মুক্তি শক্তি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

ফারহানা নীলা

খুট করে একটা শব্দ হলো জানালার পাশে। শীতের রাত, কুয়াশায় মোড়া সবদিক। মোটা কাঁথার নীচেও ওম হয় না। টিনের চালে টুপ টুপ করে কুয়াশা পড়ছে। হারিকেনটা নিভিয়ে সবে বিছানায় শুয়েছে নুরী।
সারাদিন কামকাজে শরীরটা অবশ হয়ে আসে। আজ কাজ করতে গিয়েছিলো চিনেখরা। বাসে করে যেতে হয়। গত কয়েক মাস এই কাজ করছে নুরী। ঝোলায় সেলাইয়ের জিনিসপত্র। ঘরে বসে জামা, ব্লাউজ,কাঁথা সেলাই করে। তারপর বাড়ী বাড়ী দিয়ে আসে। চিনেখরায় খালার বাড়ি।  বেড়াতে গিয়ে বেশ বড় একটা অর্ডার পেয়েছিলো। পাশেই ছেলেটা বেঘোর ঘুমে। খুব শখ করে নাম রেখেছিলো সেতু। বয়স পাঁচ বছর। সেতুর শরীরটা ভাল যায় না। শীত এলেই শ্বাসকষ্ট আর কাশি শুরু হয়। হোমিওপ্যাথ খাওয়ায় বছর ভর। তবুও ছেলেটা কাশে আর হাঁপায়। আজ অবশ্য কাশটা কম।

…. নুরী! নুরী!  দরজা খোল। চাপা স্বরে মিজানের গলা শোনা যায়।

… আপনে কোন্থেন আইলেন? কাঁথা থেকে বের হয়ে দরজার হুড়কো খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করে নুরী।

…. আগে খোলোক তো দরজা। খবরদার আলো জ্বালসনি কোইল। সব কবোনে তোক।

বিধ্বস্ত একটা মানুষ ঘরে ঢোকে। অন্ধকারে ভাল করে মুখটা দেখা যায় না। মানুষটার মুখের দাঁড়ি ঠিকই বোঝা যায় তাও।
বাড়ী থেকে যখন যুদ্ধে যায় তখন মিজান তাগড়া যুবক। টগবগ রক্তের ভীষণ সাহসী একজন।
কি জানি কোন ভাষণ শুনে এসে রাতে ভাত খেতে খেতে বলেছিল… দ্যাশটা কি মগের মুল্লুক? শালারা সব খাইবের চায়। আগারটাও আবার গোড়ারটাও!
শেখের বেটা আজ যে ভাষণ কইলো কেউ আর বাড়ীত থাকপিনানে। সবাইক যুদ্ধের ডাক দেছে। বুঝলি বউ!

নুরী তখন সেতুকে খাওয়াতে খাওয়াতে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

…. কিসের যুদ্ধ? কোনে যুদ্ধ?  এসব কি কন আবোলতাবোল?
আজিজ মাস্টরের বাড়ীত সবাই কত কথা কচ্ছিলো আর হাইসে হাইসে রগড় করতেছিলো। কই তারা তো কিছু কইলো না।

….. তুই ওহানে গেছিলি কেন? মিজান জানতে চায়।

… এম্বাই গেলেম।

তার করদিন পর মিজান মুক্তি হয়। সেদিন সেতুর গা ভর্তি জ্বর। কারা যেন আসলো রাতেরবেলা। ফিসফিস কথা বললো। তারপর মিজান ঘরে এসে নুরীকে বিদায় বলে চলে গেলো।
…. সাবধানে থাকিস। ছাওয়ালডাক দেইখে রাখিস। ফাঁক মত আসপোনে!

মিজান আজ এতদিন পর এসেছে। ভোর হয় হয়। মিজানের হাতে লম্বা একটা কি জানি? রাইফেল নাকি ওটা!
এই কদিনে মিজানের চেহারা বদলে গেছে। বয়স বেড়ে গেছে অনেক।
সেতু এখন কাশছে। এখুনি জেগে যাবে কাশির দমকে। মিজান সেতুর মুখোমুখি হতে চায় না।

… বউ শোনেক। একখান জিনিস থুয়ে গেলাম। সকাল হলি পর গাঙের ঐপারে বটতলায় যাবি। একজন লোক আইসে হক মওলা কলি পরে তাক ওইটা দিয়ে চইলে আসপি।

…. কি কন এসব? কি জিনিস? চিনিনে জানিনে কাউক! কাক কি দেবোনে আর কি হবিনি?

