মাসুদ রানার গলিতে…

কিশোর বয়সে আমরা বলতাম মাসুদ রানার গলি। সেগুন বাগান তখনও সেগুন বাগিচা হয়ে ওঠেনি। কাজী আনোয়ার হোসেনদের পৈত্রিক বাড়ির গলিটায় সামনে দাঁড়িয়ে কেন জানি মনে হতো এখানেই হয়তো মাসুদ রানা থাকে। কোনো একটা বাড়িতে বাংলাদেশের কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের নিঃশঙ্ক চিত্তের সেই স্পাই বসবাস করে। ঘরে চলাফেলা করে তার প্রিয় কুকুর গুণ্ডা। আসে গিল্টি মিয়া, ঘুমের দুপুরে তৈরি হয় সোহানার সঙ্গে প্রেমের গল্প। সত্তরের দশকে এ দেশের কিশোর পাঠকদের অনেকেরই মনে এরকম একটা ভাবনা ঘুরতো বলেই আমার ধারণা। ওই বাড়িতে প্রবেশের অধিকার বা কারণ কোনোটাই ছিলো না। দূর থেকে দেখে আসতাম। অধীর হয়ে অপেক্ষা করতাম মাসুদ রানা সিরিজের উত্তেজনায় ঠাঁসা নতুন বইটি হাতে পাওয়ার জন্য। একদল কিশোর অপেক্ষা করতাম গোয়েন্দা সিরিজ কুয়াশার নতুন কিস্তির জন্য।

শুধুই কি মাসুদ রানা আর কুয়াশা? মাসুদ রানার গলির বাড়িটা থেকে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়েছে হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো অসংখ্য বই। বিশ্ব সাহিত্যের আলোচিত বইয়ের অনুবাদ, রহস্য পত্রিকা, কত কী!

সেইসব দুপুরের কথা, বিকেলের কথা মেনে পড়ে যখন এক অধীর আগ্রহ ভাত খাওয়ার পর তাড়িয়ে নিয়ে যেতো বন্ধুর বাড়িতে। জানতে হবে তো, মাসুদ রানার নতুন কিস্তিটা কেনা হয়েছে কি না? কেনা হয়ে গেলে সে বইটা কবে পড়তে দেবে?

তখন জেমস বন্ডের দুনিয়া কাঁপানো স্পাই থ্রিলার কাহিনির বাজে অনুবাদ হওয়া বই ঢাকায় পাওয়া যেত। পাওয়া যেত সিডনি শেলডানের বইয়ের অনুবাদ। মূল ইংরেজি বই কেনার আর্থিক সক্ষমতা তো ছিলো না। আর বাড়ি থেকে এ ধরণের থ্রিলার কেনার অনুমোদনও পাওয়া যাবে না।ঠিক ওরকম একটা সময়ে আমাদের হিরো মাসুদ রানা। কোমরে গোপন আগ্নেয়াস্ত্রের মতো গোঁজা থাকতো সেই বই। বন্ধুদের সঙ্গে বিনিময় প্রক্রিয়া চলতো নিঃশব্দে। কাজী আনোয়ার হোসেন ওইসব শস্তা অনুবাদ বই পড়ার হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছিলেন এখন বুঝতে পারি। স্পাই থ্রিলার কাহিনিতে এ দেশীয় আত্মা পুরে দিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন একটি চরিত্র-মাসুদ রানা। বাংলাদেশে শখের গোয়েন্দা শহীদ চরিত্র সফলতা পেয়েছিলো তারই হাতে কুয়াশা সিরিজে।ঝরঝরে সংক্ষিপ্ত বাক্য, সংক্ষিপ্ত বিবরণ আর দারুণ সব উপমা তাঁর রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এসে আমূল পাল্টে দিয়েছিলো আমাদের পাঠভ্যাসের স্বাদ।

