মাস্টারদার বাস্তুভিটায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালমা রহমান শুভ্রা

দিনক্ষণ হিসেব করে রাউজান যাওয়া হয় নি, তারপরও ক্যামনে যেনো মিলে গেলো সময়টা! ছোটোবেলা থেকে মাস্টারদা সূর্য সেন আর তার শিষ্য প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত- ইত্যাদি নামগুলোর সঙ্গে এতো বেশি পরিচিত হয়েছি যে এবার সুযোগ পেয়ে মাস্টারদার জন্মস্থান আর তার শিষ্যদের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো দেখার লোভটা আর সামলানো গেলো না!

মাস্টারদার সক্রিয়তা নিয়ে বেশ ক’বছর আগে ভারতে নির্মিত ‘চিটাগাং’ ছবিটাও দেখা হয়ে গিয়েছিলো তখনই। অথচ, ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এসব নেতা এবং পূর্ব বাংলায় জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবীদের তৎকালীন সশস্ত্র আন্দোলন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাংলাদেশে খুব বেশি হয়েছে কি?

পশ্চিমবঙ্গে কলকাতা মেট্রো সূর্য সেনের স্মরণে বাঁশদ্রোণী মেট্রো স্টেশনের নামকরণ করেছে ‘মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন’। আর বাংলাদেশে তার সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছে। ব্যাস, এই!

যাকগে, সূর্যকুমার সেন বা সংক্ষেপে সূর্য সেন মাস্টারদা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, যদিও শিক্ষকতা ছিলো তার ছদ্মপেশা। ডাকনাম ছিলো কালু। বেঁচে ছিলেন ৪০ বছরেরও কম সময়, অথচ তার ইতিহাস হয়তো টিকে যাবে বাংলার শেষলগ্ন পর্যন্ত!

মাস্টারদা সূর্যসেন

রাউজান পৌঁছেই খবর দিয়েছিলাম ভোরের কাগজের সাবেক সহকর্মী অম্লান’দাকে। উনার পৈত্রিক বাড়ি বাগোয়ান ইউনিয়নের কোয়েপাড়া গ্রামে। দেখা করার সুযোগ হলো না! কারণ, আগেরদিনই উনি সপরিবারে ঢাকা ফিরেছেন কর্তব্যের খাতিরে।

নিজের গ্রামকে আদর্শ গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে ২০১৬ সালে বন্ধুদের নিয়ে শুরু করেছিলেন কিছু কাজ। তখন থেকেই যাবার দাওয়াত। তবে সুযোগ হচ্ছিলো না! এবারও ফস্কে গেলো উনার সঙ্গে গ্রামে ঘোরার সুযোগটা। তবে সেই বন্ধুদের একজন প্রণোতোষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিলেন ফোন করে।

অম্লান’দার কাছে বেশ ক’দিন আগে জেনে নিয়েছিলাম উনার বাড়িতে যাবার রোডম্যাপ। রাউজান যাবার আগেই জায়গাটা চিনতে সাহায্য করেছিলো উদয়।

কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে চুয়েটে পৌঁছেই জ্বরে পড়ায় কোয়েপাড়া যাওয়া ক’দিন পিছিয়ে দিতে হলো। একটু সুস্থ হতেই ১৮ তারিখ সকালে ভরপেট নাস্তা সেরে চুয়েট থেকে বেরিয়ে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম পাশের পাহাড়তলী বাজারে। তবে এই জায়গাটা চট্টগ্রাম শহরের বিখ্যাত সেই পাহাড়তলী এলাকা নয়, রাউজান উপজেলার একটা ইউনিয়ন। এখান থেকেই যেতে হবে কর্ণফুলী নদীর তীরে খেলারঘাট এলাকায়। পাশেই কোয়েপাড়া।খেলারঘাট নামকরণটা বেশিদিনের নয়। মাস্টারদা’র আমলেও নাম ছিলো ‘তরণী মাঝির ঘাট’। শিষ্যদের সঙ্গে এখানে যাতায়াত ছিলো মাস্টার’দার।একসময় কর্ণফুলী নদীতে মহা সমারোহে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হতো। সে কারণেই নাকি নাম পরিবর্তন করে হয়েছে ‘খেলারঘাট’। এখন আর নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হয় না, তারপরও নামটা রয়ে গেছে ঠিকই।

