মুন্না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শান্তা মারিয়া

এই মহল্লায় সত্যিকারের আপদ যদি কেউ থাকে তো সে মুন্না। মুন্না ঝাড়ুদার। মেথর পট্টির সুইপার কলোনিতে তার বাসা। কিন্তু দিন রাত সে এ মহল্লাতেই পড়ে থাকে। পুরান ঢাকার এসব মহল্লায় সুয়ারেজ লাইন আটকে যাওয়ার ঘটনা খুবই সাধারণ। বন্ধ ড্রেন, ম্যানহোল উপচে যাওয়া নোংরা পানি, সেইসঙ্গে জলীয় ও স্থলীয় বর্জ্যের গন্ধে দম আটকানো বাতাস। নাকে রুমাল চেপে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জায়গাটা পার হয়ে যায় সবাই। তবে নাকে রুমাল চেপে তো আর বাড়ির সুয়ারেজ লাইন আটকে যাওয়ার সমস্যার সমাধান হয় না। তখনই ডাক পড়ে মুন্নার। সেও এসব সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকে। ডাকলেই হাজির। বিপদ বুঝে দরও হাঁকবে সেরকম। কখনও পাঁচশো, কখনও হাজার। পাঁচশো টাকার কমে ওকে ম্যানহোল খুলতে রাজী করানো যাবেনা কিছুতেই। এক’শ দিতে চাইলে বেয়াদপের মতো বলবে, ‘আপনাকে হামি এক’শ টাকা দেই, আপনি নামিয়া লন ওর মধ্যে’।

পাঁচশো টাকার চুক্তি করে কাজ করিয়ে নিয়ে পরে দু’শো টাকা হাতে ধরিয়ে দেয় কেউ কেউ অবশ্য। অশ্রাব্য গালিতে বাতাস ভারি করা ছাড়া মুন্নার তখন কিছু করার থাকে না তা সত্যি। তবে এ ধরণের কাজ সাধারণত কেউ করে না। কারণ একেবারে বধির না হলে মুন্নার ভয়াবহ গালি সহ্য করার ক্ষমতা কারও আছে কিনা সন্দেহ।

রাতে মদ খেয়ে মাতলামি করে তোলপাড় করবে মহল্লা। একমাত্র চাঁদনি ছাড়া ওকে সামলানোর তখন আর কেউ নেই। মুন্নার বউ মরেছে অনেকদিন। চাঁদনি ওর মেয়ে। বাপকে সে যেদিন পারে বকে ঝকে বাড়িতে টেনে নিয়ে যায়। আর যেদিন পারে না সেদিন গলির মধ্যেই কারও বাড়ির সামনে চিত হয়ে পড়ে থাকে। চাঁদনিরই বা প্রতিদিন সময় কোথায়। তারও তো ঘরসংসার আছে। মিউনিসিপালটিতে চাকরি করা জামাই বাউন্ডুলে শ্বশুরের সঙ্গে কোনরকম সম্পর্ক রাখতে নারাজ। চাঁদনি তবু বাপকে একদম ভুলে যেতে পারে না।

ভোর সকালে মহল্লা ঝাড়ু দেয়ার কথা মুন্নার। কিন্তু রাতের মাতলামির রেশ সকাল নয়টার আগে কাটে না। সবার গায়ে ধুলো ছিটিয়ে তবে সে রাস্তা পরিষ্কারে মন দেবে। সপ্তাহে দু’একদিন সেটুকুও হবে না। এইটুকু কাজের জন্য প্রতিমাসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে টাকা আদায়। না দিলে হাঙ্গামার একশেষ। মুন্নার জায়গায় ভালো একজন ক্লিনার রাখার চেষ্টা বহুবার করা হয়েছে। কিন্তু যাকেই রাখা হয় তাকেই সে মেরে ধরে যে করে হোক তাড়াবে। যেন আলুবাজার মহল্লার এই চাকরিটা তার বাপ দাদার  সম্পত্তি। কোন অবস্থাতেই এ অধিকার ছাড়তে সে নারাজ। এসব নিয়ে সালিশ বিচারও হয়েছে কযেক বার। কিন্তু সিরাজ চেয়ারম্যান হয়তো মুন্নার প্রতি অনুকম্পাবশত কিংবা অন্যকোন কারণে এ ব্যাপারে কোন শক্ত পদক্ষেপ কখনও নেয়নি।

