সই পড়লো আরো বেশি। সতর্ক করা হলো এই বলে, বিধবা বিবাহ চালু হলে ভারতে ধর্মদ্রোহ হবে।

ইংরেজ শাসনামলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর “বিধবা বিবাহ আইন” পাশের জন্যে মাত্র ৯৮৭ টি স্বাক্ষর পেয়েছিলেন। অথচ সেই সময় তার বিপরীতে বিধবা বিবাহ বিরোধী গণ-মানুষের স্বাক্ষর পড়ে ৩৬,৭৬৩ টি। তখন বিধবা বিবাহের বিরোধী শিবিরের অন্যতম মানুষ রাধাকান্ত বিধবা বিবাহ সমর্থন না করলেও বিদ্যাসাগরের যুক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে একখানা শাল উপহার দেন।

কিন্তু, তারপরেও ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই সরকার বিধবা বিবাহ অনুমোদন দিয়ে আইন পাশ করে। লর্ড ডালহৌসি আইন প্রণয়ন করে বিধবা বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের সময় তার বাবা বাড়িতে ছিলেন না। তিনি পাশের গ্রামে হাটে গিয়েছিলেন। ছেলেকে এই সুসংবাদ জানাতে উৎফুল্ল ঠাকুর্দা ছুটলেন হাটের দিকে। পথিমধ্যে ছেলের সাক্ষাৎ পেয়ে বললেন, আমাদের একটি এড়ে বাছুর হয়েছে। সে সময় বাড়িতে একটি গরু ছিলো; তারও দু’একদিনের মধ্যে প্রসবের সম্ভাবনা ছিলো বিধায় বিদ্যাসাগরের বাবা সে কথা বিশ্বাস করে বাড়িতে ঢুকেই গোয়াল ঘরের দিকে চললেন। তখন বিদ্যাসাগরের দাদু ছেলেকে থামিয়ে রহস্যের হাসি দিয়ে ওদিকে নয়, এদিকে এসো, আমি তোমাকে এড়ে বাছুর দেখিয়ে দিচ্ছি বলে সূতিকাগৃহে নিয়ে গিয়ে সদ্য জন্ম নেওয়া ঈশ্বরচন্দ্রকে দেখান।

‘পিতামহদেব পরিহাস করিয়া আমায় এড়ে বাছুর বলিয়াছিলেন। তিনি সাক্ষাৎ ঋষি ছিলেন। তাহার পরিহাস বাক্যও বিফল হইবার নহে। আমি যে ক্রমেই এড়ে গরু অপেক্ষাও একগুয়ে হইয়া উঠিতেছিলাম তাহা বাল্যকাল হইতেই আমার আচরণে বিলক্ষণ আবির্ভূত হইত।’ পরে নিজের বিষয়ে বিদ্যাসাগর এরকম লিখেছিলেন। তাদের  পরিবারের খ্যাতি ছিলো, কিন্তু আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিলো না। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বাবা ঠাকুরদাসকে অল্পবয়সেই বীরসিংহ গ্রাম ছেড়ে অর্থ উপার্জনের জন্য কলকাতায় যেতে হয়। ছেলেবেলায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র।

এক সময়ে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন হন। সাধারণত তিনি ছাত্রদের শারীরিক শাস্তি দান পছন্দ করতেন না। তিনি প্রায়ই ক্লাস চলাকালীন সময়ে টহল দিয়ে বেড়াতেন। একদিন দেখলেন, এক অধ্যাপকের টেবিলের উপর একটি বেত রাখা। তিনি অধ্যাপককে আড়ালে ডেকে ক্লাসে বেত নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলেন। অধ্যাপক বললেন, ম্যাপ দেখানোর সুবিধার জন্য ওটি নিয়ে গিয়েছি। বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, বুঝেছি, রথ দেখা এবং কলা বেচা দু’টোই হবে। ম্যাপ দেখানোও হবে। আবার প্রয়োজন হলে ছেলেদের পিঠে দু’ঘা বসানোও যাবে। কী বলেন? একথা শুনে অধ্যাপক মাথা হেট করে রইলেন।