পাহাড়তলী থেকে সিএনজি অটোতে কয়েক মিনিটে পৌঁছে গেলাম খেলারঘাট। প্রণোতোষকে ফোন করতেই ওর দেখা মিললো। পাশেই কর্ণফুলী নদী। প্রণোতোষকে বলে নদীতীরের দিকে রওয়ানা হতেই ওর ফোন। এসেছেন আখলাস ভাই। বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঘাটের দিকে রওয়ানা হলেন। জিজ্ঞেস করলেন চা, দই খেতে চাই কিনা। ঘাটের সঙ্গে বড় দোকানটা থেকে ওয়ান টাইম ইউজেবল কাপে চা পাওয়া গেলো। বললাম- ফিরে দই খাবো। ঘাটে কমবয়সী এক মাঝিকে ডেকে নিলেন। এরপর আমায় অবাক করে দিয়ে বললেন- যান, একা ঘুরে আসেন।চায়ের কাপ হাতে নৌকায় উঠে পড়লাম। কর্ণফুলীতে তখন ভরা জোয়ার। নদীর মাঝে বড়সড় একটা চর। নাম বেতাগীর চর। লোকজনের বসবাস নেই। তবে সব্জি আর আখ চাষ হয়। টানা বর্ষার কারণে জংলা হয়ে আছে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নামা হলো না চরে।

মাঝি জাকির চরের চারধারে ঘুরিয়ে ঘাটে ফিরিয়ে আনলো। ভাড়া জিজ্ঞেস করলাম। জানালো- মেম্বার সাহেব দেবেন! বড় দোকানটার পাশে এসে দোকানদার বুড়ো চাচার কাছে দই চাইলাম। এরমধ্যে আখলাস ভাই দোকানের ভেতর থেকে ডাক দিলেন। স্থানীয় খামারের চিনিবিহীন দই এলো। উদয়দের জন্যও নিলাম। আখলাস ভাই এর দামও দিতে দিলেন না। বেরিয়ে এসে অম্লান’দার বাড়ি ঘুরে চুয়েটে ফেরার জন্য সিএনজি অটো ঠিক করে সেই ভাড়াও দিয়ে দিলেন।

প্রণোতোষকে সঙ্গে নিয়ে অম্লান’দার বাড়ি গেলাম। ঐতিহ্য ধরে রাখা বেশ পুরোন মাটির বাড়ি। চারদিকে প্রচুর গাছ। সানবাধাঁনো পুকুরঘাট। মাটিতে শিউলি ফুল ঝরে আছে। বেশ পুরোন গাছ, ফুলের সাইজও বেশ বড়। বাড়িতে কেউ নেই। তারপরও প্রণোতোষ তালা খুলে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখালো। এরমধ্যে দাদার মেসেজ এলো পুকুরঘাটে কিছুটা সময় কাটিয়ে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে। ঘাটে বসে দাদাকে ভিডিওকল দিয়ে নিশ্চিত করলাম ওখানেই বসেছি।

পুকুরে জাগ দিতে নেমেছিলো একটা ছেলে। ফেরার পথে ও কয়েকটা কড়ি কুড়িয়ে দিলো আমার খেলার জন্য। গাছটা দেখে ওকে বলছিলাম, ছোটোবেলায় কড়ি দিয়ে খেলার কথা।

বেরিয়ে এসে প্রণোতোষকে বললাম- এতোদূরে এসে মাস্টার’দার ভিটা না দেখে যাবো না। ড্রাইভার তাহের অটো ঘুরিয়ে নোয়াপাড়ার দিকে রওয়ানা দিলো। পথটা এখন পিচঢালা। মাস্টার’দার আমলে সম্ভবত জংলা মেঠোপথই ছিলো। অল্পকিছু ঘরবাড়ি, এছাড়া পুরো পথটাই গাছপালায় ভরা।

