মারায়ানতং চূড়ায় ক্যাম্পিং

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালমা রহমান শুভ্রা

সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯। উত্তাল বঙ্গোপসাগরে চলছে ৩ নম্বর সিগন্যাল। আর ঠিক সেসময়ই গ্রুপ ট্যুরের অংশ হিসেবে রাতে তাঁবুবাসের পরিকল্পনা ছিলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬৫০ ফুট ওপরে আলীকদমের ম্রোতঙের (ম্রোদের পাহাড়ে) চূড়ায়। এটা বান্দরবানের মিরিঞ্জা পাহাড়শ্রেণীর অংশ। মারমা ভাষায় পরিচিত মারায়ানতং হিসেবে। ঝড়-বৃষ্টির রাতে সেই পাহাড়চূড়ায় তাঁবুতে থাকার অভিজ্ঞতাটা ছিলো অসাধারণ! পাহাড়টা সরকারি সম্পত্তি। ১৯৯২ সালে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পাহাড়চূড়ায় ১০ একর জমি বন্দোবস্তি নেন ‘মহইদই বৌদ্ধ ধাম্মা জাদী’ নামে। ভিক্ষু সংঘের উদ্যোগে, পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে আর স্থানীয়দের শ্রমে ১৯৯৩ সালে একটি বৌদ্ধমূর্তি স্থাপিত হয়। জাদীকে ঘিরে মহাবৌদ্ধ মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৯৯৫ সালের ৫ জানুয়ারি।

বর্তমানে প্রতি বছর মাঘ মাসে (ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহে) এই মেলা বসে তিন দিনের জন্য। দেশের নানান প্রান্ত ছাড়াও প্রতিবেশী মায়ানমার, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশ থেকে অসংখ্য ভিক্ষু আর দায়ক-দায়িকারা ভিড় জমান এসময়। পুর্ণ্যার্থীদের সুবিধার জন্যই ইটের রাস্তা বানানো হয়েছে। টিটো আর আমি টিমের সঙ্গে যোগ হয়েছিলাম পাশের উপজেলা লামা থেকে এসে। এর আগের দু’দিন ঘুরেছি লামার বেশ কয়েকটা ঝর্ণায়। সময়মতো যোগাযোগের অভাবে ঢাকা থেকে এসে সকালেই লামা ঘুরে আলীকদম যাওয়া বাস মিস হলো আমাদের। ফলে লামা থেকে বাইক ভাড়া করে টিমের সঙ্গে যোগ দিলাম আলীকদম বাসস্ট্যান্ডে এসে।

সেখানে বসেই নাস্তা করা হলো। এরপর অটো নিয়ে আলীর গুহা ঘুরে এসে দুপুরে আবারও সেই হোটেলে খাওয়ার আয়োজন। শুক্রবার ছিলো, আলীর গুহা থেকে ফিরে অনেকে নামাজে চলে গেলো। সত্যি বলতে কি, রান্নার মানের কারণে দুপুরে খেতেই পারলাম না। এরপর অটো নিয়ে উল্টো পথ ধরে যেতে হলো ‘আবাসিক’ নামের এলাকায়। এখানে নাকি প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে আদিবাসী শিশুদের জন্য একটা আবাসিক স্কুল গড়ে উঠেছিলো। আমরা অবশ্য স্কুলটার খোঁজ পাই নি! তবে তখন থেকে জায়গাটার নাম হয়ে গেছে ‘আবাসিক’।

পাহাড়চূড়ায় ওঠার আগে এক মারমা পাড়ার দোকানে প্রায় সবাইকে বসিয়ে রেখে গাইড ফারুকসহ কয়েকজনকে নিয়ে রাতের বাজার করতে চলে গেলো আরিফ। আমরা এই ফাঁকে চা-নাস্তা সেরে নিলাম। বৃষ্টিও শুরু হলো। দোকানে বসে সামনের সমতল জায়গাটায় সব্জিক্ষেত আর দূর থেকে পাহাড়ের ওপরে জুমক্ষেত আর মেঘেঢাকা পাহাড়চূড়া চোখে পড়ছিলো। দেখলাম, পাহাড়চূড়াকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে হালকা মেঘ ঘুরছে! উপরে ওঠার পর খেয়াল করেছিলাম এখানে কুয়াশার মতো হালকা মেঘ জমে আছে!

যাকগে, আরিফ ফেরার পর শুরু হলো রোমাঞ্চকর এক ট্রেকিঙের অভিজ্ঞতা! একটু এগিয়ে বাঁয়ে ইট বাঁধানো রাস্তা ধরে পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। মারায়ান তঙের পুরোটাই চড়াই পথ। সাতটা ধাপে উঠতে হয়। কয়েকটা বেশ খাড়া। ওপরের দিকে সামান্য কয়েক মিটার বাদে পুরোটাই ইট বাঁধানো রাস্তা। এই রাস্তা আবার কয়েকটা জায়গায় ধসে পড়েছে। একটু অমনোযোগী হলেই সোজা নিচে পড়তে হবে! বর্ষার কারণে শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে ছিলো প্রায় পুরোটা পথ। সাবধানে হাঁটতে হচ্ছিলো। কয়েক দফা বিরতি দেয়ায় দেড় ঘণ্টার পথ পেরুতে তাই একটু বেশিই সময় লেগে গেলো। পৌঁছুলাম সবার শেষে! আগের দু’দিন ঝর্ণার খোঁজে লামায় ব্যাপক ট্রেকিং-ঘোরাঘুরি করায় আর সেদিন সকালে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে আলীর গুহায় ওঠায় একটু ক্লান্তও ছিলাম।

পথের মাঝে ইকবালকে পোর্টার হিসেবে নিতে হয়েছিলো

 হাঁফ ধরে যাওয়ায়। ১২/১৩ বছরের ছেলেটা আসা-যাওয়ার পথে অনেক জায়গা হাতে ধরে পার করিয়েছিলো আমাকে। ওর জন্য দোয়া রইলো।

পাহাড়চূড়ায় ওঠার পথে বিভিন্ন সময় বিরতি দেয়ার ফাঁকে চারদিকে তাকিয়ে দূরে চোখে পড়ছিলো থরে থরে সাজিয়ে রাখা পাহাড়। নিচে এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে মাতামুহুরি নদী। বৃষ্টির পর স্বাস্থ্যবান একটা রংধনুও চোখে পড়লো নদীর ওপর! এরকম মোটাসোটা রংধনু সেটাই প্রথম ও শেষবার দেখা! একটু পর দেখা মিললো সূর্যের। বিকেলের তীব্র সূর্যালোক নদীর পানিতে প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিলো। সমতল জায়গায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু পাড়া। মাঝে ম্রো পাড়ার কারবারির বাড়িতে বিরতি দিয়ে বেশ খানিকটা পানি আর চকলেট খেয়ে নিলাম। কার্বারির নাম অনুযায়ী পাড়ার নাম লারোই পাড়া।

মাঝে এক জায়গায় আমার চাইতেও উঁচু সাইজের বাঁশকোড়ল চোখে পড়লো! এর আগে দেশের উত্তরের শেষপ্রান্ত তেঁতুলিয়ায় এমন বিশাল সাইজের বাঁশ চোখে পড়েছে, যার ভেতর চাইলে আস্ত একজন মানুষকে পুরে রাখা সম্ভব!

যাকগে, ওপরে উঠতে উঠতে চারদিকে আবারও মেঘের আনাগোনা শুরু হলো। কুয়াশামোড়া ভোরের মতো কেমন একটা পরিবেশ! ওঠার পথেই অনেকটা জায়গাজুড়ে জুমক্ষেত। ইটের রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানটা বেশ সমতল। মহাবৌদ্ধ মেলায় আসা পুর্ণ্যার্থীদের থাকার সুবিধার জন্যই সম্ভবত জায়গাটা কেটে সমতল বানানো হয়েছে।

এখানে একদফা বিশ্রাম নিয়ে এবার পিচ্ছিল লালমাটির রাস্তা ধরে ওপরে ওঠা। চূড়ায় ওঠার পর দূরে চোখে পড়লো কুতুবদিয়া দ্বীপ আর বঙ্গোপসাগর। অপার্থিব এক বিকেল আর সন্ধ্যার দেখা মিলেছিলো সেদিন!

সাগরে যে সেদিন ৩ নম্বর সিগন্যাল ছিলো, তা জেনেছি রাত নামার পর। সেই রাতে চারটা গ্রুপের মোট ৩৪ জন ক্যাম্পিং করেছি আমরা। আমাদের টিমে ছিলো ১৪ জন। ওপরে উঠেই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁবু পিচ করে ফেললো আরিফ। সঙ্গত কারণে আমার একার জন্য বরাদ্দ হয়েছিলো নীল রঙের সিঙ্গেল একটা তাঁবু। পিঠের ব্যাগ দু’টো তাঁবুতে চালান করে দিয়ে আড্ডায় দাঁড়িয়ে গেলাম, কারণ বসে আড্ডা দেয়ার মতো ঘাস সেখানে ছিলো না! মানুষের আনাগোনায় বিলীন হয়েছে ঘাসের অস্তিত্ব!

যাকগে, আবহাওয়াগত কারণে সন্ধ্যার পর দমকা হাওয়া শুরু হলো। মেঘের ভেতরে ঢুকে থাকা আমরা কেবল নিজেদের অবয়ব দেখতে পাচ্ছিলাম, কারও চেহারা বোঝা যাচ্ছিলো না! আড্ডা দিলাম চট্টগ্রাম থেকে আসা চার বাইকারের সঙ্গে। এরা বাইক নিয়ে পাহাড়ে যতোদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়, চষে বেরিয়েছেন! ওদিকে আমার ট্যুরমেটরা গান গাওয়ায় ব্যস্ত!

