মুনিরা চৌধুরীঃ আমিও ঘড়ির দোকানে যাই নি কোনোদিন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘‘সে আর ফিরে আসে নি

আমিও ঘড়ির দোকানে যাই নি কোনোদিন।’’

মৃত্যুচেতনা হয়তো ঘড়ির দোকানের সব ঘড়িকে থামিয়ে দিতে পারে।

দিয়েছিলোও হয়তো। তা না-হলে  কার্ডিফের সেই আলোকিত অথবা কুয়াশায় ঢেকে থাকা অস্পষ্ট হইটমোর-বে সমুদ্র সৈকত অোজো পৃথিবীকে কেন কবিদের মৃত্যু সংবাদ পাঠায়? কেন পৃথিবীর আগুন সইতে না পেরে নিজেকে একদিন জীবন থেকেই প্রত্যাহার করে নেন কবি মুনিরা চৌধুরী!

প্রবাস জীবনে লেখালেখি করেছেন। লিখেছেন, সংগঠনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর লেখায় সর্বদাই পাল তুলে অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলো এক বেদনার জাহাজ। সে জাহাজই হয়তো তাকে আবার নিয়ে গেছে অজানায়।কবিরা হয়তো কোনোদিন বন্দরের হন না।

গত বছর ইংল্যান্ডের ছোট্ট শহর কার্ডিফে আত্মহত্যা করেন মুনিরা।১৬ নভেম্বর ঘর থেকে বের হয়ে যান পরদিন কার্ডিফের সমুদ্র সৈকতে পাওয়া যায় তার প্রাণহীন দেহ। আগামী ১৭ নভেম্বর তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। কবির কবিতার স্বজনরা সেই দিনটি সামনে রেখে প্রাণের বাংলার পাতায় লিখেছেন মুনিরা চৌধুরীকে নিয়ে।এবারে গেলো প্রথম কিস্তি। 

                                                 

আসমা চৌধুরী

নয় দরজার বাতাস ; এক বিষণ্ণ আকাশ

মুনিরা চৌধুরীর ‘নয় দরজার বাতাস’ হাহাকারের কাব্য। হয়তো এক স্বপ্নের দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকেন কবি তার কবিতায়। কিন্তু সেই দরজা খোলে না কখনো। অভিমানী কবি প্রকৃতির কাছে মেলে ধরেন নিজেকে। ভালোবাসার কৃত্রিমতায়,ভালোবাসার অভিনয়ে কবি ভেঙে পড়েন। তাই তার উচ্চারণ…

‘ভালোবাসার অদ্ভুত অভিনয়ের মাঝে

চোখ ও গলিত মার্বেল ঝুলে থাকে

নিজের সাথে নিজের এই অভিনয়ে

মাঝে মাঝেই দুই চোখ হেসে ওঠে

গড়িয়ে পড়ে মুনিরা আগুন….’

নয় দরজার বাতাস, কাব্যগ্রন্থে কবি মুনিরা চৌধুরী কবিতানুক্রমকে চারভাগে ভাগ করেছেন। হেমন্তে রচিত হেমলক, নয় দরজার বাতাস, মেহেক ও মেহেকানন্দা, মুনিরা কথা প্রভৃতি।

চারভাগে ভাগ করা হলেও পর্বে পর্বে বিভক্ত কবিতাগুচ্ছ যেন বেদনারই সমুদ্র যাত্রা। কোথাও কোন সম্ভাবনার সুতো খুঁজে পায়নি কবি তাই কবি যেন বিলাপ করছেন নিজের সঙ্গে…

‘হায় আনন্দধারা!

