মুক্তিযুদ্ধে খিলক্ষেত ও যুদ্ধাস্ত্র ‘জুইতাগাণ’

আতিক দর্জী

১৯৭১ সালের পহেলা এপ্রিল….! ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের খিলক্ষেত এলাকাবাসির জন্য গৌরবময় স্মরণীয় একটি দিন । একই সঙ্গে দু:খ বেদনারও ! পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকান্ডের শিকার হন খিলক্ষেতের তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান দর্জী ও ওয়াহেদ আলী দর্জী সহ প্রায় ১৭ নিরীহ লোক ! জয় বাংলা বলার অপরাধে এক পাগলিকে নির্মভাবে গুলি করে হত্যা করে পাক আর্মি ! ৭১ এর এই দিনে খিলক্ষেতবাসি প্রবল প্রতিরোধ গড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো । যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঢাকার খিলক্ষেতের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জনাব আবুল হোসেন দর্জী । তৎকালীন খিলক্ষেত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন দর্জীর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় । ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে আহবায়ক নির্বাচন করা হয় । বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের খিলক্ষেত সহ আশেপাশের এলাকায় জনসাধারণকে ব্যাপক ভাবে সংগঠিত করার ব্যাপারে তাঁর বিশাল ভূমিকা রয়েছে । ক্যান্টনমেন্টের অতি নিকটে হওয়ায় পাক আর্মির নজর ছিলো খিলক্ষেতের উপর ! প্রায় প্রতিদিনই টহলের নামে খিলক্ষেতে চলতো সাধারণ জনগণের উপর অমানুষিক অত্যাচার নির্যাতন আর লুটতরাজ । এলাকার নারীদের অসম্মান করতো তারা! প্রতি দিনের মতো পহেলা এপ্রিল ১৯৭১ সালে পাক আর্মি খিলক্ষেত এলাকায় বাড়ি ঘরে ঢুকে লুটপাট চালায় ! ঘরে ঘরে ঢুকে নারীদের সঙ্গে অসম্মান জনক আচরণ করলে এলাকার তরুণ যুবকদের নিয়ে পাল্টা আক্রমন করে পাক বাহিনীকে দিশাহারা করে ফেলেন আবুল হোসেন দর্জী! এক পর্যায় গুলি করতে করতে পিছু হটে পাকবাহিনী ! দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন আবুল হোসেন দর্জী ও তাঁর দল ! ! দেশীয় মাছ ধরার কোচ (খিলক্ষেতের স্থানীয় ভাষায় ‘ জুইতা’ ) নিক্ষেপ করলে পাক আর্মির এক সদস্যের পিছনে তা গেঁথে যায়! গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা সিএমএইচ এ তাকে ভর্তি করলে পরবর্তীতে সে মারা যায়! এসব ‘জুইতা’ এতোই ভয়াবহ যে টানলে তা আরও ভিতরে ঢুকে যায়! এরকম অস্বাভাবিক ও অচেনা অস্ত্রের আঘাতে সহকর্মীর মৃত্যুতে পুরো ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে আতংক সৃষ্টি হয়! সিএমএইচে কাজ করা স্থানীয় বাঙ্গালীদের কাছে এই ‘যুদ্ধাস্ত্রের’ নাম জানতে চাইলে তাঁরা কায়দা করে এটার নাম বলে দেয় ‘ জুইতা গান’ এবং এটা যে অনেক ভয়াবহ অস্ত্র তাও কৌশলে তাদের জানিয়ে দেয়! ক্যান্টনমেন্টে আতংক আরও বাড়ে ! সারা দেশের মতো বিশ্বজুড়ে এই ‘জুইতা গানের’ কথা ছড়িয়ে পড়ে ! মিডিয়ায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে! মুক্তিযুদ্ধে জনাব আবুল হোসেন দর্জীর এই বীরত্বপুর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধ প্রশংসিত হলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম তালিকাভূক্ত হয় নাই ! অসম্মানজনক মুক্তিযোদ্ধা বাছাই প্রক্রিয়া এবং বিগত সরকার গুলোর মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী মনোভাবের কারনে তিনি কখনও এসব আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই ! খিলক্ষেত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক হিসেবে ৭০ এর নির্বাচিত আর ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা ছাড়াও খিলক্ষেতে আজকে আওয়ামী লীগের এই শক্তিশালী অবস্থানের পিছনে তাঁর অনেক অবদান! আজ পহেলা এপ্রিল খিলক্ষেতবাসী সহ সারা দেশবাসী আমার চাচা জনাব আবুল হোসেন দর্জীর মুক্তিযুদ্ধের এ.ই বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে !.