মুখে তার…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জীবনানন্দ দাশ ‘শ্যামলী’ কবিতায় লিখেছেন, শ্যামলী তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতো…সেকালের শক্তি কাকে বলে?শ্যামলীর মুখ প্রকৃতপক্ষে কেমন? কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে তিনি আবার বলছেন,

তোমার মুখের দিকে তাকালে এখনো

আমি সেই পৃথিবীর সমুদ্রের নীল,

দুপুরেরশূন্য সব বন্দরের ব্যথা,

বিকেলের উপকন্ঠে চিল,

নক্ষত্র, রাত্রির জল, যুবাদের ক্রন্দন সব-

শ্যামলী, করেছি অনুভব।

জীবনানন্দ দাশের শ্যামলী সেলফি তুলতে জানতো? মোবাইল ফোন কোত্থেকে আসবে তখন! জীবনানন্দ কোথায় দেখেছিলেন শ্যামলীর মুখ? হয়তো কোনোদিন দেখেনওনি। কল্পনায় জেগে ওঠা এক শ্যামলীর মুখ কবির চেতনাকে তাড়িত করেছে শুধুই। মানুষের মুখ আসলে এমনই। তার মুখের রেখায় কত অনুভূতি, না-বলা কথার রেখাচিহ্ন, অনুরাগ, কামনা অভিমান, কত যাত্রার ক্লান্তি, প্রাপ্তির আনন্দের উল্লাস। ৪৩টি পেশী আর ১৪টি হাড় দিয়ে গঠিত মানুষের মুখ কয়েক ডজন প্রতিক্রিয়াকে প্রকাশ করে। তার খানিকটা অনুভব করা যায়, বাকিটা রয়ে যায় অবোধ্য।

চোর,পুলিশ, খুনী, প্রেমিক, ডাক্তার, পতিতা, কবি, ভিখারি, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সেক্সডল-প্রত্যেকের আলাদা আলাদা মুখ, পৃথক তাদের মুখের রেখা। ভিড়ের মানুষ কত ধরণের আবেগকে তার মুখে সেঁটে নিয়ে পথ চলে। তার কতটুকু বুঝে ওঠা সম্ভব? তবুও মানুষ পৃথিবীতে যুগের পর যুগ তার মুখকে-ই সাজিয়ে তুলতে চেয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে প্রায় দুই’শ কোটি মানুষের মুখের ছবি প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফুটে ওঠে, যার মধ্যে অর্ধেকই সেলফি। এই মুখের ভিড়ে  শ্যামলীর মুখের দিকে তাকাবার সময় কোথায় আমাদের?

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো মানুষের মুখ নিয়ে ‘মুখে তার’।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ইঙ্গমার বার্গম্যান সব সিনেমায় ক্লোজ-আপ শটের ওপর গুরুত্ব দিতেন। বার্গম্যান বলতেন, মানুষের মুখের রেখায় উত্থান-পতন লুকিয়ে থাকে।মানুষ বিশেষ করে নারী সেই মুখাবয়বকে সাজিয়ে তুলেছেন বহু বহু যুগ ধরে। নারীর প্রসাধনের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে কত বেদনার গল্প। ফুটে উঠেছে আনন্দ আর কত কামনা। ডিজাইনার এবং লেখক জেসিকা হালফ্যান্ড তার বই ‘ফেইস, এ ভিজুয়্যাল অডিসি’ তে মানুষের বিশেষ করে নারীর মুখের গল্প বলেছেন। জেসিকা মনে করেন, এই মুখচ্ছবির প্রতিযোগিতাই পৃথিবীতে লক্ষ কোটি টাকার এক শিল্প গড়ে তুলেছে যেখানে মডেলিং থেকে শুরু করে সেলফি প্রতিযোগিতা সবই আছে। ২০১৭ সালে আমেরিকার অ্যাকাডেমী অফ প্লাস্টিক সার্জন থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে শুধুমাত্র নাকের প্লাস্টিক সার্জারি ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ শুধু মুখ নয় মুখের একটি বড় অংশ নাক নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। নিজের নাকের আকারও তারা বদলে ফেলতে চায়।

নিজের মুখশ্রীকে আরও ফর্সা এবং সুন্দর করে তুলতে মধ্যযুগে ইউরোপে সমাজের উঁচু তলার নারীরা অদ্ভুত এক উপায় অবলম্বন করতেন। তারা কখনো কখনো শরীর থেকে রক্ত বের করে ফেলতেন যাতে তাকে অনেকটা ফ্যাকাশে দেখায়। ১৬০০ সালে ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথ এবং তার পারিষদরা মুখের চামড়া ফর্সা করার জন্য সাদা সিসা এবং ভিনেগারের সংমিশ্রণে তৈরি এক ধরণের বিষাক্ত ফেইসপ্যাক মুখে মাখতেন। জাপানে মধ্যযুগে গেইশারা মুখ সুন্দর রাখতে পাখির বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি এক ধরণের প্রসাধন ব্যবহার করতো।

