মুখোমুখি বসিবার…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুখোমুখি বসিবার-এই শব্দ দুটি উচ্চারিত হলেই পলকে মনের সামনে এসে দাঁড়ায় একজন মানবীর অস্পষ্ট অবয়ব। অস্পষ্ট লিখলাম কারণ, তিনি কখনোই নিজের ৮৫ বছরের জীবনে কারো সম্মুখে প্রকাশিত নন পূর্ণাবয়বে। বাঙালি পাঠক তাকে জেনেছেন, বুঝেছেন; চলেছে নানা গবেষণাও তাকে নিয়ে। কিন্তু তারপরেও তিনি অচেনা আর অধরাই থেকে গেলেন।রইলেন অপরিচয়ের দূরত্বেই। তিনি বনলতা সেন, জীবনানন্দ দাশের কবিতার বনলতা সেন। এ বছর ৮৫ বছর পূর্ণ করলো বাংলা সাহিত্যের এই রহস্যময়, অচেনা অথচ খুব চেনা এই নারী চরিত্র।

তাকে কেউ দেখেনি, কেউ জানেওনি। কোনো সাহিত্যে এমনি একটি চরিত্র কখনো এত বিখ্যাত হয়েছে কিনা জানা নেই। জীবনানন্দ দাশ  নিজেই কি কোনোদিন জেনেছিলেন তাকে? রক্তমাংসের বনলতা সেন কি এই পৃথিবীতে ছিলেন কোনোদিন? এতসব প্রশ্নের মুখে জীবনানন্দ দাশ খোলসা করে বলেননি কিছুই। কখনো আভাস দিয়েছেন হয়তো কিছুটা। সাহিত্যের গবেষকরা খুঁজেছেন, খুঁজে চলেছেন এই অসাধারণ চরিত্রটির উৎস, রহস্য।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই বনলতা সেনকে নিয়ে ‘মুখোমুখি বসিবার’।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল,

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখী ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;

থাকে অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

১৯৩৪ সাল। জীবনানন্দ দাশ তখন থাকেন বরিশালে। সেই নির্জন মফস্বল শহরে বসে তিনি লিখলেন ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি। পাঠিয়ে দিলেন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায়। পত্রিকার প্রথম বছরের দ্বিতীয় সংখ্যায় (পৌষ)কবিতাটি মুদ্রিত হলো। চমকে, নড়েচড়ে বসলো বাংলা সাহিত্য। যে কবিরা প্রতি সন্ধ্যায় বুদ্ধদেব বসুর তখনকার রাসবিহারী অ্যাভিনিউর বাড়িতে দীপ্তি ছড়িয়ে আড্ডায় মশগুল হতেন, তাঁরা ‘বনলতা সেন’ পড়ে বিস্মিত হলেন।

১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় কবির ‘বনলতা সেন’ নামে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। এই বইতে কবিতাটি তিনি অন্তর্ভুক্ত করেন।তিনি বেঁচে থাকতেই ১৯৫২ সালে কলকাতার সিগনেট প্রেস থেকে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রচ্ছদ আঁকেন সত্যজিৎ রায়। বইটির মূল্য ছিলো ২ টাকা। জীবনানন্দের গুণগ্রাহী ও জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায় তাঁর ‘জীবনানন্দ’ বইয়ে লিখছেন: ‘‘এক দিন সকালে গেছি। গেলে ঘরে বসিয়ে বললেন— আমার ‘বনলতা সেন’ কবিতার বইটা সিগনেট প্রেস বার করেছে।— এই বলে তিনি আমার হাতে একখানা ‘বনলতা সেন’ দিয়ে বললেন— কাগজ, ছাপা, বাঁধাই সবই ভাল, কিন্তু কভারের ছবিটা আমার আদৌ পছন্দ হয়নি।  আমি বইটা খুলে দেখছি। সেই সময় তিনি আর একটা ‘বনলতা সেন’ নিয়ে তাতে আমার নাম লিখে আমার হাতে দিলেন।আমি বইটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম— দাদা, বনলতা সেন কে? আপনি তো লিখেছেন— ‘নাটোরের বনলতা সেন’। এই নামে সত্যিই আপনার পরিচিতা কেউ ছিল নাকি?