পথে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে প্রায় আধাঘণ্টা পর মাস্টার’দার ভিটায় পৌঁছুলাম। এলাকাটার নাম এখন সূর্য সেন পল্লী। কিন্তু বাস্তুভিটার বাইরের চেহারা দেখে বুঝতে কষ্ট হলো এটা ইতিহাসখ্যাত কোনো বিপ্লবীর জন্মস্থান! মাস্টার’দার পরিবারের কেউ এখানে থাকেন না। এখন এটা সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্মিত ’মাস্টারদা সূর্য সেন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’। কয়েক তলা ইটের ভবন। চারদিকটা দেয়ালঘেরা। পেছনে থাকার জন্য দু’টো ভবন। তার পেছনে একটা অপরিষ্কার পুকুর।

মাস্টার’দার স্মৃতিস্তম্ভটা প্রথমবার খুঁজে পেতে সময় লাগলো। একবার গেট দিয়ে ঢুকে কথা বলার মতো কাউকে না পেয়ে বেরিয়ে এলাম। বাইরেও কাউকে না পেয়ে আবারও ভেতরে ঢুকলাম। এবার একটু ভেতরে যেতেই হাতের বাঁয়ে চোখে পড়লো কালো রঙের চতুষ্কোণ একটা বেদী, একদিকে লেখা ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন স্মরণে ম্মৃতি সৌধ’। নির্মাণের সময় উল্লেখ নেই।

বেদীটাকে ঘিরে চারদিকে চারটা ত্রিভুজাকৃতির স্তম্ভ। মূল ভবনের আড়ালে থাকায় পুরো স্মৃতি স্তম্ভের ছবি তোলার মতো এতোটুকু জায়গা বের করতে পারলাম না!

নেই মাস্টার’দার কোনো আবক্ষ মূর্তি। বেশ অযত্নের ছাপ চোখে পড়লো। স্মৃতি স্তম্ভের চারদিকটা জংলা হয়ে আছে। পেছনের দিকের বড় হয়ে ওঠা ঘাসের জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়েছে মাত্রই, বোধহয় আগেরদিন।

সামনের দিকে একটা বকুল ফুলের গাছ বড় হচ্ছে। গাছটা ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর নিজ হাতে লাগানো। উনি এখানে এসেছিলেন ১৬ জানুয়ারি ২০১৮-তে।

এসব জায়গায় গেলে এমনিতেই নির্বাক হয়ে যাই। শ্রদ্ধা-ভক্তি মিলিয়ে কেমন যেনো একটা বোধ তৈরি হয় মনের ভেতর! এই তো গত মাসের ২৮ তারিখ চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর পাশ দিয়ে আসার সময় অযত্নে পড়ে থাকা প্রীতিলতার আবক্ষ মূর্তিটা দেখে এমনটাই বোধ হচ্ছিলো! বাসে ছিলাম বলে ছবি তোলা হয় নি অবশ্য!

যাকগে, ড্রাইভার তাহের এগুতে শুরু করলো নোয়াপাড়া বাজারের দিকে। এটা আলাদা ইউনিয়ন। বেশ বড় বাজার। অথচ রাস্তার মোড়েও মাস্টার’দার বাস্তুভিটার কোনো দিকনির্দেশক চোখে পড়লো না। এখানে উনার কোনো আবক্ষ মূর্তিরও খোঁজ পাওয়া গেলো না! মাস্টার’দাসহ তার শিষ্যদের আবক্ষ মূর্তিগুলো নাকি সবই চট্টগ্রামে! মাস্টার’দার নেতৃত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল একদল যুবক চট্টগ্রামকে চার দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করেছিলেন। ব্রিটিশরা সেই ক্ষোভে ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাকে চট্টগ্রাম জেলে ফাঁসিতে ঝুলিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, লোকজন যেনো তাকে ভক্তি-শ্রদ্ধা জানাতে না পারে সেজন্য তার মৃতদেহের সৎকারও করতে দেয় নি, ১৫ মন ওজনের পাথর বেঁধে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়েছিলো উনাকে! তারই শিষ্য বীরকন্যা প্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবস ছিলো ২৩ সেপ্টেম্বর। খেয়াল করে দেখলাম, জোয়ানকালে ‘বিপ্লবী’ আর প্রৌঢ় বয়সে ‘ঘোর সংসারী’ পরিচিতজনরাও এখন আর পুরোন দিনের বিপ্লবীদের তেমন একটা স্মরণে রাখতে পারছেন না! এটা কি আমাদের ‘বয়সের দোষ’, নাকি ব্রিটিশ কলোনিয়াল হ্যাঙ্গওভার চলছে এখনও!

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box