মিশন সাবরং বেড়িবাঁধ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালমা রহমান শুভ্রা

মেরিন ড্রাইভ রোড চালুর পর থেকে একটা খায়েস ছিলো বাইকে এর শেষমাথা সাবরাং বেড়িবাঁধ পর্যন্ত যাবার। খায়েসটা পূরণের সুযোগ নিয়েছিলাম দু’বছর আগে রুবাইয়া আসায়। ও ছাড়া এই সুযোগটা হয়তো পাওয়াই যেতো না!

জুলাই ৩১, ২০১৯। কক্স বাইক থেকে রুবাইয়া আধাঘণ্টা সময় নিয়ে দেখেশুনে একটা স্কুটি নিয়ে এলো দুপুরে। শর্ত, রাস্তা ফাঁকা থাকলেও ঘণ্টায় ৮০ কি.মি.র বেশি তোলা যাবে না! ক্যাম্প ভিজিটে যেতে হলে ড্রাইভারদের জন্য বেঁধে দেয়া এই গতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম, যদিও প্রথমদিকে গতিসীমা ছিলো ঘণ্টায় ৬০ কি.মি.! সেসময় মেরিন ড্রাইভের কানেক্টিং রোডে কাজ চলছিলো। ক্যাম্পমুখী সব গাড়িগুলোকে তাই সায়েমন বিচ ধরে সাগরের ঢেউ গুণেগুণে বালুময় অস্থায়ী বিচরোড ধরে যেতে হতো। সেদিন বাসা থেকে বেরুনোর সময় সাগরে ভাটা চলায় অস্থায়ী রাস্তায় নেমে পড়লাম কলাতলী বিচ ধরে। হিমছড়িতে চায়ের বিরতি দিলাম। যাত্রাপথে দু’বার চেকপোস্টে দাঁড়াতে হলো ভ্রমণের উদ্দেশ্য জানাতে। হাসিমুখেই পার করা গেলো চেকপোস্ট।

টানা দু’ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম অভিষ্ঠ লক্ষ্যে, সাবরাং জিরো পয়েন্টে। আশি কি.মি. দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ রোডের পাকা অংশটা ওখানেই শেষ হয়েছে। আধা ঘণ্টার বিরতিতে বৈকালিন নাস্তা হলো টেকনাফের বিখ্যাত ডাব দিয়ে। ফিরতি পথ ধরলাম পৌনে ছয়টায়। এপর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিলো। বিপত্তি বাধলো ইনানীতে রয়্যাল টিউলিপ হোটেল পেরুনোর পরপরই। ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে হঠাৎই বৃষ্টি! এরইমধ্যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।

রাস্তায় বাইক থামিয়ে রেইনকোট পরার আগেই ভিজে একাকার! বাতাসের তোড়ে রেইনকোটের ওপরের পার্টের আগা-মাথা খু্ঁজে পাচ্ছিলাম না! রুবাইয়া সাহায্য করলো পড়তে। লাভ হলো না! বৃষ্টি ক্রমশ বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়ে প্রায় দৌড়ে ঢুকতে হলো ইনানি বিচ ক্যাফেতে। দু’জনই ক্ষুধায় অস্থির! এদিকে বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণই নেই! প্রায় এক ঘণ্টার বাধ্যতামূলক বিরতিপর্বে নাস্তা হলো স্যুপি নুডলস, সঙ্গে নেয়া স্যামন ফ্রাই আর কক্সবাজারের বিখ্যাত ছোট সাইজের পিঁয়াজু দিয়ে। ভরপেট খাওয়াশেষে বিশাল এক মগ ক্যাপাচিনো দু’জনে ভাগ করে খেলাম।

বৃষ্টি খানিকটা ধরে আসতেই আবারও যাত্রা শুরু। কিন্তু একটু পরই কোণাকুণি পড়তে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা তীরের মতো গালে-মুখে বিঁধতে শুরু করলো! ততোক্ষণে রাত আটটা বেজে গেছে, কাজেই পথে আর কোথাও থামার সুযোগ ছিলো না। সাধারণত সাগরে ভাটা থাকলে মেরিন ড্রাইভের কানেক্টিং রোডের মাথায় এসে ম্যাগ ডেরিন রেস্টুরেন্ট পেড়িয়ে বাঁয়ে বিচে নেমে যায় গাড়িগুলো। কিন্তু তখন জোয়ার চলছিলো।

যাবার সময় এই হিসাবটা আমাদের মাথায় ছিলো না! যাকগে, আন্ডারকনস্ট্রাকসন রোড ধরে একটু সামনে এসে বাঁয়ে বিচে নেমে পড়তে হলো। কিছু ভলান্টিয়ার সাহায্য করছিলো ভেজা বালিতে আটকেপড়া বাহনগুলোকে ঢেলে বিচে নামিয়ে দিতে। বেশ কিছুদূর আগানোর পর সাগরের পানির মধ্যে ভেজা বালিতে স্কুটি আটকে গেলো! নেমে ঠেলা দিয়ে জায়গাটা পার করিয়ে স্কুটি নিয়ে রুবাইয়াকে সামনে পাঠালাম। নিজে হাঁটা শুরু করলাম সাগরের পানিতে পা ভিজিয়ে। নিজেরই ভয় লাগছিলো নির্জন বিচে স্কুটিটা পানিতে কিংবা বালিতে আটকা পড়লে কি করবো ভেবে! বেচারি একটু সামনে যাবার পর আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো।

বাকিটা পথ নির্বিঘ্নেই পার হওয়া গেলো। দু’জনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম সায়েমন হোটেলের সামনে এসে। স্কুটি ভাড়া করেছিলাম ৫ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু ঘটনাবহুল সেই যাত্রা শেষ হলো সাড়ে ছয় ঘণ্টায়! সোয়া তিনটা থেকে পৌনে নয়টা। মিশন সাকসেসফুলি শেষ হওয়ায় বাসায় ঢুকে হাই ফাইভ দিয়ে পরস্পরকে অভিনন্দন জানালাম আমরা! খুশির ঠেলায় একদফা ক্যাপাচিনো বানালো রুবাইয়া। দিন শেষ হলো ডিমভাজি, লইট্টা শুটকিভুনা আর বুটের ডাল দিয়ে খিচুড়ি সহযোগে। জীবনে আরেকটা মাইলস্টোন যোগ হলো সেদিন! থ্যাঙ্কু মা! ইন শা আল্লাহ এরকম মিশনে আবারও নেমে পড়বো দু’জনে। মনে আছে তো, তোমার বাইক নিয়ে এবার আমাদের শাহপরীর দ্বীপ যাবার কথা?

ছবি: লেখক

 

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box