আমার কথা শুনে মুচকি হাসতে লাগলেন। কোনও কথা বললেন না।’’

কথিত আছে, কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তাঁর প্রথম প্রেমিকা মুনিয়ার দেখা মেলে বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনের গির্জায়। মুনিয়ার মা এই গির্জায় সেবিকার কাজ করতেন। শুধু কি তাই? বরিশালের এই পুরোনো গির্জাটির সঙ্গে জীবনানন্দের সম্পর্কও ছিলো নিবিড়। ছাত্রাবস্থায় অক্সফোর্ড মিশনের ছাত্রাবাসে থাকতেন তিনি। ফলে এখানকার ফাদার ও মাদারদের সঙ্গেও ছিলো তাঁর ঘনিষ্ঠতা। জীবনানন্দের ডায়েরির প্রথম অংশ প্রকাশিত হয়েছে কলকাতায়। ভূমেন্দ্র গুহের কাছে জীবনানন্দের ডায়েরি রাখা আছে। সেই ডায়েরিতে লিটারেরি নোটস্‌ হিসেবে Y নামে এক মেয়ের নাম লেখা আছে। জীবনানন্দ তার নিজের হস্তাক্ষরে লিখে রেখেছেন Y=শচী; এই ‘শচী’ জীবনানন্দের গল্প ‘গ্রাম ও শহরের গল্প’র শচী। ডায়েরির অন্যান্য পৃষ্ঠা বিবেচনায় ভূমেন্দ্র গুহ বলেছেন, কাকার মেয়ে শোভনার প্রতি কবি দূর্বল ছিলেন। এই শোভনাই হচ্ছেন ওয়াই বা শচী বা বনলতা সেন। কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ এই শোভনা মজুমদারকে উৎসর্গ করেছেন। কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশের উপেক্ষা কুড়ানোর, যন্ত্রণায় বিক্ষত হওয়ার সময়ে  তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠিকা ছিলেন শোভনা, দরজা বন্ধ করে প্রায়ই কবি শোভনাকে কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। অর্থাৎ ভূমেন্দ্র গুহের বিবেচনায় বনলতা সেন একেবারেই একটি প্রেমের কবিতা।

কিন্তু অশোক মিত্রকে অবশ্য একেবারেই উল্টো কথা বলেছিলেন স্বয়ং কবি জীবনানন্দ দাশ। কবি বনলতা সেন বিষয়ে অশোক মিত্রের সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে শুধু জানিয়েছিলেন, বনলতা সেন নামটি তিনি পেয়েছিলেন পত্রিকা থেকে। সে সময় নিবর্তন আইনে বনলতা সেন নামে একজন রাজশাহী জেলে বন্দিনী ছিলেন। পত্রিকায় তাঁর নাম ছাপা হয়েছিলো। সেখান থেকেই কবি এই নামটি গ্রহণ করেন। এই বনলতা সেন পরে কলকাতার কলেজে গণিতের শিক্ষকতা করতেন।বনলতা সেন রচনার ৭৫ বছর পূর্তিতে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই প্রবন্ধে আশোক মিত্র এই তথ্য উল্লেখ করেন। এখানে এসে বনলতা সেন আবারও রহস্যের ঘেরাটোপে বন্দী হলেন। কার মুখোমুখি একদিন বসেছিলেন কবি? যে কবি একদিন বিকেলে হাঁটতে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। যার সব চলা থামিয়ে দিয়েছিলো শহরের ট্রাম লাইন, তাঁকে কোন সে নারী দু’দণ্ডের শান্তি দিয়েছিলেন? মানুষ তার এক জীবনে কি দু’দণ্ডের শান্তি পায় কখনো? কবি কিটস পেয়েছিলেন প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউনের কাছ থেকে এই শান্তি? ভ্যান গঘ যে সুন্দরী গণিকাকে নিজের একটা কান কেটে উপহার দিয়েছিলেন তাকে কী শিল্পী নিজের ভালোবাসার তীব্র যন্ত্রণার কথা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন? অথবা শার্ল বোদলেয়ার যখন কবিতায় লেখেন, ‘হে পৃথিবীর মানুষ! আমাকে তাহিতির সুন্দর ললনাদের সাথে দাও, আমি তোমাদের অশ্লীল সব কবিতা উপহার দেবো।’’ তখনও কি দু’দণ্ড শান্তির মতো এক বনলতা সেনকে তারা পেয়েছিলেন মনোজগতে অথবা মুখোমুখি? এ সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। একজোড়া মানব মানবী বসে আছেন একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলা দূরত্বে অথচ মাঝে কী দুস্তর এক ব্যবধান! ‘সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর/তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ এই কোথায় ছিলেনটুকুই যেন সেই অনতিক্রম্য দূরত্ব হয়ে, অভিমান হয়ে জেগে থাকে দু’জনার মাঝখানে, টপকানো যায় না। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন তেমনি এক দূরত্বের ধারণা হয়েই রয়ে গেলেন বাংলা সাহিত্যের পাঠকের মনে। মনে হয়, যাকে এ পৃথিবী একদিন পেয়েও কোনোদিন পায়নি স্পর্শের অধিকারের মধ্যে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতা বারবার পরিমার্জনা করতেন। বনলতা সেনের আদি খসড়া আর বর্তমানে আমরা যেটি পড়ি, দুটির মাঝে তুলনা টানলে যে কোন পাঠকই অবাক হবেন। জীবনানন্দ দাশ এই কবিতাটিকে একটু একটু করে কাটাছেঁড়ার মধ্যে দিয়ে অবয়ব দিয়েছিলেন। এঁকেছিলেন বনলতা সেনের আলো আঁধারি মোড়া এক ছবি। সাহিত্যের সমালোচকরা বলেন, জীবনানন্দ এডগার আ্যালান পো-র ‘টু হেলেন’ কবিতায় প্রভাবিত হয়ে ‘বনলতা সেন’ লিখেছিলেন। কিন্তু ‘বনলতা সেন’-এর মাঝে যে নিবিড়তা আর রহস্যের ছোঁয়া পাওয়া যায় তা অ্যালান পো-র কবিতায় ফেরারী।