একদিন ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগরের কাছে এক গোড়া ব্ৰাহ্মণ দেখা করতে এসেছেন। সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের কেউই এই অপরিচিত ব্ৰাহ্মণকে প্ৰণাম করলেন না। এই ব্যবহারে ব্ৰাহ্মণ অপমানিত বোধ করলেন। অপমানের জ্বালা মেটাতে উপস্থিতদের লক্ষ্য করে বললেন, এইসব অর্বাচীনদের মনে রাখা উচিত যে, ব্ৰাহ্মণেরা বর্ণশ্রেষ্ঠ, বেদজ্ঞ। এক সময় তারা দেশ ও ধর্মের কল্যাণ সাধন করেছেন। তারা সব সময় সকলের প্ৰণম্য । একথা শুনে বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, পণ্ডিত মশাই, শ্ৰীকৃষ্ণ একদিন বরাহরূপ (শূকরের চেহারা) ধরেছিলেন বলেই কী ডোমপাড়ায় যত শূকর আছে, তাদের প্রণাম করতে হবে?

রসিক মানুষ ছিলেন বিদ্যাসাগর। তার চরিত্রের কঠিন দিকের সঙ্গে সেই রসিক মানুষটির উপস্থিতিও ছিলো। একবার কোনো এক সাব-জজ প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর পুনরায় বিয়ে করলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে বললেন, তোমার তো মরার পরেই স্বৰ্গবাস!
কেন?
আমরা মরলে কিছুদিন নরক যন্ত্রণা ভোগ করে তারপর স্বর্গে যাব। কিন্তু তুমি এখন নরক ভোগ করবে। ফলে মরার পর সরাসরি স্বৰ্গে যাবে।

রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিদ্যাসাগরের বাড়িতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য নাস্তিক থেকে বিদ্যাসাগরকে ধর্মের পথে আনা। রামকষ্ণের সঙ্গ অসহ্য ঠেকেছিলো বিদ্যাসাগরের। রামকৃষ্ণ খাতির জমাতে বিদ্যাসাগরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি সাগরে এসেছি, ইচ্ছা আছে কিছু রত্ম সংগ্রহ করে নিয়ে যাব’। বিদ্যাসাগর বিরক্ত হয়ে উত্তর করলেন, ‘আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হবে বলে তো মনে হয় না, কারণ এ সাগরে কেবল শামুকই পাবেন’।

এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে পরে রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এমন কি তাঁর (বিদ্যাসাগরের) নিজের মোক্ষলাভের জন্য ভগবানের নাম করবারও কোন স্পৃহা নেই, সেইটা বোধ হয় তাঁর সবচেয়ে বড় ত্যাগ। অন্য লোকের উপকার করতে গিয়ে তিনি নিজের আত্মার উপকার করার প্রয়োজন অগ্রাহ্য করেছেন।

একবার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। বিদ্যাসাগরের প্ৰিয় শখ ছিলো বই পড়া এবং সেগুলো যত্ন করে। বাধাই করে রাখা। এ কাজে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয়ও করতেন। ভদ্রলোক বইগুলো দেখে বললেন, এরূপ এত খরচ করে বইগুলো বাঁধিয়ে না রাখলেও হতো।

কেন? এতে দোষ কী? ওই টাকায় অনেকের উপকার হতে পারতো। বিদ্যাসাগর তামাক খেতে খেতে ভদ্রলোকের শাল লক্ষ্য করে বললেন, আপনার শালটি চমৎকার। কোথেকে, কত দিয়ে কিনেছেন? শালের প্রশংসা শুনে ভদ্রলোক উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন, শালটি পঁচিশ টাকায় খরিদ করা। বিদ্যাসাগর সুযোগ পেয়ে বললেন, পাঁচ সিকের কম্বলেও তো শীত কাটে, তবে এত টাকার শালের প্রয়োজন কী? এ টাকায়ও তো অনেকের উপকার হতে পারতো।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একদিন ট্রেনে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। সহযাত্রী এক ইংরেজ যুবক বিদ্যাসাগরের বেশভূষা দেখে ভীষণ চটে গেল। বিদ্যাসাগর একসময় বাথরুমে গেলে সাহেব তার ময়লা চাদর জানালা দিয়ে ফেলে দিলেন। ফিরে এসে বিদ্যাসাগর চাদর খুঁজে না পেয়ে সবই বুঝলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর ইংরেজ যুবক তাঁর কোটটি রেখে বাথরুমে গেলে বিদ্যাসাগরও একই কাজ করলেন। ফিরে এসে সাহেব নিজের কোটটি যথাস্থানে দেখতে না পেয়ে বিদ্যাসাগরকে জিজ্ঞেস করলেন। হোয়ার ইজ মাই কোট?