…. সময় নাই আমার। কথা বাড়াস না নুরী। সময় খুব খারাপ। দ্যাশে যুদ্ধ। ভুল করিস না কইলেম। তালিপর বিপদে পড়বোনে আমি।

নুরীকে গালে একটা আদর করে ঝটকায় চলে যায় মিজান।
গাঙের কুল দিয়ে হেঁটে বাড়ীর পথে নুরী।কাজটা ঠিকমতই হলো। লোকটার মুখও দেখেনি নুরী। জিনিসটা দিয়েই চলে আসছিলো। কিন্ত লোকটা পিছুডাক দিলো। একটা চিঠি হাতে দিয়ে বললো….  রাইতে একজন বাড়ীর পর আসপিনি। ভিক্ষা চালি পর এইটা দিতে হবি।
শাড়ীর আঁচলে গিঁট দিয়ে চিন্তার সাগরে ডুবে যায় নুরী।

বাড়ীর উঠোনে অনেক লোক। আজিজ মাষ্টার চেয়ার নিয়ে বসে আছে। সেতু মার্বেল খেলছে।
এত লোক দেখে হকচকিয়ে যায নুরী।
…. কি হয়ছে? আপনেরা সব এহানে ক্যা?

….. কোনে গেছিলু নুরী? আজিজ মাস্টারের ঠোঁটে চাপা হাসি। মিজান কোনে? ও নাকি মুক্তি হয়ছে?

…. তা জানি নে আমি। নুরীর গলা কেঁপে ওঠে। সে বাড়ীত নাই।

….. আইচ্ছা আসলি পর আমার সাথে  দেহা করবের কইস। কাম আছে।

…. মাথায় ঘোমটা টানতে টানতে নুরী উত্তর দেয় –কবোনে।
সেলাইয়ের ঝোলাটা আজ বেশ ভারী। মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে সেতুকে পাশের বাড়ীতে রেখে বের হয় নুরী। রূপকথার মোড় পাড় হয়ে বাঁদিকে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে টের পায়  ঘামছে সে। ভয়ে চারিদিকে তাকায়। আরেক দূরেই একটা মুদি দোকান। ওখানে গিয়ে লবন কিনতে চাইতে হবে।
….. এক প্যাকেট লবন!
লোকটা লবন দিয়ে হাত বাড়ায়। নুরী একটা খাম দেয় টাকার সঙ্গে।
তারপর কোনো কথা না বলে চলে আসে।

বাড়ীর পথে আসতেই টের পায় কেউ তার পিছু নিয়েছে। সন্ধ্যা হয় হয়। নুরীর গা ছমছম করে। তাড়াতাড়ি পা ফেলে এগোয়।  পেছনে নির্দিষ্ট দূরত্বে দুজন আসছে।

আজিজ মাষ্টার ডেকে পাঠিয়েছে। নুরীর কেন যেন আজ ভয় করে না। নিজের ভেতর মুক্তি জেগে ওঠে।
আজিজ মাস্টারের লোকদের বলে রাইতে আসপোনে। এবেলা ম্যালা কাজ।

গতরাতে মিজান এসেছিলো। খামের সঙ্গে একটা ব্যাগ রেখে গেছে। নুরী ঘরের ডোয়া খুড়ে ব্যাগটা লুকিয়ে রাখে।
আজিজ মাস্টারের বাড়ীতে যায় না।

…. নুরী তোক না মাস্টার ডাইকলো! আাজিজ মাস্টারের দলবল এসেছে।
… শরীরডা ভালা না। কাইল যাবোনে। নুরী আর কথা বাড়ায় না।

কাচারীঘরে বসে আজিজ মাষ্টার হুঙ্কার ছাড়ে। এতগুলো লোক একটা মেয়েক নিয়ে আসতি পাইরলো না?
আজ কর্নেল সাহেবকে কি জবাব দেবে আজিজ মাষ্টার?

অমাবস্যা নাকি আজ? নুরী ধীরে হেঁটে যায় মাস্টারের বাড়ীর কাছে। সব ঘুমে। নুরী ব্যাগটা খুলে দাঁত দিয়ে কি জানি করে? বিকট একটা শব্দ….  মাস্টরের ঘরে আগুন।
নুরী ততক্ষণে ঘরে…. সেতুর পাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ে।
নিজের ভেতর মুক্তির শক্তি টের পায় নুরী। একটুও ভয় করে না। মনে মনে বলে শালার রাজাকারের গুষ্টি কিলাই।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]