হালকা বৃষ্টি শুরু হলো কিছুক্ষণ পর। চললো সারাটা রাত! এরমাঝেই আমার পোর্টার ইকবাল আর তার বন্ধু রানাকে নিয়ে আলু দিয়ে দেশি মুরগির ঝোল রেঁধে ফেললো গাইড ফারুক। সঙ্গে ভাত। মুরগী রান্নার সময় জানা গেলো- যথেস্ট লবণ আনা হয় নি কিংবা লবণের প্যাকেট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! জোঁকের হামলা রুখতে ছোট একটা ডিব্বায় লবণ নিয়েছিলাম। সেটা দিয়েই রান্না হলো! এরমধ্যে পেছনের জঙ্গল থেকে কলাপাতা কেটে আনলো ফারুক। রাতে বৃষ্টির মৃদু ঝাপটার মধ্যেই খাওয়া হলো কলাপাতায়। আহা… ক্ষুধা পেটে ফারুকের সেই গরম গরম খাবার মনে হলো অমৃত!

খাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু দমকা বাতাস আর বৃষ্টির কারণে তাঁবুর কোণবেয়ে পানি ঢোকায় আর বাতাসে কখন তাঁবু উড়ে যায়- এই আশঙ্কায় সারারাত ঘুম হলো না।

সকালে উঠে পড়লাম তাড়াতাড়ি, কারণ আমাদের গ্রুপের আমি আর টিটোছাড়া আর সবাই দামতুয়া যাবে। আরিফের কাছে তাঁবু বুঝিয়ে দিতে হবে। এই ট্যুরে দামতুয়া যাই নি, কারণ ২ আগস্ট ওদিকটা ঘুরে এসেছি। টার্গেট ছিলো টিটোর সঙ্গে শিলবুনিয়া জলপ্রপাতে যাবো।

রাতভর বৃষ্টির কারণে ফেরার পথটা তুলনামূলক বেশি পিচ্ছিল হয়ে ছিলো। তাই ইকবাল আর রানাকে সঙ্গে নিয়ে বিরতি দিয়ে দু’ঘণ্টা ধরে নামলাম। নিচের সেই দোকানটায় একসঙ্গে নাস্তা সেরে ওদের দু’জনকে বিদায় করে টিটোর সঙ্গে গেলাম শিলাবুনিয়া জলপ্রপাত দেখতে।

দোকানের উল্টোদিকের কালভার্টের পাশ দিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমার আর টিটোর। ছোট্ট একটা জলপ্রপাত। তবে আপস্ট্রিমে ওঠার খাড়া পথটা বেশ বিপজ্জনক।

জমাটবদ্ধ শিলা বেয়ে অনেকটা ওপর থেকে নেমে আসা এই ঝিরিপথের পুরোটাই বিভিন্ন আকারের পাথরে ভরা! আর এই ঝিরির পানি পাইপের মাধ্যমে টেনে এনে সমতল এলাকায় চলছে নানান সব্জির চাষ।

বাগান থেকে সদ্য তুলে আনা কয়েক কেজি সবজি কিনে ফেললাম বাগানীদের কাছ থেকে! হাঁটতে হাঁটতে আবাসিকে এসে অটো নিয়ে সোজা রওয়ানা দিলাম হোটেল দামতুয়া ইন’র পথে গরম কফি খেতে।

বাসস্ট্যান্ডে এসে পেয়ে গেলাম আবদুল্লাহ ভাইকে! উনি ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যাওয়ায় আর বিশ্রাম নেয়ার মতো হোটেল না পাওয়ায় ভাই দামতুয়া যাওয়ার প্ল্যান বাদ দিয়ে রিক্সা নিয়ে আলীকদম ঘোরার প্ল্যান করছিলেন।উনাকে জোর করে নিয়ে এলাম হোটেলে, যেন সন্ধ্যায় ফেরার বাসে ওঠার আগে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিতে পারেন। বিশ্রাম নেয়ার বদলে উনি আড্ডা দিতে শুরু করলেন। দুপুরে খাওয়া হলো উনার সৌজন্যে। এরপর জোর করে ওনারে বিশ্রামে পাঠানো হলো।

সন্ধ্যায় ট্যুরমেটরা ডিনার করতে এলো হোটেলে। আবদুল্লাহ ভাই’র সৌজন্যে আরেক মগ কফি এলো। সেখান থেকে সবাইরে বিদায় দিয়ে দামতুয়া ইন-এ থেকে গেলাম আরেকটা রাত। পরদিন বিকেল ৩টায় বেরিয়ে বৃষ্টির মধ্যে সোজা ফিরলাম নিজ ডেরায়।

সেবার ট্যুরমেট হিসেবে অসাধারণ কিছু মানুষের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিলো ট্যুর অর্গানাইজার আরিফের কল্যাণে! এদের দু’জনের সঙ্গেই এই তো ২৭ আগস্টও ঘুরে এলাম সীতাকুণ্ডে।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box