মুখার্জীদার বউ

সুকন্যা সাহা

আমরা  মেয়েরা  এই একবিংশ শতাব্দীতেও খুঁজে চলেছি  নিজেদের নাম পরিচয় , অস্তিত্ব  হয়তো বা বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি , বরের বাড়ির  বাইরে নিজেদের বাড়িও।

এই প্রসঙ্গে   একটা  কবিতার লাইন মনে  পড়ে গেল , ‘সেই মেয়েটার  নিজেরও এক ঘর ছিল  শেষবেলাতে   সেই ঘরে সে পর ছিল…

 অর্থাৎ এই যে  আমারা ভালবাসার ঘর  সংসার সাজিয়ে  তুলি সাজিয়ে  রাখি , তৈরী করি হোম সুইট হোম,  যেখানে  আমরা বেঁচে  থাকি  কারো বউ কারো মা  কারো স্ত্রী  এই পরিচয়ে  অন্য লোকের  পদবীর সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে – কারণ  আর কিছুই নয় আমরা এই মায়া জড়ানো সংসারটাকে বড় ভালবাসি যে…  কিন্তু সেই ঘর কি কখনও আমাদের নিজের  হয় ? নাকি আমরা চিরদিন  উদ্বাস্তু , মূলছিন্ন ?

রিফিউজি কলোনীতে  পাশাপাশি  থাকা  মানুষগুলো যেমন পরস্পর জড়িয়ে  থাকে , সেই জায়গাটাকেই

ভাবতে থাকে  নিজের দেশ বলে  আমরা সংসারে শাশুড়ি বউমা  সবাই সেই স্বমূল থেকে  উৎপাটিত রিফিউজি, আজীবন ভুগি অস্তিত্বের সংকটে  আর খুঁজে  যাই নিজেদের নাম পরিচয়… আমাদের   এই খোঁজা কি কখনও শেষ হবে ? প্রশ্ন তুলে   দিয়েছে   এই ছবি …

কাহিনীর শুরু হয়েছে বাড়ির কর্তা ঈশ্বর চন্দ্র মুখার্জীর  পারলৌকিক ক্রিয়ার  দিনটি থেকে। শ্বশুর মশাই মারা গেলেও শাশুড়ি শোভারাণীর , মুখার্জীদার  বউ এই পরিচয় ঘোচে  না;  বরং  পর্দায় ফুটে  ওঠা নেমেপ্লেটে বাড়ির  দুই কর্তার নাম জানান দেয়  মেয়েদের  কোনো বাড়ি হয় না।

তারা হোম মিনিস্টার হলেও তাদের নামের  নেমপ্লেট থাকে না , পুরুষ শাসিত সমাজের   এটাই রেওয়াজ । কাহিনীর গল্প আবর্তিত হয় শাশুড়ি শোভারাণী আর  বউমা অদিতি , যারা  দুজনেই পরিচিত  মুখার্জীদার বউ হিসেবে , মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী বাড়ির যুযুধান দুই পক্ষ  … আজীবন যাদের সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়

তাদের নিয়ে ।

                           একটা  বয়েস সে  দেশে  ছেড়ে  এলাম

                            একটা বয়েস নিয়ে ছেড়ে দিল স্বামী

                            একটা বয়স  ছেলে  বড় করে শেষ

                             ছেলের নামেই আজ চেনা দিই আমি … (নন্দোর  মা / জয় গোস্বামী )

তবু গল্পের বাইরেও একটা গল্প থাকে  যেটা মানবিকতার গল্প ,পারস্পরিক সাহচর্য্যের গল্প , হাত ধরার গল্প । কাহিনীর শুরুতেই মৎস মুখীর  দিন বউ অদিতি শাশুড়ির পাতে  তুলে  দেয় মাছ ; বলে তুমি তো মাছ খেতে খুব ভালোবাসো ? তবে ? আর কিছু কিছু নিয়ম তো ভাঙ্গারও দরকার   আছে ; আমাদের  মনে  করিয়ে  দিয়ে যায়  মানুষের জন্য নিয়ম সংস্কার না  নিয়মের  জন্য মানুষ।

ছোটোবেলা  থেকে  যে সংস্কার গুলো আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তার  চাপে কখন যেন আমরা নিজেদের হারিয়ে  ফেলি হারিয়ে   ফেলি ছোটো ছোটো ভালো লাগা আনন্দ গুলোকে  ভুলেই যাই  আসলে ওগুলোই বেঁচে থাকা …

ছবিতে  মাছের  অনুষঙ্গ এসেছে  বার  বার , মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি বাড়িতে  মাছ খাওয়া একটা বড় সেন্টিমেন্ট … মাছ খাওয়া দিয়ে  আলাদা  হয়ে  যায় ঘটি বাঙ্গাল, বড় মাছের টুকরোটা ভালোবাসে  অনেকেই , সেখানে  ছেলে মেয়ে ভেদাভেদ   হয় না । কিন্তু সমাজ  আমাদের  শেখায়  মেয়েবেলায় বড় মাছ প্রাপ্য  ভাই বা দাদাদের , শাশুড়ি বেলায়  বড় মাছের পিস বরাদ্দ ছেলের  জন্য, তার  থেকে  একটু ছোটো নতুন বউমার  আর কাঁটার  গায়ে  লেগে

থাকা মাছ প্রাপ্য  শাশুড়ির । আর এই সব ছোটো খাটো ব্যাপারগুলোকে  ইস্যু না করাই নাকি স্যাক্রিফাইস!

