মানুষটার ছিলো বুকভরা সাহস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

পর্ব-৪

হুমায়ুন আজাদ

তখন তিনি ‘পাক সার জমিন সার বাদ’ লিখে রীতিমত ভীররুলের চাকে ঢিল ছুড়েছেন। যুদ্ধাপরাধী দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ মৌলবাদীরা দেশে-বিদেশে এই লেখা নিয়ে বিষ ছড়াচ্ছে। বইয়ের লেখকের বিচার-মৃত্যু চাইছে। একরাতে সরকারি তিতুমীর কলেজের মাঠে সাঈদীর বয়ান হচ্ছিলো এ নিয়ে। তখন ফেব্রুয়ারি মাস। বইয়ের মেলা বসেছে বাঙলা একাডেমিতে। আর বই মেলা মানেই মাসজুড়ে অপার প্রেমে, বিপুল আনন্দ নিয়ে তিনি থাকেন ওই আঙিনায়। মেলায় গেলেই তাকে পাই। তো সেই সন্ধ্যায় তাকে বলি, ‘স্যার, মৌলবাদীরা ওয়াজ করে আপনার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করছে, আপনার কি একটু সতর্ক হওয়া ঠিক হবে না?
তিনি সেই তাচ্ছিল্যভরা হাসি ফুটিয়ে তুললেন ঠোঁটে। পাল্টা প্রশ্ন তার-

‘তুমি কি লেখাটা পড়েছো?
-জি স্যার।

‘তোমার কাছে কি মনে হয়েছে আমি একটি কথাও অযৌক্তিক, অশালীন লিখেছি?’

-আমার মনে হয়নি।
‘তাহলে! আর শোনো, ওরা নিজেরা কিছু পড়বে না। বুঝবে না। ওদের সেই সময়ও নেই। ঢিলাকুলুপ নিয়েই ওদের সময় যাবে। ওরা আমার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না।’
বলেই বইমেলা থেকে বেরিয়ে তিনি চলে গেলেন। একা।

তখন ‘নারী’ লিখে সংবেদনশীল পাঠক মহলে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন তিনি। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আগামী প্রকাশনীর স্টলে প্রতিদিন, নিয়ম করে বসেন তিনি। গল্প করেন। অটোগ্রাফ দেন। এরমধ্যে কত কত কাণ্ড ঘটে। লেখাবাহুল্য তখনো মোবাইলফোন আর সেলফিম্যানিয়া গ্রাস করেনি পৃথিবী! একজন ’নারী’ বই কিনে অটোগ্রাফ চাইলেন তার। পাঠকের নাম জানতে চাইলে জবাব এলো, ‘মঞ্জিতা’। তিনি জানতে চাইলেন এর অর্থ। পাঠক নিজের নামের মুগ্ধতায় ভর করে বললেন, ‘স্যার, ওই যে মন যোগ জিতা’।

কে রেখেছে এই নাম? এটা ভুল।
তার এমন কথায় মুহূর্তে পাঠকের আলোভরা মুখ রঙ বদলালো।
অন্য বছরের বই মেলা। তিনি বসে আছেন। তখন বিকেল বেলা। আমি পাশে বসে দেখি তাকে। শুনি তার কথা। তার কথা বলার স্টাইল, শব্দের ব্যবহার সব সময়ই আলো ছড়ায়। তিনি প্রতিদিন, প্রতিক্ষণই নতুন কথা বলতে পারেন। তো ঠিক সেসময় এক লেখক এলেন। তার হাতে তুলে দিলেন একটা বই। গদ গদ হয়ে বললেন, স্যার আমার বই। আপনি পড়লে আমার ভালো লাগবে। অনেকটা হাসিমুখেই বইটা হাতে নিলেন তিনি। তারপর পাতা উল্ট পড়তেও লাগলেন। এরই মধ্যে বইয়ের লেখক অকুস্থল ত্যাগ করেছেন। তিনি ঠিক আধা মিনিট পরে বইটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘একটি বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায়, প্রথম বাক্যটিই ভুল- এটা পড়ি কী করে?’
তারপর তিনি বইটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, বের করো ভুলটা কোথায়?

আমি পড়া শুরু করলাম-‘তারা দুজন পরস্পর হাঁটছে’। পড়তে থাকলাম। ভুল পাচ্ছি না। তিনি বললেন, ভুল ধরতে পারছো না; তাইতো! তুমিও তো মূর্খ। পরস্পর হাঁটা যায় না। হাঁটতে হয় পাশাপাশি।

বিকাল থেকে রাত, প্রতিদিন তাকে অনেকে অনেক অনেক বই উপহার দিতেন। দিয়ে খুশি হতেন। কিন্তু তিনি ঘরে ফেরার  সময় একটি বইও সঙ্গে নিতেন না। একটি বইও তার পড়ার যোগ্য নয়; আমার আগ্রহের জবাবে বলেছিলেন একদিন।

ঠিক সেই বই মেলাতেই; আরেক সন্ধ্যাবেলা। সরকারের এক মন্ত্রী। মন্ত্রী আবার তাঁর সরাসরি ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে। মন্ত্রী, সরকারি, বেসরকারি দলবল নিয়ে বইমেলায় এসেছেন। বেরিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক যাওয়ার পথে মুখোমুখি শিক্ষকের। এগিয়ে গেলেন ছাত্র-মন্ত্রী। বললেন, স্যার আমি এবার একটা বই লিখেছি। বলেই বইটা দিলেন শিক্ষকের হাতে। তিনি বই হাতে নিয়ে সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন; ‘ভালো ভালো, তা মন্ত্রী হলে বই-ও লিখতে হয় বুঝি!’ ছাত্র-মন্ত্রী বুঝে নিলেন খুব একটা সুবিধা করা যাবে না পণ্ডিত শিক্ষকের সামনে। তাই যথাদ্রুত দৃশ্য থেকে প্রস্থান করলেন তিনি।

প্রতিদিন, প্রায় প্রতিদিন তার এসব দেখে, শুনে তাকে বলি, ‘স্যার, এই যে এভাবে সবাইকে এক ধরনের আক্রমণ করেন আপনি, ক্ষেপিয়ে তোলেন, তারাতো প্রকারান্তরে আপনার শত্রুতে রূপান্তরিত হয়।

তিনি সেই তালিচ্ছল্যভরা হাসি ফুটিয়ে তোলেন। তারপর বলেন, তাতে আমার কী আসে যায়। এরা সব মূর্খ। আর আমি কোনো মূর্খের কাছে কখনো যাই না। কোনো মঞ্চে যাই না। কোনো নেতার আনুকুল্য চাই না। এরা আমার শত্রু হলে আমার কিছুই যায় আসে না!

সেই একা, বুকভরা সাহসের মানুষটির নাম হুমায়ুন আজাদ। পণ্ডিত হুমায়ুন আজাদ। দুর্বিনীত এই মানুষটি বেঁচে ছিলেন আমাদের সময়ে; এটা আমাদের জন্যে বড় স্পর্ধার।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]