আজ আটকা পড়েছে বালুচরে’

কবি নিজেকে বড় অচেনা ভাবছেন। যেন সে যেন কেউ নয় সংসারের। ছোট বাবুই পাখি যেভাবে মুখের দানাগুলো ফেলে দিয়ে উড়ে যায় সেভাবে কেউ যেন তাকেও ফেলে গেছে।পা ভাঙা মানুষ যেন দৌড়াতে নেমেছে। তিনি চলে যেতে চান বারবার মেহেকানন্দার তীরে,নিমাই সন্ন্যাসীর গ্রামে। কিন্তু বাবাও তাকে কোন সমাধান দিতে না পেরে চুপ করে থাকেন।গভীর বেদনায় কবি লেখেন,

‘আমি যাইনি কোথাও

আমার পাণ্ডুলিপি থেকে সবগুলো লেখা চলে গেছে’

জীবনের চাওয়া পাওয়াগুলোকে কবি গ্রহণ করতে পারছে না তার জন্ম-অবস্থানের কারণে।যখন প্রার্থিতজন ফিরে এসেছে তাকে নিজের করে নিতে তখন কবি উপলব্ধি করেছে তার অসহায়তা।

‘যদি পারো

চাকু দিয়ে হস্তরেখা কেটে যেয়ো

বদলে যেয়ো জন্মের দাগ।’

কবি মুনিরা চৌধুরীর রোমান্টিক মন বেদনা বিলাসের নরম মেঘে ভেসে গেছে কখনো শ্যামের কাছে রাধা হয়ে বৃন্দাবনে। রাধার দুঃখকে ধারণ করে সে যেন জনমে জনমে কাতর হতে চান।

‘হায় শ্যাম,

নাম ধরে ডাকো

মেঘমন্দ্র স্বরে নাম ধরে ডাকো

আমি যে ভাঙা প্রদীপ জ্বালিয়ে তোমার ডাকের অপেক্ষা করছি….’

নয় দরজার বাতাস এই অপেক্ষার চির অধরা বিষাদ-বেদনা।আকাশ, নদী, সমুদ্র কাঁপিয়ে কবির আর্তনাদ ভাষা পেয়েছে আরাধ্যের কামনায়। নিজের পরিচয়, নিজের পিপাসী মন পায়নি সঠিক পরিচর্যা।

প্রেম অমৃত আর প্রেম হারানোর বেদনা মৃত্যুর সমতুল্য। মানুষ যে চিরকাল প্রেম অন্বষণে জীবন পার করে মুনিরা চৌধুরী তার নয় দরজার বাতাসে,সেই বার্তা ফুটিয়ে তুলেছেন। অসামান্য সব চিত্রকল্প কবির সেই বার্তাকে প্রাণময় করেছে। যেমন…

১.নদীর নাভি হতে বের হচ্ছে মেঘ ও কুয়াশা

২.দু চোখ ছিদ্র করে

লাল–নীল–কমলা রঙের সুতো দিয়ে সেলাই করছি…

মুনিরা চৌধুরী সেই নিপুণ কর্মী যিনি তার নয় দরজার বাতাসে, এক অপার বিরহবোধের ধারাকে ভিজিয়ে দিয়েছেন অপরূপ কৌশলে। পাঠক যেন তার সাথে গলা মিলিয়ে আর্তনাদ করে ওঠেন…

‘কিছুই পেরুতে পারিনি আমি।

পা ভেঙে পড়ে আছে শৈশবের ঘোড়া।’

 

জুনান নাশিত

মুনিরা চৌধুরী: মৃত্যুগন্ধী এক কবিতার নাম

কবি মুনিরা চৌধুরীর ‘নয় দরজার বাতাস’ বইটি নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি। কিছু কবিতা পড়ি, আবার বইটি বন্ধ করে পায়চারি করি। আবার পড়ি। আমার ভেতরের হাড়, মাংস, মজ্জা, স্মৃতি, বাস্তবতা সব গলিত নদী হয়ে যায়। আমি মুনিরার কবিতার গলিত নদীতে ভেসে চলি। সে নদী এক রক্তের নদী, নি:সঙ্গ আর্তনাদের নদী।