বিদ্যাসাগর নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলেন, ইওর কোট হ্যাজ গন টু ব্ৰিং মাই চাদর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর খদ্দরের চাদর পরতেন। শীত বা গ্রীষ্ম যাই হোক না কেন গায়ে শুধু চাদর আর কাঠের খড়ম পরেই চলাফেলা করতেন।

এক বিয়ে বাড়িতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দেখা হয়ে গেলো। বিদ্যাসাগরের পায়ে যথারীতি সেই তালতলার শুড়তোলা চটি। বঙ্কিমচন্দ্র তাই দেখে ঠাট্টা করে বললেন, মহাশয় আপনার চটির শুড় তো বেঁকে ক্রমশ ওপর দিকে উঠছে। শেষ পর্যন্ত আকাশে গিয়ে না ঠেকে!
কী আর করা যাবে বলো! জানোই তো, চটি যত পুরনো হয় ততই বঙ্কিম হয়ে উঠতে থাকে, বিদ্যাসাগর হাসতে হাসতে জবাব দিলেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের আর্থিক অনটনের সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন। একদিন এক মাতাল বিদ্যাসাগরের কাছে সাহায্য চাইতে এলে তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন, আমি কোনো মাতালকে সাহায্য করি না। কিন্তু আপনি তো মধুসূদনকে সাহায্য করেন। তিনিও তো মদ্যপান করেন। ঠিক আছে, তুমি ওর মতো ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য লিখে আনো। তোমাকেও সাহায্য করবো।— বিদ্যাসাগর শর্ত জুড়ে দিলেন।

পুরুষশাসিত সমাজে প্রতিপদে, প্রতিনিয়ত নিগৃহীত নারীদের জীবন বদলাতে চেয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। আর দশটা মানুষের মতো নারীদেরও যে বাঁচার অধিকার আছে, তারাও যে মানুষ- সেটা সমাজকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে নিরলস কাজ করে গেছেন এই মানুষটি।

বিধবাকে নিরামিষ খেয়ে জীবনের সব ভুলে চলে যাওয়ার পরিণতিকে মেনে নেন নি ভীষণ আধুনিক , মানবিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । তাই তো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘যে দেশের পুরুষের দয়া নাই ,ধর্ম নাই , ন্যায় -অন্যায় বিচার নাই হিতাহিত বোধ নাই ,সুবিবেচনা নাই … আর যেন সেদেশে অবলাজাতি জন্মগ্রহণ না করে।’

শিক্ষা দীক্ষায় অনগ্রসর জাতি যে কোনদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না, বিদ্যাসাগর সর্বাগ্রে তা বুঝে নিয়েছিলেন। আর তাই শিক্ষার উন্নয়নে কেবল নিজের সর্বস্বই দান করেননি, তৎকালীন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য তিনি নিজে হাতে থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলেছেন।

একবার অযোধ্যার নবাব কাছে চাঁদা চাইতে গেলে নবাব তাকে অপমান করে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তার পায়ের জুতাটি বিদ্যাসাগরের চাঁদার ব্যাগে ঢুকিয়ে দেন। বিদ্যাসাগর বিন্দুমাত্র রাগ করেননি সেদিন, ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসেন। পরদিন তিনি নবাবের বাড়ির সামনেই তার জুতা বিক্রির নিলাম শুরু করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে গেছেন বাঙ্গালীদের। করেছেন সমাজ সংস্কার, বৈধ করেছেন বিধবা বিবাহ এবং বাংলা লিপি সংস্কার করে তিনি রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য ‘বর্ণপরিচয়’সহ একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। আর তাইতো বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার হিসেবে তাঁকেই বিবেচনা করা হয়।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]