মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাকরিবাকরি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৃত্যুর পর তাঁর ভাগ্যে প্রচুর ফুল জুটেছিলো। মৃত্যুর আগে লড়াই করেছেন দারিদ্র্য আর অসুখের সঙ্গে। কিন্তু খাঁটি লেখক হয়ে ওঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আপোষ করেননি কখনোই। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কথাসাহিত্যের টিমটিমে আলোর যুগে উচ্চমাত্রার এক বিদ্যুতপ্রবাহ।

ভয়ানক অর্থকষ্ট ছিলো তাঁর সঙ্গী। কিন্তু পরিপূর্ণ লেখক হওয়াই ছিলো অন্বিষ্ট। তাই বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও স্থায়ী ভাবে চাকরি করেননি। জেদ ছিলো রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের নামের পাশে নিজের নামটিও উচ্চারিত হবে, সফলও হয়েছিলেন। শোনা যায়, একবার চাকরির আবেদন করেও তিনি আবেদনপত্র প্রত্যাহার করে নেন, কারণ জানতে পারেন, অন্য এক জনের সেই চাকরিটির প্রয়োজন ছিলো তাঁর চাইতেও বেশি। অথচ অর্থের অভাবে তখন নিজের চিকিৎসা পর্যন্ত ঠিক মতো করতে পারছেন না তিনি। বিয়ে করে কিছু দিনের মধ্যেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রের অন্যায় ও বৈষম্যকে সহ্য করতে পারেননি। কিন্তু বাজার করতে পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন অতিথি আপ্যায়ন করতে। ছাপাখানা ও প্রকাশন সংস্থা দিয়ে ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন, বিন্তু সে প্রকল্পেও লেখা হয় ব্যর্থতার নাম।রেসের মাঠেও বাজি ফেলে জিতছে চেয়েছিলেন জুয়ার দান।কিন্তু শেষে লেখালিখিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবিকা।

বাংলা সাহিত্যের পাঠক তিরিশের দশকে অবলোকন করেছিলেন এক ঝড়ের জন্ম আর বয়ে যাওয়াকে। ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন সাহিত্যের এই অবিস্মরণীয় অগন্তুক। তাঁর ৬৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘মানিকের চাকরিবাকরি’।

প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক শঙ্খ ঘোষ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়ের স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে,

‘মানিক বন্দোপাধ্যায় কি আছেন?

: বাজারে গেছেন।

লেখক আবার বাজারও করে! বিস্মিত সেই তরুণ।

: কিছু বলবেন?

: না, আমি এই মাঠটায় একটু ঘুরে বেড়াই। উনি ফিরলে কথা বলছি তাহলে।

দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। প্রায় আধঘণ্টা মাঠে চক্কর দেওয়ার পর সে দেখলো, একজন লম্বা কালোপানা মানুষ লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে, দুই হাতে দুই থলে নিয়ে ওই বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

ইনিই মানিকবাবু নাকি? গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এল সে-ও।

মানিক তাকে আড়চোখে দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন?’

: হ্যাঁ।

: আসুন ভেতরে। আমি বাজারটা রেখে দিয়ে আসছি,’ বলে মানিক চলে গেলেন ভেতরের ঘরে।

সামনের ঘরের চৌকিতে ছেলেটি বসলো। চারদিকে তাকিয়ে দেখলো ঘরে ওই চৌকি ছাড়া আছে একটা নড়বড়ে টেবিল। ব্যস, আর কিছুই নেই!। এমনকি টেবিলের ওপরেও কোনও বইখাতা রাখা নেই।

মানিক ভেতরের ঘর থেকে ফিরে এসে বললেন, ‘বলুন কী চান? গল্প? পত্রিকা করেন বুঝি?’

কী ভাবে কথা শুরু করবে বুঝে পাচ্ছে না সেই যুবক।

মানিক তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ভাবছেন? ভাবছেন যে একজন লেখকের ঘর এমন ফাঁকা কেন? আপনারা পাঠকেরা কিছু দেন না সেইজন্য ফাঁকা। ভাবছেন যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে হাতে বাজার করেন কেন?’