পরিচয় বলতে যা বুঝায় কবি মুনিরা চৌধুরীর সঙ্গে আমার তা ছিল না। বছর কয়েক আগে কোন এক ওয়েবপোর্টালে তার কিছু কবিতা পড়ি। ভালো লাগে। আগ্রহ জন্মে। পরে ভুলে যাই। হঠাৎ এক তোলপাড় করা খবরে চমকে উঠি। হাতে আসে ‘নয় দরজার বাতাস’ ও ‘মেহেকানন্দা কাব্য’। কিন্তু কবিতাগুলো টানা পড়তে পারি না। মনে হয় এক জান্তব মৃত্যুর দীর্ঘশ্বাসে আমার চারপাশ পেঁচিয়ে যাচ্ছে।  শুনি কেবল মুনিরার হৃদয়ের ক্ষরণের ধ্বনি আর অগ্নিক্ষরা আর্তি।

কবিরা দু:খকে ধারণ করেন। কষ্টকে পিষে মেরে অমৃতের মতোন পান করে তা থেকে শব্দের ফুল ফুটিয়ে তোলেন। ক্রুশবিদ্ধ রক্তাক্ত যীশুর জীবন একেকজন কবির। তিনি এক অনিঃশেষ বেদনার ভার বহন করে করে পথ চলেন। মুনিরা চৌধুরীর কবিতা পড়ে মনে হয়েছে তিনি যেন প্রতি মুহূর্তে নিজের থেকে নিজে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, আপন সত্তা থেকে ছিঁড়ে খুঁড়ে মিশে গেছেন অপর আরেক সত্তায়।

মওলানা জালালুদ্দিন রুমি যেমন বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে এক অদৃশ্য শক্তি লুকিয়ে আছে। এটা যখন দুটো বিপরীতমুখী বাসনার উপলব্ধি প্রকাশ করে তখন তা শক্তিশালী হতে থাকে।’ মুনিরার ভেতর যে অদৃশ্য শক্তি দানা বেঁধে ছিল তা তাকে কেবল গভীর থেকে গভীরতর এক কষ্ট কল্পনার ভেতর ঘুরপাক খাইয়েছে। তাই তার কবিতার ভেতর যে নিরবধিকাল তা বড়োই সংক্ষুব্ধ, অস্থির, জান্তব আর রক্তাক্ত এবং অনেকবেশি ঐন্দ্রজালিক। দেখা হলে জানতে চাইতাম কেন এমন সংক্ষুব্ধ, সংক্ষোভ আর ছিঁড়ে ফেলা কষ্ট তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে। যার ফলে তিনি তার জন্মদাগটিকেও ছুরির ডগা দিয়ে কেটে মুছে ফেলতে চেয়েছেন।

‘কেন তুমি শঙ্খ কেটে কেন শাখা বানিয়েছো

হাতের মুঠোতো খুলবো না

হাতের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছি নদীনালা

মরে –যাওয়া ময়ুরাক্ষীর দাগ

কেন শাখা নিয়ে এসেছো?

যদি পারো

চাকু দিয়ে হস্তরেখা কেটে যেয়ো

বদলে যেয়ো জন্মের দাগ।’

কবি মুনিরার কবিতা পড়তে পড়তে  মনে হয়েছে তিনি কোন রোমান্টিক কিংবা দার্শনিক নয়, অগ্নিজ্বলা মৃত্যুর বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন। কেবলমাত্র মাঝে মাঝে ফেরেন জীবনের দিকে । তবে তার মৃত্যু বিছানায় রয়ে যায় বিচ্ছিন্ন হাড়, গলিত মার্বেল , মুনিরা আগুন, শূন্যকুঠুরি, মন্দিরের ছাই, অন্ধকার কবর, ছাইয়ের কীর্তন, হিমায়িত পাখি, পাথরের চাখ, সমুদ্র আগুন, জ্বলন্ত জোনাকি, নরক প্রদেশ, প্রেমিকের কলিজা, মৃত পাখি, মৃত ঈশ্বর, গলিত কফিন, মাথার খুলি কিংবা রক্তের করাত।