সিরাজ চেয়ারম্যানের মেয়ের বিয়ের আয়োজন চলছে। কথাবার্তা অনেকদিন ধরেই চলছিলো। তবে এবার বোধহয় সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। বিভিন্ন ক্লাসে কয়েকবার ফেল করার পর শেষপর্যন্ত ক্লাস নাইনে যখন মেয়ে উঠেছে তখন তার বিয়েতে তো আর দেরি করা চলে না। তারস্বরে মাইকে বাজছে গান। পনেরো দিন ধরেই কুছ কুছ হোতা হায় শুনতে শুনতে কান ঝালপালা।

সিদ্দিক বাজার কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের ব্যবস্থা। কিন্তু খাসি, গরু, মুরগি সাতদিন আগে থেকে বাড়ির সামনে বেঁধে না রাখলে চলবে কেন। বড় মেয়ের বিয়েতে চেয়ারম্যানসাহেব খরচাপাতি করেননি একথা যেন কেউ ভুলেও না মনে করে। ঝাঁকাভর্তি মুরগির ক্যাঁক্যাঁ আওয়াজে মহল্লা সরগরম। আস্ত গরু জবাই হবে, খাসিরও কমতি নেই। অবস্থা দেখে মনে হয় রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন চলছে।

চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির গলিতে পিছন দিকে ছোটখাটো একটি বস্তির অস্তিত্ব আছে। পাড়ার রিকশাওয়ালা আর ভ্যান চালকরা ছাড়াও সেখানে দু’একজন দোকান কর্মচারীর বাস। ভালো রকম একটা ভোজ খাওয়ার আশায় তারা সকলেই খুব উত্তেজিত। চেয়ারম্যান সাহেব দাওয়াত দিক আর না দিক, বিয়েবাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসলেই চলবে। আর কার্ড দেযা, দাওয়াত এসব তো মানীগুনী বড়লোকদের জন্য। গরীবগুর্বা লোকরা ভোজের গন্ধ পেলেই হাজির হবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

পানচিনি, গায়ে হলুদ সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। যদিও বাড়ির দরজায় উকিঁ ঝুঁকি মেরেছে সবাই। পোলাওয়ের গন্ধ শুঁকেছে আর বিয়ের দিনটির জন্য উন্মুখ প্রতীক্ষা।

বিয়ের দিনে সিদ্দিকবাজার কমিউনিটি সেন্টারে তিলধারণের জায়গা নেই। দাওয়াতি অ-দাওয়াতি সবাই হাজির। মহল্লার এমন কোন পরিবার নেই যারা বিয়েতে যায়নি। দাওয়াত পায়নি এমন অনেক ভদ্রলোকও হাজির হতে দ্বিধা করেনি। দেখা গেলো না শুধু মুন্নাকে। পোলাও, বোরহানি, রোস্ট, রেজালার ছড়াছড়ি। খাদ্যের আয়োজনে খাইয়েরা মুগ্ধ। মহল্লাশুদ্ধু মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য, হ্যা একটা বিয়ের মতো বিয়ে বটে।

পরদিন সকালে গলির মুখে ঝাড়ু হাতে যথারীতি মুন্নার আগমন। মুন্নাকে দেখেই চেয়ারম্যানের বুড়া দারোয়ানের আফশোস শোনা গেলো। ‘আরে মিয়া, কাইলকা আছিলা কই?এতো লোকে খাইল, তোমারে দ্যাখলাম না’।

মুন্নার নির্বিকার জবাব, ‘সাব হামকো বুলায়া নেহি তো হাম ক্যায়সে যায়েঙ্গে।’

দারোয়ানজি এবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, ‘আরে মিয়া, তুমারে আবার খাস কইরা বুলাইতে হইব নিহি। তুমি কুনহানকার নওয়াব আইছ?’

খাস দাওয়াত হয়তো মুন্না প্রত্যাশা করে না। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব কি একবার মুখেও বলতে পারেন নি যে আমার মেয়ের বিয়েতে মুন্না তোমরা সবাই এসো। দারোয়ানজিকে একথাই বলে মুন্না অভিমানি স্বরে উত্তর দেয়, ‘বিন বুলায়কে হাম নেহি যাতে। কিউ যায়েঙ্গে? হাম ইনসান নেহি?দাওয়াত কি কাবিল নেহি?’ (বিনা দাওয়াতে আমি যাই না। কেন যাবো? আমি মানুষ নই? দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা নেই আমার?)

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]