মায়ের কপালে চুমু খেলেই টের পাই নাড়ীর বন্ধন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজামুল হক বিপুল

না শহর, না গ্রাম। কি লিখব বুঝে উঠতে পারছি না। শহর না গ্রামের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করবো ঠিক ঠাওহর করতে পারছি না। কারণ আমার জš§ মাটি ‘রাজনগর’ একটি উপজেলা শহর। যেটি জেলা শহর মৌলভীবাজারের একেবারেই কাছে। আবার আমার শহরকে যদি শহর বলি তাহলে শহরকে খাটো করা হবে। আবার গ্রাম না বললে গ্রামের প্রতি অবহেলা করা হবে। সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হবে আমার শহর ‘রাজনগর’অনেকটা শংকর প্রজাতির। শহর এবং গ্রামের বৈশিষ্ঠ্য দুই-ই আছে এখানে। তবে গ্রামের আধিক্যতাই বেশি।
রাজনগর উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রেই আমার বাড়ি। গ্রামের নাম পদিনাপুর। এখানেই চারপাশ সবুজে ঘেরা ‘হক ভিলা’ নামের বাড়িতেই জš§। তাই আমার শহরই আমার গ্রাম, তার সঙ্গে আমার নিবড়ি সম্পর্ক। নাড়ীর বন্ধন। প্রেমের সম্পর্ক। ভালোবাসার সম্পর্ক। এই সম্পর্ক কখনই বিচ্ছেদের নয়। এই সম্পর্কই আমাকে জš§ মাটির গন্ধ সুধাতে টেনে নিয়ে যায়। যেখানে গেলে আমি হারিয়ে যাই আমার শৈশব, আমার কৈশোর, আমার তারুণ্যে। হারিয়ে যাই বাল্যবন্ধুদের মধ্যে। আড্ডায় মেতে উঠি স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গ।ে নাড়ীর বন্ধন টের পাই অসুস্থ মায়ের কপালে চুমু খেয়ে, বাপ-দাদা’র পৈত্রিক ভিটায় পা দিলেই।
আমাদের বাড়িটি ছিল একান্নবর্তি পরিবার। যদিও এখন আর একান্নবর্তি পরিবার নেই। তবে পারিবারিক বন্ধনটা এখনও আগের মতই অটুট। এখনও একে অন্যের সুখ-দুঃখে ছুটে যাই। বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়াই ছায়ার মত।

চা বাজানের মধ্য দিয়ে চলে গেছে রাজনগর কুলাউড়া সড়ক

আমি বেড়ে উঠেছি রাজনগরে। এখানকার আলো-বাতাসে। এখানকার গাছা-পালা, মাটি, ভোরের শিশির, শ্রাবনের তুমুল বৃষ্টি, বসন্তে কোকিলের ডাক, ফাগুনের হিমেল হাওয়া, ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি সবই আমার পরিচিত। এখনও কানে বাজে এগুলো। ছুটে যেতে মন চ্য়া। খুব ভোরে মৌলভীর কাছে আরবী শিক্ষা, অতঃপর স্কুলের পড়ালেখা, দলবেঁধে স্কুলে যাওয়া সে কি মজার দিনগুলো।
পাঠশালা থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবনের পুরোটাই কেটেছে রাজনগরে। বাড়ির কাছে পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ দূরত্বের রাজনগর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠশালা চুকে মাধ্যমিকের সিঁড়িতে পা রেখেছিলাম শতবর্ষী রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যে তিন-চারটি শতবর্ষী বিদ্যালয় রয়েছে তার একটি এই পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এখান থেকে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বের হয়েছেন। যারা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমার গর্ব হয় আমি এখানেই লেখাপড়া করেছি।