একটা  নিরাপত্তাহীনতা , সংসারে  বাতিল হয়ে অপাংক্তেয়  হয়ে যাওয়ার  ভয় । আসলে  আমরা মেয়েরা বড় পরনির্ভর , ভুলে গেছি নিজেই নিজের  শর্তে  বাঁচতে ।আমাদের  জীবন বেঁচে থাকা ভালো লাগা মন্দ লাগা আর্বতিত হয় অন্যদের জীবনকে কেন্দ্র করে, কখনও সেটা স্বামী কখনও বা  সন্তান। তাই তারা কাছ ছাড়া  হয়ে   যাবে এই নিরাপত্তা হীনতায় আমরা  ক্রমাগত ভুগতে থাকি।

একটু একটু করে  মানসিক অবসাদের দিকে  এগিয়ে যাওয়া শোভারাণী  কিন্তু তাও মনোচিকিৎসকের কাছে যেতে চান  না … তার ইগোতে  বাধে … কি আমি পাগল ?  মধ্যবিত্ত পরিবারের এই আরেক সমস্যা !  তারা শরীরের অসুখ হলে  ডাক্তার  দেখাবে  কিন্তু মনের ঘুপচি ঘরে  ঝুল কালি পড়লে অসুখ করলে মনোচিকিৎসকের কাছে  যাবে  না ।

এই গল্পে  সাইকোলজিস্ট আরাত্রিকা ভট্টাচার্য্য (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ) একটি দারুণ চরিত্রে অভিনয়  করেছেন। ছোটো ছোটো psycological test এর  মাধ্যমে তিনি তীব্র আলো ফেলেছেন যুযুধান দুই পক্ষ শাশুড়ি বউমার মনো জগতে  দাঁড় করিয়ে  দিয়েছেন আয়নার  সামনে , সুযোগ দিয়েছেন আত্মবিশ্লেষণের , আর তাতেই সিনেমার  শেষদিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে  লড়তে থাকা   একে  অপরকে  সহ্য করতে না পারা শাশুড়ি বউমা  কখন বন্ধু হয়ে  গেছেন… মর্যাদা দিতে  শিখেছেন একে অপরের ছোটো ছোটো ভালো লাগাগুলোকে ।

পরিচালক হিসেবে  নন্দিতা শিবপ্রসাদ  চিরদিনই পারিবারিক মেলোড্রামা চয়েস  করেন  আর  তাকে  মানবিকতার  রসে জারিত করে এক অন্য  উচ্চতায় পৌঁছে  দেন । এটাই  তাদের  নিজস্ব signature .এর আগের  সিনেমা পোস্ত  , বেলা শেষে , হামি সেই কথাই বলে। ফলে গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক  হলে  গিয়ে  ছবিটার সঙ্গে  নিজেকে identify করতে পারে  । ছবির কাহিনী বিন্যাস অসাধারণ আরও অনবদ্য Screen play  ও dialogue .

পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী প্রথম ছবিতেই নিজস্ব মুন্সীয়ানার স্বাক্ষর রেখেছেন । বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি লম্বা রেসের  ঘোড়া । অভিনয়ে  সব্বাই ভালো । বিশেষত  ঋতুপর্ণা ও ছোট্ট ইচ্ছে  পূরণের  চরিত্রে  আদোলীনা  যেন  সম্পূর্ণ ছবিটাকে ধরে রেখেছে ; সূত্রধরের কাজ  করেছে ।

তবে  এ  ছবির গানগুলো খুব ভালো নয় । গান নিয়ে আরেকটু ভাবা উচিত ছিলো।

আমরা  মেয়েরা আসলে  নিজেদের  না পাওয়া  deprivation গুলো চাপিয়ে দিতে  চাই অন্যের ওপর, new generation এর ওপর… তাই বউমা যখন শাশুড়ি হন নিজের জীবনের  না পাওয়া  বঞ্চনাগুলো চাপিয়ে   দেন  নিজের ছেলের  বউয়ের ওপর, লেখা পড়া করতে চেয়ে সুযোগ না পাওয়া শাশুড়ি তাই এম  এ  পাশ বউমাকে হিংসে করেন, লুকিয়ে  রাখেন  তার চাকরির  interview  call letter.তাকে মেয়ে করে  কাছে  টেনে নিতে পারেন  না , বউমা  বলে দূরে সরিয়ে  দেন; আর সমাজ আমাদের  বিরুদ্ধে  আমাদের  লড়িয়ে  দিয়ে  মজা দেখে  দূর  থেকে । আমাদের  এই মানসিক দৈন্য কবে দূর  হবে ? কবে  এই স্যাডিস্ট মনোভাব সরিয়ে  রেখে   আমরা  শপথ নিতে পারবো  আয় আরো বেঁধে  বেঁধে   থাকি ?

বলতে  পারবো আমার  সঙ্গে যা  হয়েছে তা আমি  আমার  বউমার  সঙ্গে হতে দেব না … কিছুতেই না … এই পরিবর্তন আমাদের  কবে  আসবে ? এই ছবি কিন্তু সেই প্রশ্ন তুলে  দিয়েছে … এই আন্তর্জাতিক  নারী দিবসে।

ছবি: গুগল