রবীন্দ্রত্তোরকালে আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশের পর এতো মৃত্যুগন্ধী কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। জীবনানন্দের কবিতায় ছিল মৃত্যুর মহাকাব্যিক বিস্তার। তিনি নানাভাবে মৃত্যুকে তুলে এনেছেন তার কবিতায়। প্রবল নিঃসঙ্গচেতনাগ্রস্ত এই কবির কবিতায় মৃত্যু আসে প্রেমের হাত ধরে। তার মৃত্যু যেন চিরশান্তির এক রোমান্টিক ঘুম। জীবনানন্দের ভাষায়,

‘‘সাম্রাজ্য-রাজ্য-সিংহাসন-জয়

মৃত্যুর মতন নয়-মৃত্যুর শান্তির মতন নয়

ক্লান্তির পরে ঘুম, মৃত্যুর মতন শান্তি চাই।’

আদিকবি বাল্মীকির প্রথম কবিতা উচ্চারিত হয়েছিল মৃত্যুজনিত শোক থেকে। ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগম: শাশ্বতী সমা:।’

প্রথম নারী কবি হিসেবে স্বীকৃত গ্রীসের স্যাফো বলেছিলেন,

‘মৃত্যু এক অভিশাপ, এ কথা জানেন দেবগণ।

তা না হলে বহুকাল আগে হতো তাঁদেরই মরণ।’

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমদিকে মৃত্যু নিয়ে রোমান্টিক বিলাসিতায় মেতেছিলেন। তিনি তখন মৃত্যুকে শ্যামের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন,

‘মরণ রে,

তুঁহুঁ মম শ্যামসমান’।

কিন্তু প্রাজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ একপর্যায়ে মৃত্যুকে দার্শনিকতার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তিনি আমৃত্যু দু:খের তপস্যার মধ্যদিয়ে মৃত্যুতে সকল দেনা শোধের কথা বলেছেন।

মুনিরার কবিতায় মৃত্যু কোন রোমান্টিকতার হাত ধরে চলেনি। তার মৃত্যু প্রবল বিধ্বংসী, আগ্রাসী, জান্তব ও রক্তাক্ত। তার মৃত্যু যেন একাকীত্বের গগনবিদারী হাহাকার, নিঃসঙ্গতার সোনালি আগুনে পোড়া চূর্ণ। তিনি মৃত্যু চেতনায় আচ্ছন্ন ছিলেন না, মৃত্যু নিয়ে নেই তার রহস্য উপাচার। মৃত্যু তার কবিতায় অতল নিঃঙ্গতার প্রতীক, আর্তের চিৎকার। দোমড়ানো, মোচড়ানো, পিষ্ট হতে থাকা সত্তার গুমরে ওঠা প্রবল প্রলাপ। তার চারপাশে যা কিছু তার সবই যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত। তিনি তার চারপাশ নিয়ে সমাধিস্থ হন, ডুবে যান আগুনে পোড়া মৃত্যুর শীতল সমুদ্রে। তাই তিনি বাতাসহীনতা অনুভব করেন। ভেসে উঠতে পারেন না। ডুবে থাকেন ঘোর অন্ধকার তলানিতে।

‘কোথাও বাতাস নেই

দেহে ডালপালা বহুযুগ হলো স্থির হয়ে আছে

কোথাও শুনছি না বাতাসের গান

স্ফটিক -পাখিরা, আমার প্রাণবন্ধু তারা

আমায় জাগ্রত রেখে চলে গেছে ঘুমের জঙ্গলে

ভেসে উঠতে পারছি না

কিছুতেই না

চাঁদ – সূর্যে্র গলা একত্র করেছি

ডুবিয়ে দিয়েছি মেহেকানন্দায়।’

কিংবা তিনি বলছেন,

‘কেবলই মৃত মানুষের হাড়ের গন্ধ…

কেবলই শ্মশানের ধুয়া

আকাশে আজ অন্য কিছু নেই, না পাখি না পরমাত্মা

রক্তের করাত দিয়ে পাথর কাটছি, পাথরজননী এক’

কষ্ট আর মৃত্যু একাত্ম হয়ে তার কবিতায় উঠে এসেছে এভাবে,

‘একা বসে আছি, একশ বছর ধরে

হঠাৎ কে যেন এসে বললো- কষ্ট কী? কষ্টের রঙ কেমন?