চা বাগানের ভেতরে লেক। শীতে মৌসুমি পাখির মেলা বসে এখানে

আশির দশকের মাঝামাঝি এই বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েই পরিচয় ঘটেছিল আবদুর রাজ্জাক স্যারের সঙ্গ।ে তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের হেড স্যার (প্রধান শিক্ষক)। প্রায় ২৬-২৭ বছর এই দায়িত্বে থেকে তিনি বিদ্যালয়টিকে রেখেছিলেন আলোকিত করে। স্যারকে আমরা বন্ধুরা মিলে ডাকতাম গালিভার বলে। বন্ধু বলতে আমি, লুৎফুর, লিটন, রুজেল, মুন্না, শোয়েব, ইলিয়াস, গোলাম কিবরিয়া জুয়েল, ঝন্টু। স্যারের ছেলে ইফতেখারও ছিল আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। সে এখন সুদূর আমেরিকায়। স্যার আমাদের ক্লাসে গালিভার ট্রাভেলস পড়াতেন। আর স্যার আমাকে ডাকতেন লিলিপুট বলে। স্যারকে আমরা সবাই মানে বিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রী ভয় পেতাম। যেমন আদর ভালোবাসায় আমাদের আগলে রাখতেন, যতœ করে পড়াতেন, তেমনি কঠিন শাসন করতেন। স্যারের একটা গুণ ছিল- কোন ক্লাসে কেউ দুষ্ঠুমি বা ঝগড়া করলে বিষয়টি স্যারের কান পর্যন্ত নিয়ে গেলে স্যার শুধু অভিযোগকারী এবং অভিযুক্তকেই শাসন করতেন না, তিনি ক্লাসে ঢুকে সবাইকে বেঁত দিয়ে পেটাতেন। এই সময় যারা হাইডেক্সের নিচে ঢুকে যেতো তারা স্যারের মার থেকে রক্ষা পেতো।

সাকেরা চা বাগান

আজ সেই হেড স্যার নেই। স্যারকে ভীষণ মিস করি। আশির দশকের শেষ দিকে ষড়যন্ত্র করে স্যারকে বিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করার পর থেকে যেন আমাদের শতবর্ষী এই বিদ্যালয়টি কষ্টে আছে। নানা কারণে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। আজ যখন প্রতি উপজেলায় একটি করে বিদ্যালয় সরকারি হচ্ছে তখন আমার এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানটি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বহু মেধাবীর জন্ম দেয়া এই বিদ্যালয়টি নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের কথা শুনতে পাই।
এই বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই আমরা বন্ধুবান্ধবরা টিফিনের সময় মেতে উঠতাম কখনও খেলাধুলায় কখনও বা তুমুল আড্ডায়। আমাদের এই আড্ডা হতো বিদ্যালয়ের সামনে শহীদ মিনার সংলগ্ন জামতলায়। কিংবা জামতলা মোড়ের প্রণব দা’র টেইলারিং শপ।ে চলতো মালাই, আইসক্রিম, বাদাম খ্ওায়ার প্রতিযোগিতাও। আর সুযোগ পেলে চলে যেতাম রাজনৈতিক দলের মিছিলে। আজ জামতলার সেই জামগাছ নেই। প্রণব দা’র দোকানও নেই। পুরনো শহীদ মিনারও নেই। তবে সে জায়গায় নতুন একটি শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে।