লেখালেখির শুরুটাও ছিলো বেশ রোমাঞ্চকর। পাখি শিকারের জন্য একটা বন্দুক কেনার টাকার সন্ধান করতে গিয়ে বই লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। বেশ দ্রুত দুটো পাণ্ডুলিপি দাঁড় করিয়েও ফেললেন। কিন্তু কে প্রকাশ করবে? কোনো এক প্রকাশক শর্ত দিলেন, আগে অন্তত ১০টি বই লিখে দিতে হবে। তারপর কিছু টাকা-পয়সা না হয় দেওয়া যাবে। আরেক প্রকাশক লেখার পারিশ্রমিকই দিতে রাজি হলেন না। তাই বই প্রকাশের উদ্যোগ তখন ভেস্তে গেলো। শোনা যায়, বাবা কাজী মোতাহার হোসেন বই নিজেই ছেপে প্রকাশ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তখন। শেষে বই প্রকাশের পাশাপাশি প্রেসের ব্যবসা করার চিন্তা থেকেই সেগুনবাগান প্রেসের যাত্রা শুরু। সেটা ১৯৬৪ সালে। কালক্রমে সেটাই রূপ নেয় সেবা প্রকাশনীতে। মূলত কিশোর পাঠকদের রহস্যজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই ‘কুয়াশা’ সিরিজ দিয়ে যাত্রা শুরু সেখান থেকে।

১৯৬৫ সালে মোটরসাইকেলে করে আনোয়ার হোসেন ঘুরে এসেছিলেন চট্টগ্রাম, কাপ্তাই ও রাঙামাটি। উদ্দেশ্য কাহিনি সাজানো! এরপর সাত মাস সময় নিয়ে লিখলেন ‘ধ্বংস-পাহাড়’। বাংলা ভাষার প্রথম মৌলিক স্পাই থ্রিলার। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বাজারে এলো বইটি। এরপর ১০ মাস সময় নিয়ে লেখা হলো ‘ভারতনাট্যম’।দুটোই মাসুদ রানা সিরিজের সূচনাকালের বই।

মৌলিক স্পাই থ্রিলার লেখা কঠিন কাজ। অভিজ্ঞতা আর প্রচুর পড়াশোনা ছাড়া প্রায় অসম্ভব বলা চলে। কিন্তু তত দিনে জীবিকার উৎস আর পাঠক চাহিদার বিষয়টা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং, শুরু হলো ‘বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে’ লেখা। এভাবে মাসুদ রানার কাহিনি সংগ্রহ করা হয়েছে অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, রবার্ট লুডলাম, উইলবার স্মিথ, ইয়ান ফ্লেমিংসহ অসংখ্য লেখকের বই থেকে। ‘মাসুদ রানা’র বই ৪০০ পেরিয়ে গেছে। বিদেশী গল্পের আত্মাকে দেশীয় ছাঁচে ফেলে বিশ্বাসযোগ্য কাহিনি তৈরি করার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিলো তাঁর মধ্যে।

ট্রেজার আইল্যান্ড, বাস্কারভিলের হাউন্ড, শি, রবিন হুড, রিটার্ন অব শি, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টসহ আরও কিছু অসাধারণ অনুবাদের কথাই বা না বলা যায় কীভাবে? বলা যায় জুলভার্নের সায়েন্স ফিকশনগুলোর সাবলীল ও সংক্ষিপ্ত রূপান্তর বইগুলোর কথা। শেখ আবদুল হাকিম, নিয়াজ মোরশেদ, জাহিদ হাসান, আসাদুজ্জামানসহ আরও অনেকের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে ঝরঝরে গদ্যের অনুবাদগুলো। নিয়াজ মোরশেদের অনুবাদ সেবার সুবর্ণ সময়ে সবচেয়ে বেশি পাঠক টেনেছে।

চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়, ১০০ জনের বেশি লেখক-অনুবাদক তৈরি হয়েছে সেবা প্রকাশনী থেকে। আজকের বিভিন্ন নামকরা গণমাধ্যমে যাঁরা কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই তো সেবা, রহস্যপত্রিকা বা কিশোর পত্রিকারই প্রত্যক্ষ সৃষ্টি। লেখালেখি করে জীবিকা অর্জনের দুঃসাহস সেবাই জুগিয়েছে তাঁদের অনেককে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখালেখির জগৎ আমাদের সাহিত্যের মূল ধারা হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। হবার কথাও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, পৃথিবীর বিচিত্র সব জ্ঞানের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া অথবা এক কথায়, নতুন এক কল্পনার রাজ্য তৈরি করায় মাসুদ রানার গলির মানুষটির অবদান আমাদের মনে থাকবে।

কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন।তিনি তাঁর অগণিত পাঠকদের চির বিদায় জানালেন ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারী।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box