জলের কোনো রঙ নেই জানি

কষ্ট কি তবে কার্ডিফের ঐ একটা মাত্র ডানা ভাঙ্গা কালো কবতুর!

শশ্মানঘাটে, ঠাকুর মা’র কাছে যাই

জেনে যাই-কষ্ট একজন মৃত মুনিরা চৌধুরীর গোপন নাম।’

কবিকে সাধারণত দুধরণের যন্ত্রণা প্রভাবিত করে। এক. চেতনাগত কিংবা ব্যক্তিক, দুই. বৈশ্বিক কিংবা বর্হিস্থ যন্ত্রণার ভার। মুনিরার কবিতার জগত আঁচড়াতে আঁচড়াতে ভেবেছি তার যে এতো চূর্ণ হাহাকার এর অতল উৎস কোথায়? আমার কেবলি মনে হয়েছে মুনিরা বড়ো বেশি আত্মপ্রেমিক ছিলেন। এই আত্মপ্রেমের আসক্তির কারণে বিচ্ছিন্নতা ও অভিমান তাকে বিদীর্ণ করেছে লক্ষ গুণ। মূলত জীবনপ্রেমই তার কবিতায় মৃত্যুর ভয়ঙ্কর বিভৎসতাকে বার বার টেনে আনার উস্কাকিদাতা। মুনিরাই স্বয়ং এই জীবন, মুনিরাই প্রেম। তাই মুনিরা হয়ে যায় মুনিরাআগুন কিংবা মুনিরাহেনা। অথবা মুনিরা কখনও হয়ে যায় মেহেকানন্দা নদী। কিংবা মুনিরা স্বয়ং ঈশ্বর। আবার মুনিরা কষ্ট অথবা মৃত্যুরও অপর নাম। মুনিরা এক টুকরো কাঁচ যেখানে আঁকা থাকে তার আপন চেহারা। কাঁচ হারিয়ে সে নিজেকেও হারিয়ে ফেলে।

‘ঘুম ভেঙ্গে দেখি –

আমি সেই কাঁচের টুকরো হারিয়ে ফেলেছি

আমি আপন চেহারা হারিয়ে ফেলেছি’

এই হারানোর কষ্ট তাকে তাড়িয়ে ফিরেছে। তিনি খুঁজে চলেছেন নিজেকেই । আত্মঅন্বেষণ আর আত্মযাতনা তাকে অস্থির আর পর্যুদস্ত রেখেছে সবসময়। আর এই ব্যস্ততা তাকে গতিময়ও রেখেছে দারুণভাবে।  ফলে কবিতাগুলো মরুভূমির মধ্যেও বালির নৌকা হয়ে এগিয়ে গেছে তর তর।

বলা হয় সুখের স্থায়িত্ব অতি অল্প। কিন্তু বেদনা অপার, অসীম ও অনিঃশেষ। তাই বেদনাদীর্ণ কবিতাই পাঠককে আলোড়িত করে। পাঠক মনেও রাখেন সে কথামালা। মুনিরার কবিতা বেদনার আবহমান গলিত নদী হয়েও তা ভিন্নরকম। তিনি যে যন্ত্রণা ও ছিন্নভিন্নতা কবিতার শব্দে শব্দে এঁকে গেছেন তাতে পাঠক হিসেবে বুকের গভীরে বেদনার ভার তৈরি হয় না, বরং আতংকের এক শিরশির অনুভব পা থেকে মাথা ছাড়িয়ে স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলে। অর্থাৎ তার কবিতা সংক্রামক। পাঠক সংক্রমিত হতে হতে এক ঐন্দ্রজালিক সুরের টানে ছুটতে থাকেন রুদ্ধশ্বাসে। কারণ ভাষার গতিময়তা, বিষয়গত চমক আর কিছুটা থ্রিলারধর্মীতার কারণে পাঠক পিছু হটতে পারেন না কিছুতেই । এ যেন হ্যামিলনের সেই জাদুর বাঁশি। যার ডাকে ছুটতে হয় অনিবার্যভাবে।

