মায়া..

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জসিম মল্লিক,(টরন্টো থেকে)

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

এক.
অনেকদিন কিছু লেখা হয় না। ছোট ছোট পোষ্ট দেই এই টুকুই। যখন যা মনে আসে। সবমসয়ই আমি এমন। পরিকল্পনা করে কিছু লিখি না। লেখার আগে কিছু ভেবেও লিখতে বসি না। লিখতে ভাল লাগে তাই লিখি। আউলা ঝাউলা লেখা একেই বলে। কোনো মাথা মুণ্ডু নাই যার। বইমেলায় লোকজন যে আমার বই কিনেছে সেটাই অবাক কাণ্ড! যারা বইমেলায় যেতে পারেননি তারা অনলাইনে বই কিনেছেন। বই বাজার ডট কম বা রকমারি ডট কমে সব বই আছে আমার। কেউ কেউ আমাকে ছবিও পাঠিয়েছেন। অনেকেই মেলার মাঠে আমার অটোগ্রাফের জন্য অপেক্ষা করেছেন। খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার এটা! আমি সহজে আমার বই হাতে নেইনা। যদি কখনো বই হাতে নিয়ে পড়ি মনে হয় এসব আমি কি লিখেছি! বরং অন্যের বই পড়তে বসলে মনে হয় কি চমৎকার লেখা! এতো সুন্দর করে মানুষ কিভাবে লেখে! আমি কেনো পারি না! আমার আরো ভালো লেখার চেষ্টা করা উচিত। তখন মনে হয় লেখা হচ্ছে ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা। সবাই লিখতে পারে না।
বইমেলার সময়টায় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমি। বাইরের কোনো ভাবনা মাথায় স্থান করে নিতে পারেনি। প্রতিদিন নেশার ঘোরে চলে গেছি বাংলা একাডেমি। সেজন্যই তো এতোদূর থেকে ছুটে আসা। হাজার হাজার ডলার খরচ করা। প্রতিদিন নতুন নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেবো, পাঠক, লেখকের সঙ্গে দেখা হবে, আড্ডা হবে, আলোচনা শুনবো বিজ্ঞজনের, এসব চিরদিনের আরাধ্য আমার। কতকি জানার আছে। আটত্রিশ বছর ধরে দেখছি তাও দেখার শেষ হয় না। আমাকে কেউ চিনুক বা না চিনুক আমি কতজনকে চিনি। কত লেখক চিনি, কত প্রকাশক চিনি। মুগ্ধ হয়ে তাদের দেখি। আমার মুগ্ধতার কোনো শেষ নাই। অনেক নতুন নতুন লেখক দেখি প্রতিবছর, যাদের আগে কখনো দেখিনি, তাদের বই পাঠকরা কিনছে! আমি মুগ্ধ হই। সুবেশিদের দেখে মনে মনে বলি এতোদিন কোথায় ছিলেন! কেউ কেউ বই গিফট করেন। বলেন, পড়বেন। আমি লজ্জায় মরে যাই। আমাকে কেনো বই গিফট করবে! যারা পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক, যাদের বই এক মেলাতেই দুই তিনটা এডিশন শেষ হয়ে যায় বা যাদের আট দশটা বই প্রকাশিত হয় তাদের মনে হয় এই গ্রহের কেউ না। ইশ্ একটু যদি ছুঁয়ে দেখতে পারতাম তাদের!

স্ত্রী, ছেলে- মেয়ের সঙ্গে

দুই.
আসলে নানা ঘটনায় মনটা সুস্থির নাই আমার। বইমেলা শেষ হতেই একটা শোকের আবহ তৈরী হয়েছে মনে। কি যেনো নেই। বিকেলে কিছু করার থাকবে না ভেবেই এক তারিখে বরিশাল চলে যাই। যদিও মেলা দুইদিন বাড়ানো হয়েছিলো। সেই দুইদিন মেলা মিস করেছি। সে সময়টায় বরিশালে আমার স্বপ্নের লাইব্রেরির কাজ নিয়ে ব্যাস্ত ছিলাম। ঢাকা ফিরেই আমি অসুস্থ্য হয়ে পৱি। এক শুন্যতা ঘিরে ধৱেছে আমাকে, এক অজানা অস্থিরতা। যদিও অন্য যেকেনো সময়ের চেয়ে ঢাকায় আমি ভাল আছি, নিরাপদ এবং ভাল পরিবেশে আছি। আমার নিজের পছন্দমতো খাবার খাচ্ছি। আমার কোথাও কেউ নাই এটা যেমন সত্যি তেমনি আবার আমার অনেকেই আছে এটাও সত্যি। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমার ভিতরটা শূন্য হয়ে আছে। দেশে আসলেই এটা আমি টের পাই। পৃথিবীতে একমাত্র মায়েরাই সন্তানের কষ্ট বোঝে। ভিতরে অনেক চাপ নিয়ে আমি বেঁচে থাকি। আপাত আমাকে যতটা নির্ভার মনে হয় আমি তা না। এ থেকে সহজে মুক্তি পাওয়ার উপায় জানা নাই।
আমি একটু অভিমানি বলে আমার অনেক সমস্যা। অন্যের কাছে এসবের কোনো মূল্য নাই যদিও। আজকে একজন আত্মীয় বলেছে, ’আপনার ভিতরটা নারকেলের শাসের মতো নরম। আপনি রাগ ধরে রাখতে পারেন না’। কথাটা সত্য। আমি রাগ ধরে রাখতে পারি না। পারলে ভাল হতো। আমি নিজেকে বোঝাতে পারিনা ঠিকমতো। আমার যদি লেখা না থাকতো তাহলে বেঁচে থাকা আমার জন্য কঠিন হতো। আমার প্রতি অনেক অবিচার করে মানুষ। আমি সহজে কিছু পাই না। ফকটে কিছু মেলে না। আবার যা পাই তাও কম না। আমি অন্যের জন্য করতে আনন্দ পাই। আমি সবসময় একটা কথা বলি সেটা হলো, বন্ধুরাই আমার সব। স্ত্রী সন্তান আত্মীয়র উপরে আমি আমার বন্ধুদের স্থান দিয়ে রেখেছি । তারা নিঃস্বাৰ্থ। তারাই বেঁচে থাকার প্রেরনা। এই যেমন প্রতিবার বরিশাল যাই, বন্ধু পান্না ওর কাজকৰ্ম, বিজনেস রেখে আমাকে সময় দেয়। আমি স্বাৰ্থপৱেৱ মতো তা এনজয় করি। পান্না(Monirul Alam Panna) না থাকলে আমার বরিশালের দিনগুলো হয়ে উঠতো দুঃসহ।