জীবনানন্দের কবিতায় শ্যামলী কি কোনো প্রসাধন ব্যবহার করতো? উত্তরটা জানা নেই কারুরই। কিন্তু শ্যামলীর কল্পিত মুখের রেখায় কী দেখেছিলেন কবি? কেবল ভালোবাসা? অনেক বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে মুখ। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, মানুষের মুখ ৬টি আবেগকে প্রকাশ করে, আনন্দ, বিষাদ, রাগ, ভয় এবং ঘৃণা। মানুষ কখনো নিপুন অভিনেতার মতো নিজের ভেতরের এই অবেগগুলোকে মুখের রেখায় প্রকাশিত হতে দেয় না। কিন্তু সব সময় সেই অভিনয়ে সাফল্য আসে না। মুখের রেখা লুকাতে পারে না আবেগের তীব্রতা। মানুষের ভ্রু, চোখ আর ঠোঁট কখনো শব্দহীন ভাবে প্রকাশ করে দেয় অনেক প্রতিক্রিয়া।

একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের মুখের রেখা ঢাকা পড়েছে মাস্কের নিচে। মারাত্নক কোভিড-১৯ রোগ থেকে বাঁচতে মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী এখন মাস্ক। কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার মতো বলতে হয়,‘‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’’। বিজ্ঞাপন-ই তো, অসুখের বিজ্ঞাপন। আর তাতেই সেই বিচিত্র মুখ চলে গেছে আড়ালে। এটাকে কি মুখোশের আড়াল বলা যায়? মুখের সঙ্গে মুখোশের বিষয়টা তো বহুকাল ধরেই গভীর ভাবে যুক্ত। সাহিত্যে এই মুখ আর মুখোশের ব্যবহার বহুবার বহুভাবে দেখা যায়। বছর দুই আগে হলিউডে মুক্তি পেয়েছিলো ‘জোকার’ সিনেমা। সেখানেও কিন্তু সেই মুখ আর মুখোশের গল্প। সার্কাসের ক্লাউনের মতো মুখে রঙচঙে মুখোশ এঁকে এক ভিন্ন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে বাস্তব সমাজে। সেই মুখের রেখার গল্পও কিন্তু ভীষণ আলাদা, হৃদয়স্পর্শী।

অস্কার ওয়াইল্ড তার একটি লেখায় বলেছেন, পুরুষের মুখ তার জীবনী আর নারীর মুখ এক উপন্যাস। সত্যিই কী তাই? পুরুষের মুখে যতই শ্রম, বেদনা, যন্ত্রণার গল্প লেখা থাকুক না কেন এই পৃথিবীতে নারীর মুখেরই জয়জয়কার এখনো। ইলিয়ড মহাকাব্যের হেলেনের মুখের দিকে তাকিয়েই সমুদ্রে ভেসেছিলো হাজার জাহাজ, প্রাণ দিয়েছিলো বহু যোদ্ধা। ক্লিওপ্যাট্রা অথবা জুলিয়েটের মুখ তো যেন বাস্তব জীবন। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে রোমিও কী বুঝেছিলো? ভালোবাসার এই প্রক্ষেপন সব অনুভূতির বাইরে। আর তাই নারীর ভ্রুভঙ্গি, তার চোখের বঙ্কিম ভাষা মিলে মুখকে করে তোলে কখনো বোধের অতীত।

শঙ্খ ঘোষের কবিতার কাছেই ফিরে যেতে হয় শেষে

একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার জন্যে গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।

একটা দুটো সহজ কথা
বলব ভাবি চোখের আড়ে
জৌলুশে তা ঝলসে ওঠে
বিজ্ঞাপনে, রংবাহারে।

কে কাকে ঠিক কেমন দেখে
বুঝতে পারা শক্ত খুবই
হা রে আমার বাড়িয়ে বলা
হা রে আমার জন্মভূমি।

বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া
তোমার সাথে ওতপ্রোত
নিয়ন আলোয় পণ্য হলো
যা কিছু আজ ব্যক্তিগত।

মুখের কথা একলা হয়ে
রইল পড়ে গলির কোণে
ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু
ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ বিবিসি কালচার, গুগল
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments