মানুষের গল্প …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): প্রত্যেকটা লোকালয়েরই গল্প থাকে। যত ছোটো লোকালয়ই হোক না কেন। সেই বসতির মানুষের দু:খ-বেদনা-আনন্দ-লড়াই….শত শত বছর…কিছু গল্প বেঁচে থাকে। কিছু গল্প হারিয়ে যায়।

সেই ডুয়েল পিস্তল

আমি যে কবরস্থানে দাঁড়িয়ে আছি সেটা টরন্টো শহর থেকে তিনশো কিলোমিটার দূরে। একটা বড়সড় পার্কের পাশে। পার্কের নাম পরে বলছি। এই কবরস্থানে অফিসিয়ালী কবর দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে দুই’শ বছর আগে। এখন এটা শহরের ক্যাটালগে ওল্ড সিমেটারী নামেই পরিচিত। সবুজ ঘাস আর মাটিতে প্রায় বসে যাওয়া প্রাচীন ফলক নিয়ে এখনো বেঁচে আছে এই পরিত্যাক্ত কবরস্থান। সন্ধ্যার আগে আলো থাকতে থাকতে ঢুকেছিলাম একটা কবর খুঁজে বের করার জন্য। সিমেটারীর সামনে একটা ম্যাপে দেখানোও ছিলো কবরটা কোথায় হতে পারে।

আফসোস…তারপরও রবার্ট লিউনের কবরটা ঠিক ঠিক খুঁজে পেলাম না। নামগুলো মুছে গেছে। অস্পষ্ট হয়ে গেছে। পড়া যায় না।ব্যর্থ হয়ে বের হয়ে আসছিলাম। হঠাৎ ইলিয়াসকে বললাম..‘কবরগুলো পেছনে রেখে একটা ছবি তুলে দে। পেছনের কোন একটা কবর রবার্টের। ঠিক কবর চিনতে না পারলেও একটা স্মৃতি থাকুক।’

আজ আপনাদের রবার্ট লিউনের গল্প বলবো।যারা কলকাতা গেছেন তাদের চোখে পড়তে পারে কলকাতা ন্যাশনাল লাইব্রেরীর উত্তর-পশ্চিম দিকে একটা রাস্তা… রাস্তার পাশে গাছের সারি…রাস্তাটার নাম অদ্ভুত লাগতে পারে…‘ডুয়েল এভিনিউ’! এই রাস্তার গল্প আছে কলকাতার বাংলা ছবি ‘প্রাক্তন’ এ।

ডুয়েল আমরা দেখেছি ওয়েষ্টার্ন ছবিতে। টেক্সাসের কাউবয়রা বিখ্যাত ছিলো ডুয়েল লড়ার জন্য। যখন দুইজন বীর পুরুষের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ হতো…আঠারোশো সালের দিকে..সেই মতভেদ সমাধানের সবচেয়ে সম্মানজনক উপায় ছিলো এই ডুয়েল। দুইজন দুইটা পিস্তল নিয়ে পিছিয়ে যেতো। তারপর হঠাৎ ঘুরেই গুলি করতে হতো। যে আগে গুলি করতো…সে জিতে গেলো…আর যার দেরী হয়ে গেলো..সে শেষ!

১৭৮০ সালে ব্রিটিশ ভারতে বিখ্যাত এক ডুয়েল হয়েছিলো কলকাতার এই রাস্তায়। ব্রিট্রিশ দুই পাওয়ারফুল ব্যক্তির মধ্যে। ওয়ারেন হেষ্টিংস আর ফিলিপ ফ্রান্সিসের মধ্যে। তাদের দুই জনের ডুয়েলের কারন ছিলো একেবারে সাধারন। একজন আরেক জনকে পছন্দ করতো না। ব্যাস্। দুইজন ডুয়েল লড়লো। ফিলিপ হেরে গেলেও মরে যায় নি। ঠিক জায়গায় গুলি না লাগায় বেঁচে গেছিলো। তাদের দু’জনের ডুয়েল লড়ার রাস্তার নাম সেই থেকে হয়ে গেল ‘ডুয়েল এভিনিউ’।কিন্তু কানাডার রবার্ট লিউন বাঁচতে পারেনি। সে ডুয়েল লড়েছিলো প্রেমের জন্য। তার পছন্দের নারী এলিজাবেথের জন্য সে জীবন দিয়েছিলো আমি যে কবরস্থানে দাঁড়িয়ে আছি তার ঠিক পাশের পার্কে। সেটাই ছিলো সে সময়ের কানাডার ইতিহাসের শেষ ডুয়েল। তারপর ডুয়েল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তাই এই পার্কের নাম দেয়া হয়েছে ‘লাস্ট ডুয়েল পার্ক’।

রবার্ট আর এলিজাবেথ ছাড়াও গল্পে তৃতীয় ব্যক্তি আছে। থাকতেই হবে। সে হচ্ছে জন উইলসন। সেই প্রেমের যুদ্ধে বিজয়ী। এলিজাবেথকে বিয়েও করেছিলো সে। সিনেমার গল্প হলে তার চরিত্রই হয়তো নায়ক হতো। কিন্তু কেন জানি গল্পটা জানার পরে থেকে জনকে আমার এই গল্পের নায়কই মনে হলো না। আমি হন্যে হয়ে রবার্টের কবর খুঁজতে লাগলাম।আহ্ রবার্ট..কত আর বয়স ছিলো…উনিশ-বিশ…আমার কাছে সেই এই গল্পের আসল নায়ক।রবার্ট আর জন আইনের ছাত্র। গোল বাধঁলো যখন রবার্ট আর জন একসঙ্গে এলিজাবেথের প্রেমে পড়ে গেলো।১৮৩৩ সালের ১৩ই জুন ভোর ছয়টায় খোলা মাঠে ডুয়েল লড়া হলো। প্রথম গুলিটা ভাগ্যক্রমে কারো গায়েই লাগে নি। কিন্তু বয়স কম। তারা থামতে পারেনি। আবার গুলি চললো। দ্বিতীয় গুলিতে…সব শেষ।

শহরের মিউজিয়ামে সেই জোড়া পিস্তল এখনো রাখা আছে। পিস্তলদু’টোর মাঝে সযত্নে একটা লাল গোলাপ রাখা আছে। এই লাল কি ভালোবাসার রং…না রবার্টের রক্তের রং? জানি না।প্রত্যেকটা লোকালয়েরই গল্প থাকে। মানুষের গল্প থাকে।

ছবি: লেখক ও গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box