তিন.
অনেকদিন ধরে দেশে আছি। আবার ফিরতে হবে। ফেরার সময় হয়ে যায় একদিন। না ফিরলে কি হয়! কিন্তু মায়া জিনিসটা বড্ড খারাপ। শুধু টানে। মাঝে মাঝে কথা হয় অৰ্ক, অরিত্রি বা জেসমিনের সঙ্গে। টুকি টাকি কথা। কখনো কখনো নিৰ্বিকাৱ থাকি। পাঁচ সাত দিনেও জেসমিনের সঙ্গে কথা হয় না, সেও ফোন করে না। হয়ত কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছে। হয়ত আমি কোনো দোষ করেছি। স্বামী স্ত্রীর সম্পৰ্কটাই এমন। রহস্যে ঘেরা। বোঝা যায় না কখন রোদ, কখন বৃষ্টি। এভাবেই টিকে থাকে সম্পৰ্ক। সেই তুলনায় সন্তানরা অনেক সহজ। কোনো টানাপোড়েন নাই, মান অভিমানও নাই, আমার ছেলে মেয়েরা এমনই। কোনো অভিযোগ করে না, ভুল ধরে না। যেখানেই থাকি তাদের বাবা হ্যাপি থাকলেই তারা খুশী।

একুশের বইমেলাতে

একদিন হোয়টসঅ্যাপে অৰ্কৱ ম্যাসেজ, হাউ আর ইউ বাবা! হাউ ইজ বইমেলা গোয়িং!
অৰ্ক অনেকদিন পর খবর নিলো। আমিও কিছু লিখিনি কিন্তু খবর নেই অরিত্রির কাছ থেকে।
তুমিতো ভুলেই গেছো। একটু পেটেৱ সমস্যায় ভুগতেছি। মনে হয় ফুড পয়জনিং। খাতিজা কেমন আছে!
বি কেয়ারফুল উইথ হোয়াট ইউ ইট বাবা। মি এন্ড খাতিজা আর গুড। ওয়েদার রিয়েলি ব্যাড হিয়ার।
এইটুকুই কথা হয় আমাদের।
অরিত্রিকে ফোন করি। ফোন ধরে না। কুইক রিপ্লাই দেয়..
আই্ এম এট ওয়াৰ্ক। কল ইউ লেটার।
আমি লিখি, হাউ আর ইউ? সাদেৱ হাতেৱ অবস্থা কেমন!
আই এম গুড, উই আর ওয়াৰ্কিং ফ্রম হোম টুডে বিকজ দেয়ার ওয়াজ আ স্নো স্টৰ্ম।
সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ কইরো।
ওকে বাবা। তোমার বই কেমন!
ভালই।
বাবা তোমার কখন এরাইভাল টরন্টোতে!
সকালে।
ওকে তোমাকে পিকআপ করতে আসবো।
জেসমিনকে ফোন করি, এক সপ্তাহ পর কথা হচ্ছে। একটু লজ্জা লাগে। আগেও এমন হয়েছে। একটানা একমাসও কথা হয়নি।
আমার শরীর ভাল না।
শরীর খারাপ হলেই আমার কথা মনে পরে! তিরিশ বছর ধরে তাই দেখতেছি। এমনি তো আমার কথা মনে থাকে না। কি হইছে!
পেটে সমস্যা। ব্যাক পেইন।
দেশে গেলেই তোমার নানা সমস্যা হয়। বাইরের খাবার খাবা না। পানি একদম না।
এতোদিন ফোন করো নাই কেনো! আমি বলি।
তুমিও করো নাই। ফোন করলেই তো ক্ষেপে যাও তাই করি নাই।
আমি চুপ করে থাকি। সে বলে আমার কথাতো মনেও থাকে না তোমার।
মনে থাকে। বিদ্যা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]