মানুষ মূলতঃ পাখি বলেই মনে হয় আমার

‘স্মৃতির পাখিরা’ এক ধরণের স্মৃতিগদ্য। যেন ফেলে আসা জীবনের সুখদুঃখময় বসবার ঘর। কত চরিত্র এসে বসে সেখানে, কত চরিত্র বিদায় নেয়। মাঝখানে জেগে থাকে হারিয়ে ফেলা শহরের ঘ্রাণ হয়তো। কাকলি আহমেদ সেই বসবারঘরের গল্প বলতে চেয়েছেন প্রাণের বাংলার পাতায় তার ‘স্মৃতির পাখিরা’ কলামে।

কাকলী আহমেদ

বিকেল খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে আসে। মাগরিবের আজানের সঙ্গে ঘরে ফিরে যাবার তাড়া। সন্ধ্যায় পাখিরাও কিচির মিচির করে ঘরে ফেরে। আসলে মানুষ তার জীবনকে কখনোই থরে থরে নিজের ইচ্ছে মতো সাজাতে পারে না। আমাদের সময়ে সব বাবা মায়ের আর্থিক সামর্থ্য মোটামুটি একই রকম ছিল বলা যায়। নিজের সাধ্যর মধ্যে থেকে সন্তানের লেখাপড়া, শখ, সাধ মেটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতেন। কোচিং নামক এই পড়ালেখার পদ্ধতি তখন আসেনি। ফলে ছাত্র ছাত্রীদের জীবনে খেলাধুলার জন্যে সময় ছিলো। বিকেলে খেলাধূলার করে প্রাণের শক্তি সঞ্চয় করে তবেই সন্ধ্যায় সবাই পড়তে বসতো। পাড়ার বড় ভাই অথবা বোন যে লেখাপড়ায় ভাল তার নাম ছড়িয়ে যেতো পুরো পাড়ায়। আমাদের পড়ালেখা মূলত মায়ের হাতেই ছিলো। ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি, তখন অংক নিয়ে আম্মার একটু কষ্টই হয়ে যেতো তাই প্রতিবেশী এক ক্লাস বা দুই ক্লাস উপরের ভাই বা বোনের কাছে গিয়ে অংক বুঝে আসতাম। এতদিন পর সেই ভাই বা বোনেদের কথা তেমন মনে নেই। আম্মার কাছেও অনেকেই ট্রান্সলেশন করতে আসতো। পাড়ায় তখন অনেকেই জানতো আমার মা লেখাপড়া জানা, আবার চাকরিও করেন। কিছুদিন পর আম্মা আমার আর আমার বড় বোনের অংক করানো জন্য অল্প বেতনে গৃহশিক্ষক খুঁজতে লাগলেন। আমাদেরও অনেকটা ধারণা ছিল যারা টিচারের কাছে পড়ে তারা লেখাপড়ায় ভাল করে। মূলত ক্লাসের শিক্ষকগণ এত সুন্দর করে ক্লাসে পড়িয়ে দিতেন, বাসায় ফিরে বাড়ির কাজটুকুন করলেই লেখাপড়ায় এগিয়ে থাকা তেমন কষ্টকর ছিল। ঘরে ঘরে মুরুব্বি-রা বাধা ধরা একটা প্রশ্ন করতো, ‘বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও?’ আমার কাছে এই প্রশ্নটা ছিল খুব কঠিন এক প্রশ্ন। সে সময়ে আব্বুর বন্ধুদের আমরা চাচা বলে ডাকতাম। চাচার স্ত্রী কে চাচী বলে ডাকতাম। আব্বু আম্মার কলিগরা হর হামেশাই আমাদের বাসায় আসা যাওয়া করতেন। চাচাদের এমন প্রশ্নে ভীষণ সমস্যায় পড়ে যেতাম যে, কী উত্তর দেবো।আমার মায়ের খুব ইচ্ছে ছিলো তাঁর বড় মেয়ে ডাক্তার হবে। কেবল আমার মায়ের না ঘরে ঘরে শুনতাম সবাই বলতো ছেলে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। জীবন ও জীবিকা কি তাই তখনও ঠিক বুঝে উঠিনি।