মুনিরার কবিতা এক পেন্ডুলাম, যা জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণকে দোলায়িত করে অবিরত। যদিও তা এক পর্যায়ে একপেশে হেলে মৃত্যুকেই জয়ী করে তোলে। আর এ মৃত্যু যেন খরসমুদ্রে ডোবা এক অগ্নি-গোলক।  চোখকে ধাঁধিয়ে দেয়, আহত করে দারুণভাবে।

‘কোনো এক পূর্ণিমার রাতে

মৃত পশুর মাথার খুলিতে কবিতা লিখে গিয়েছিল পূর্ব পুরুষ

আমি সেই সব পশুদের প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছি

কবিতাগুলোকে হত্যা করেছি।’

অথবা

‘কে যেন আমার কণ্ঠস্বর থেকে

নিদ্রাতুর কিছু শব্দ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় নিধুয়া পাথারে

অত:পর কাচের করাত দিয়ে শব্দগুলো কুচি কুচি করে ভাসিয়ে দেয়

আড়িয়াল খাঁর বুকে

ভাসে গলাকাটা নদী

ভাসে নারী

ভাসে গলাকাটা নক্ষত্র’

কিংবা কবি বলেন,

‘ডায়রিতে আছে হরিণের মাথা, কাক ও পেন্সিল, আমার প্রেমিকের কলিজা ও পাতিহাড়

মৃত ঈশ্বরের কবর ও চিতা পাশাপাশি

আজ একপাল মৃত পাখি উড়ে এসেছে ব্যবিলন থেকে, আরও একবার

আত্মাহুতি দেবে বলে।

আমি ডায়রির ভেতর লুকিয়ে পড়েছি

ছায়া ও শব্দের ছাইদনির ভেতর ছাই হচ্ছি, ছাই।’

মৃত্যুর মতো সমুদ্রও প্রিয় ছিল মুনিরার। তবে তা জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের সমুদ্র বিলাস নয়। মুনিরার সমুদ্র মার্কিন জনপ্রিয় ব্যান্ড linkin park-এর Waiting for the End সঙ্গীতের

This is not the end
This is not the beginning এর মতো। মুনিরার কষ্ট-সমুদ্রের কোন শেষ নেই, শুরুও নেই। রয়েছে কেবল এক মোহাচ্ছন্ন ঘোর যা ভয়াবহ-যন্ত্রণার পেঁচানো সিঁড়িতে ঘুরপাক খেয়ে কবিকে বেসামাল করে বারবার।

কবি বলেছেন,

‘অত:পর স্নান করতে সমুদ্রে যাই

দেখি, সমুদ্র ডুবে আছে আমার ভেতর

ওহে রক্তকরবী, সমুদ্র ডুবে আছে তোমার ভেতরও।’

আবারও রুমির কথায়, ‘তুমি সাগরে এক বিন্দু পানি নও। তুমি এক বিন্দু পানিতে গোটা এক সাগর।’

ঠিক তাই। মুনিরা সমুদ্র হয়ে যান না, সমুদ্রই ডুবে থাকে মুনিরার ভেতর।আর সেই সমুদ্রের ভেতরেই মৃত মুনিরা ডুবে যান ধীরে ধীরে, আর্তধ্বনি বাজাতে বাজাতে….

জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো,

‘রূপ-প্রেম:সবি অন্ধকার,

সব দীর্ঘ নিস্তব্ধতা, কঙ্কাল হবার-শূন্যে মিলিয়ে যাবার।’

দেহান্তরিত হয়ে মুনিরা শূন্যে মিলিয়ে গেলেও তার কবিতা কিন্তু রয়ে যায়, রয়ে গেছে কবিতা প্রেমিক সকলের অনুভবের কোষে কোষে। কারণ তার কবিতা যে এক মেহেকানন্দা নদী, যা প্রবল প্রবহমান দিন থেকে দিনে, ভবিষ্যের দূর দিগ্বলয়ে।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]