রবীন্দ্রনাথের একক সৃষ্টিকে ডিঙিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা নতুন কাব্যভাবনায় যখন একত্রিত হচ্ছিলেন তখনই জীবনানন্দ সৃষ্টি করেন ‘বনলতা সেন’। যদিও এর আগে ‘কল্লোল-প্রগতি’ পর্ব থেকেই চেষ্টা চলছিলো কী করে রবীন্দ্রবলয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের শুভেচ্ছা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের যুগ্ম সম্পাদনায় ১৩৪২ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘কবিতা’ আত্মপ্রকাশ করে। তাতেও ছিলো রবীন্দ্র বলয় থেকে বের হয়ে আসার স্বপ্ন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, কিশোরকবি সমর সেন চেষ্টা করেছেন নিজেদের মতো করে বাংলা কাব্যপাঠকদের একটি আলাদা স্বর শোনাতে। সেই সময়েই জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন বাংলা কবিতার ঘরবাড়ি পাল্টে দেয়। মুখোমুখি বসিবার অবসর সত্যজিৎ রায় তৈরি করেছিলেন তাঁর ‘নায়ক’ ছবিতে। ধাবমান এক ট্রেনে অভিনেতা উত্তমকুমার আর শর্মিলা ঠাকুর বসেছিলেন মুখোমুখি। মাঝে একটি টেবিলের দুস্তর ব্যবধান। সে ব্যবধান ছবির গল্পে টপকাতে পারেনি সেই দুটি চরিত্র। অথচ ভালোবাসা অথবা মনের তীব্র টান তাদের দু’জনার মাঝেই বয়ে গিয়েছিলো অমোঘ এক চরিত্র হয়ে। ফিরে দেখা যায় ‘রোমান হলিডে’ অথবা ‘মেম সাহেব’ ছবি। যেখানে মূখ্য দুই চরিত্র মুখোমুখি হয়েছিলো একে অপরের। কিন্তু ছবিতে ভালোবাসার বদলে দূরত্বের গল্পইতো বলতে বসেছিলেন দুই পরিচালক। মুখোমুখি হয়েও তাদের চরিত্ররা ছড়িয়ে পড়ে দূরত্বের ধারণায়। এই কবিতাটি না লেখা হলে বাংলা সাহিত্যের পাঠকের জীবন এমনি এক অচেনা অনুভুতির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারতো না। ৮৫ বছর ধরে এক ধারাবাহিক রহস্যময়তা আমাদের মনকে তাড়িয়ে ফিরতো না। তৈরি হতো না ভালোবাসার আইকনিক মূর্তি। তাই বনলতা সেন রয়ে গেলেন আমাদের সাহিত্যে, রইলেন আমাদের মনে হয়তো ভালোবাসার এক অপূর্ণ প্রতিমা হয়ে।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]