ছেলেটি হতবাক। ঠিক এই কথাগুলোই তো ভাবছিলো। মানিক জানলেন কী করে!

মানিকই উত্তর দিলেন, ‘না করে আর উপায় কী বলুন। লিখবার সময় পেতে হলে এসবের জন্য যে কোনও ঝি-চাকর রাখব, সে-রকম টাকা কে দেবে আমাকে? দেন কি আপনারা? পড়েন কি কেউ আমার লেখা? আপনি যে এসেছেন এখানে? আমার কোনও লেখা কি পড়েছেন?’

অমন কথা শুনে মনে মনে বেজায় অপমানিত হলো যুবক। কী বলছেন উনি? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পড়িনি! মুখে বললো, ‘পড়েছি অনেক।’

‘তাতে কী সুবিধে হলো? কোনও বই কিনেছেন?’ চাঁচাছোলা গলায় ফের প্রশ্ন করলেন মানিক।’

তখন তাঁর পড়াশোনার যাবতীয় খরচ চালাতেন বড়‘দা। ভাইয়ের রাজনীতি করার খবর পেয়ে চিঠিতে লিখলেন, ‘তোমাকে ওখানে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়েছে, ফেল কেন করেছ, তার কৈফিয়ত দাও।’

উত্তরে মানিক লিখলেন, গল্প উপন্যাস পড়া, লেখা এবং রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

প্রচণ্ড রেগে গিয়ে দাদা বললেন, ‘তোমার সাহিত্য চর্চার জন্য খরচ পাঠানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন দাদা।

উত্তরে মানিক লিখলেন, ‘আপনি দেখে নেবেন, কালে কালে লেখার মাধ্যমেই আমি বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে স্থান করে নেব। রবীন্দ্রনাথ- শরৎচন্দ্রের সমপর্যায়ে আমার নাম ঘোষিত হবে।’

ষোলো বছর বয়েসে মাকে হারানোর পর এমনিই জীবন হয়ে উঠেছিলো ছন্নছাড়া, এবার দাদা টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ায় শুরু হলো  দারিদ্রের সঙ্গেই তাঁর লড়াই।

সে দারিদ্র্যের যে কী ভয়ংকর তা জানা যায় মানিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টালে। স্ত্রী ডলি অর্থাৎ কমলা এক মৃত সন্তানপ্রসব করেছেন, আর মানিক ডায়েরিতে লিখছেন, ‘‘বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অখুশি নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বললো, বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।’’

সংসারের এমন অবস্থায় তিনি আবার ঠিক করলেন চাকরি করতে হবে। ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকায় সাপ্তাহিক বিভাগের জন্য সহকারী সম্পাদক প্রয়োজন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আবেদন করলেন।

জানতেন ওই পদের জন্যই আবেদন করবেন আরেক সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামী। তাই নিজের আবেদনপত্রের শেষে সম্পাদককে লিখলেন, ‘‘আমি অবগত আছি শ্রীপরিমল গোস্বামী এই পদটির জন্য আবেদন করিবেন। আমার চেয়েও তাঁহার চাকুরির প্রয়োজন বেশি। মহাশয় যদি ইতিমধ্যে তাহার সম্পর্কে অনুকূল বিবেচনা করিয়া থাকেন, তবে অনুগ্রহপূর্বক আমার এই আবেদন প্রত্যাহার করা হইলো বলিয়া ধরিয়া লইবেন।’’

চাকরি অবশ্য তারই হয়েছিলো। মাস শেষে বেতন ৮৫ টাকা। সঙ্গে শর্ত ‘অমৃতস্য পুত্রা’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। তার জন্য পাবেন আরও ১০ টাকা মাসপ্রতি। কিন্ত এত আয়োজন চাকরির ভেস্তে গেলো। মানিকবাবু তো চাকরি করার মানুষ নন। কিছুদিন পরেই সোজা ইস্তফা দিয়ে আবার রাস্তায়।  অভাবের ধারাবাহিক ক্রোধ ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে তাকে আর তার মধ্যেই লিখে চলেছেন তিনি। কখনো তাঁর দেখা মিলছে  বামপন্থী ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের আন্দোলনে যুক্ত হয়ে মিছিলে। আবার হয়তো নিজের লেখা গল্প পাঠ করছেন সংঘের অফিসে বসে। সংঘের সিঁড়ি পর্যন্ত তখন শ্রোতার ভিড়।আবার কখনও একাই প্রাণের মায়া ভুলে একাই ঝাঁপিয়ে পড়ছেন কলকাতার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা রুখতে।

পৈতৃক বাড়ি বিক্রির পর যে আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন, তার পুরোটাই পার্টিকে দান করে দিয়েছিলেন। তাঁর শেষজীবন কেটেছিলো একটা ভাড়াবাড়িতে। সেখানে মৃত সন্তান প্রসব করা অসুস্থ স্ত্রী, বৃদ্ধ পিতার দায়দায়িত্ব ক্রমেই তাঁর উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। নানান সরকারি আমন্ত্রণ, এমনকি চাকরির প্রস্তাবও সেই সময় প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধার জন্য বর্জন করা বা লুকিয়ে রাখা তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিলো।

অথচ টাকার চিন্তায় বারংবার অস্থির হয়ে উঠেছেন তিনি। জানতেন, একটা দিন কাজ করতে না পারলে তাঁর সংসার চলবে না। প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, তবু পাওনা টাকা আদায় করতে পারেননি। লংক্লথের পাঞ্জাবি, ধুতি আর চটি, এই ছিলো তাঁর পোশাক। বাড়িতে লুঙ্গি আর খড়ম পরতেন। সস্তা এক জোড়া টেবিল-চেয়ারে বসে লিখতেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯৫০ সালে কমিউনিস্টদের ওপর নেমে এল চূড়ান্ত সরকারি দমননীতি।  তখন বহু পত্রপত্রিকায় মানিকের লেখা ছাপানো বন্ধ করে দেওয়া হলো। আরও ভয়ংকর হয়ে দেখা দিলো সঙ্কট।তখন গোটা পরিবারের বেহাল অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে উঠতেন তিনি। নিজের ডায়েরিতে সে অস্থিরতার প্রমাণ আছে। তখন মদ্যপানের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছিলো আর বাড়ছিলো শরীরের ক্ষয়।  মদ ছাড়তে চেষ্টা করেও পেরে উঠছিলেন না। দাদাকে আবার চিঠি লিখলেন, কিছু টাকা ধার চেয়ে। দাদা চিঠির উত্তরে লিখলেন, আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়, আমি কাউকে টাকা ধার দিই না।

ঘনঘন অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হাসপাতালে ভর্তি, লিভার নষ্ট হতে থাকা  বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদ পুরুষ তখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। তার সঙ্গে চূড়ান্ত অনটন।

মনে মনে কতটা ভেঙে পড়েছিলেন তিনি তা জানা যায় একটি ছোট ঘটনায়।

একদিন ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় পুজো সংখ্যার লেখা দিতে যাচ্ছেন রাস্তায় দেখা হল অধ্যাপক বন্ধু দেবীপদ ভট্টাচার্যর সঙ্গে।

মানিকের ভেঙে যাওয়া শরীর, মলিন জামাকাপড় দেখে খুব খারাপ লাগল দেবীপদর। জোর করে সে দিন নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে।

ক্লান্ত মানিককে খেতে দিলেন দেবীপদর মা। বড় তৃপ্তি করে ওই খাবারটুকু খেলেন মানিক। তারপর যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন আমি শুধু সাহিত্যিকই হবো, সেই মানিকই অস্ফুটে বলে উঠলেন, ‘‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ ইন্টারনেট

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]