উপজেলা পরিষদের সামনে একাত্তরের শহীদদের স্মরণে স্মতিস্তম্ভ।

আমাদের উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে শান্তিবাবুর বাড়িতে এ অঞ্চলের সব চেয়ে বড় দুর্গোৎসব হয়। এই পূজা মন্ডপের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানকার দূর্গার রং লাল। তাই দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষ ছুটে আসেন পাঁচগাঁওয়ে। স্কুল ও কলেজ জীবনে আমরা বন্ধুবান্ধবরা মিলে প্রতিবছর ছুটে যেতাম সেই দূর্গোৎসবে। কিন্তু এখন আর সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয় না।
একাত্তরে এই পাঁচগাঁওয়ে পাকবাহিনী ‘গণহত্যা’ চালিয়েছিল। ৬৪ জন নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষেকে গুলি করে হত্যা করেছিল। তাদের মরদেহ ফেলে দিয়েছিল সেখানকার সরকারবাজার দীঘিতে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল। এলাকায় থাকতে সুযোগ পেলেই ছুটে যেতাম সেই শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে তাদের কথা শুনতাম। লিখার চেষ্টা করতাম। সেই শহীদদের স্মরণে উপজেলা সদরে একেবারে উপজেলা পরিষরেদর সামনে ‘স্মতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছে।
স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে প্রবেশ করেছি। সেটাও রাজনগর ডিগ্রি কলেজে। কলেজে পড়ার সময় সব বাদ দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে নিমগ্ন ছিলাম। মিছিল-মিটিং করে বেড়াতাম। সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতাম। সমাজতন্ত্রের কথা বলতাম। দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর কথা বলতাম। আর ১৯৯২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েই শখের বশে নিজেকে জড়িয়ে নিলাম সাংবাদিকতার সঙ্গ।ে ভোরের কাগজ আর সিলেট থেকে প্রকাশিত লোকমান ভাইয়ের (জাসদ নেতা লোকমান আহমেদ) মালিকানাধীন আজকের সিলেট-এ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করলাম। ধীরে ধীরে আমার এই শখ নেশায় রূপান্তুরিত হল, অতঃপর পেশায়। আর এই পেশায় নিজেকে জড়িয়ে মফস্বলে থাকাকালে কতো না ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তখন ছায়ার মত সঙ্গী হিসেবে পাশে পেয়েছিলাম শিক্ষক সাংবাদিক মসুদ আহমেদ, আবদুল আজিজসহ আরো অনেককে।

ভাঙারহাটে মনু নদী

তবে ছাত্রজীবন বা সাংবাদিকতা জীবনে মন খারাপের দিনে ছুটে যেতাম প্রিয় মনু নদীর কাছে। কিংবা সাকেরা চা বাগানে। লেকের পাড়ে। ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি শুনতে… পাখির কলরব শুনতে…। রাজনগর সদর থেকে মাত্র মাইল তিনেক দূরে ভাঙ্গারহাট। সেখান দিয়ে মনু নদী বহে গেছে। নদীর পাড়ে যেতাম, সেখানে বসে বসে আখের রস খেতাম। দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিতাম। এই ভাঙ্গারহাটে চৈত্র মাসে ‘বারুণী মেলা’ হতো। ছোটবেলায় সেই মেলায় যাবার জন্য মায়ের কাছে কত না বায়না ধরতাম। এখনও সেই মেলা বসে, আমি কিন্তু যেতে পারি না।
উপজেলা সদর সংলগ্ন সাকেরা চা (বর্তমানে মাথিউরা) বাগানে ছুটে যেতাম। ছোট ভাই, বন্ধু সত্য নাইডু, মোজাহিদ, স্বপনদের সঙ্গে মিলে আড্ডা দিতাম। শীত আর বসন্তের সাকেরা চা বাগানই আমাকে বেশি কাছে ডাকতো। শীতে দেখা মিলতো সাইবেরীয় অঞ্চল থেকে ছুটে আসা বাগানের লেকে সাময়িক আশ্রয় নেয়া অতিথি পাখির। আর ফাগুনের এই সময়টায় বাগানে ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি, সেই পাতার উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মজাই আলাদা। বর্ষায় চা-বাগানের ঘন সবুজ দৃশ্য মন ভরিয়ে দিত। এসবই এখন অতীত হয়ে গেছে। জীবন-জীবকিার যুদ্ধের কাছে যেন হার মানছে অতীত। তবে এখনও সুযোগ পেলে ছুটে যাই গ্রামে। ছুটে যাই সেইসব স্থানে। ঘন সবুজের কাছে। সেই সব বন্ধু, ছোট ভাইদের কাছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও হারিয়ে য্ইা সোনালী অতীতে। যেন বেঁচে থাকার অক্সিজেন পাই সেখান থেকে। অতীত তুমি বড়ই মধুর, বড়ই মধুর…।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]