তখন আমরা  পাড়া ছেলে মেয়েরা মিলে প্রায়শই খোলা মাঠে  নাটক করতাম।একটু দেখতে সুন্দর পাড়ার মেয়েটিকেই সব সময় নায়িকার রোল দেয়া হতো। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তখন জনপ্রিয় জুটি আফজাল সুবর্না। রিনি রেজা,শম্পা রেজা, আসাদুজ্জামান নূর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, প্রিসিলা পারভীন। সপ্তাহে একটি অনন্য নাটক উপহার পাওয়া যেতো। সেই নাটকটির ঘটনাটাই পরেরদিন আমরা বিকেলে অভিনয় করতাম। বেশিরভাগ সময়েই তাহমিদা নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতো। নাটকে আমরা নিয়মিতই ডাক্তার,কবি রাজ,সাপুড়ে, ডাকাত, ইঞ্জিনিয়ার, বেকার কত চরিত্রেই না অভিনয় করেছি। সেদিনের এসব খেলার সাথীরাই এখন অনেক বড় বড় গদে চাকুরিরত । কেউ ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার কেউ শিক্ষক।

পাড়ায় কত রঙ বেরঙের মানুষের সঙ্গেই না দেখা হয়েছে। ওদের সঙ্গে পথ চলেছি। মনের কথা ঢেলে বলেছি। আবার কত মান অভিমানেই না ভরে ছিল আমাদের সেই দিনগুলো। পাড়ার কোন কোন বড় ভাইয়ের প্রেমের ঘটনা আগ্রহ নিয়ে শুনেছি। তাদের লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম করা দেখেছি।ভাল মন্দ না জেনেই মনের কুটিরে সেই ভাল লাগা হু হু করে বাতাস বইয়ে দিয়েছে। কিশোরী মনে অজানা অচেনা দূর থেকে দেখা কিশোরের প্রেমে পড়েছে। ইনিয়ে বিনিয়ে পরিচিত হবার সুযোগ খুঁজেছি। পিচ ঢালা পথের সঙ্গে প্রেম, বিশাল কড়ই গাছের শিকড়ের সঙ্গে আবাল্য সখ্য, বাল্যপ্রেম ভালবাসার সূত্রপাত সবই তো এই বয়সেই। আবার পাড়ার বা স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে পোক্ত ভালবাসাও এই বয়সেই যেন গেড়ে বসে। মনে হয় এই তো সেদিন কাকরাইলের বাসায় বায়োনিক ওম্যান,সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান দেখে কল্পনায় বায়োনিক ওম্যানের সব হাব ভাব নিজের ভেতরে আয়ত্বে আনতে চেয়েছি। টেলিভিশনে দেখা নাটকগুলোর সংলাপ এত ভাল লেগেছে। বার বার ঘরে আউড়ে বেরিয়েছি। নাটকের নায়কের পাশে নায়িকাকে সরিয়ে নির্দ্বিধায় নিজকে নায়িকা ভেবে নায়কের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছি।

একদিন আব্বু আম্মার নীচু স্বরের আলাপে জানতে পারলাম এ বাড়িতে আর থাকা হবে না। আখতার চাচা নোটিশ দিয়েছেন বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে। বুকের ভেতর মোঁচড় দিয়ে উঠলো। এ পাড়ার বিশাল জায়গা জুড়েই যেন ছড়িয়ে ছিল অবাধ চলাচল। আশেপাশের সব ভালবাসার মানুষগুলো এত আপন হয়ে গিয়েছিলো। একেকটা বিকেল যেনো শত সহস্র বিকেল। একেকটা ভোরের শিউলিফুলের মালা যেনো আজো নাকে গন্ধ নিয়ে আসে। শীতের পাতা পোড়া গন্ধ। গরমে কাঁচা আম কুড়ানো সুখগুলো নিয়ে রাতে আমরা দুঃখে কাতর হয়ে থাকি। দুই বোনের ভীষণ মন খারাপ। তাহমিদা,আবীর,আশিক,সারোয়ার,নাবিলা আপা এমনি অনেক প্রিয় মুখে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

প্রতিদিন বাড়ি খুঁজতে বের হয় আব্বু অথবা আম্মা। কখনো কখনো দুইজনেই। আমরা কান পেতে থাকি কোন এলাকায় আবার যেতে হবে। এক সন্ধ্যায় বাঁধা ছাদা শুরু হয়। ইস্কাটনে ভীষণ সুন্দর তিন কামড়ার লম্বা বারান্দা আর সামনে এক টুকরো উঠানসহ এক বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। আমরা সবাই অতি আগ্রহে নতুন পাড়ায় যাবার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। মানুষ মূলতঃ যেনো পাখি বলেই মনে হয় আমার। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সে ছূটে বেড়ায়। এক ডাল থেকে আরেক ডালে। কখনো কোন ঝিম ধরা বিকেলে মনের কার্নিশে আয়েস করে বসে শত সহস্র স্মৃতির পাখিরা। আবার কিছু সময় পর উড়ে যায় সে। পড়ে থাকে কতই না ঝলমলে পাখির পালক।