মৃত্যুঞ্জয়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মেহেরাব মুন

তিন.

ব্যাটারির ভ্যান কাটা দেয়া বাতাস কাটিয়ে এগিয়ে চলে। সুমন আর ঝুমা দুজনেরই অন্তরাত্মার কাঁপুনি গায়ের কাঁপুনি থামিয়ে ওদেরকে স্তব্ধ করিয়ে দেয় ! ধনবাড়ির অলব্ধ ধন ওদের দিকে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে পোকামাকড়, পাখি আর কুকুরের ডাকের সঙ্গে টিটকিরি করে যায় অবিরাম ! সুমন আর ঝুমা অবিশ্বাসের নিঃশ্বাস সাঁতরে পরিস্থির খড়কুটো টেনে ধরে এগোয় ! আর ভাবে … জীবন হচ্ছে আয়নার মতো … হাসি মুখে সামনে এসে দাঁড়ালে এ আয়না হাসি মুখ দেখায় … ! কাঁদতে কাঁদতে সামনে এসে দাঁড়ালে জীবন দেখায় কান্নার মুখ !
ধনবাড়ি এসে গেছে ভ্যান । ভ্যানওয়ালা ওদেরকে নিয়েই চলছে তবু । সুমন বলে উঠলো, এটাই তো ধনবাড়ি ! বাস স্ট্যান্ড দেখতে পাচ্ছি ! তুমি যাও কোথায় ?
ভ্যান ওয়ালা বললো, – এইখানে একটা ভাল গ্যারেজ আছে ।
চলতে চলতে একটা বকুল গাছের নীচে ভ্যান এসে থামে । টুং টাং শব্দ হচ্ছে গ্যারেজে ! হলুদ রং এর নন পাওয়ার সেভার লাইট ! খুব অদ্ভুত একটা সুগন্ধ ! খুব চেনা !
ঝুমা বললো, কেমন চন্দন আর ধুপের গন্ধ পাচ্ছি ! বকুল ফুলের গন্ধ তো সঙ্গে আছেই ! গাছের নিচে পড়ে আছে কিছু ফুল ! একদম তাজা !ঝুমা নেমেই ফুল কুড়াতে আরম্ভ করে দেয় !
সুমন কিছু বলতে যাবে এমন সময় গ্যারেজ থেকে একজন দীর্ঘদেহী যুবক বেরিয়ে আসে । কোঁকড়া চুল , বাদামি চোখ । লাল ফিতার মত এক জোড়া ঠোঁট । গায়ে নীল রং এর শার্ট হলুদ আলোয় অন্যরকম দেখাচ্ছে !
ছেলেটার চোখে একধরনের সম্মোহন শক্তি আছে ! সুমন আর ঝুমা দুজনেরই মনে হলো তাই !
ভ্যান ওয়ালা বললো – মৃত্যুঞ্জয় , দেখ কারা আইছে । হাল করবার পারছো কিনা দেখ !
মৃত্যুঞ্জয় ! নামটা বেশ ! উপন্যাসের নায়কের মতো ! ঝুমা খুব আগ্রহী হয় ওর প্রতি ! কিন্তু আগ্রহে ভাটা পড়ে প্রকৃতির ডাকে । মেয়েদের জন্যে পাবলিক টয়লেট এই দেশের একটা বিরাট সমস্যা ! ঝুমা অনেকক্ষণ চেপে ছিলো ব্যাপারটা । কিন্তু যেই ভ্যানটা থামলো চেপে রাখবার ক্ষমতাও যেন থেমে গেল সঙ্গেসঙ্গেই ! ঝুমা সুমনকে ডেকে বললো, দেখতে কোন টয়লেট আছে কিনা !
মৃত্যুঞ্জয় কি বুঝলো কে জানে , সুমনের কথা শেষ হতেই বললো , এই গ্যারেজ আমার । পেছনে আমার দিদির বাড়ি । আপনারা চোখে মুখে জল দিতে চাইলে আসুন । ভেতরে পানির ব্যবস্থা আছে । সুমন বললো – আমি না, আমার পরিবারের একটু ফ্রেশ হবার ছিলো , অনেক জার্নি করেছে কিনা !
সুমন ঝুমাকে বললো, তুমি ওর সঙ্গে ভেতরে যাও আমি গ্যারেজে আছি । ঝুমা ভেতরে গেলো মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে ! ছিমছাম একটা বাড়ি ! বাড়িতে একজন মহিলা আছেন । সিঁদুরটা জ্বলজ্বল করছিলো … ঝুমাকে দেখে আর মৃত্যুঞ্জয়ের কথা শুনে এগিয়ে এসে মোজাইক করা টয়লেটের দরজা দেখিয়ে দিলো সে। ঝুমা আদাব জানিয়ে ভেতরে গেলো ফ্রেশ হতে। এসে দেখল ভদ্র মহিলা কিংবা মৃত্যুঞ্জয় কেউই নেই ! যে পথে এসেছিলো একলা সে পথেই হেঁটে এসে ঝুমা সুমনকে ফোন হাঁতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো গ্যারেজের সামনে। ও যে ঝুমার পথ চেয়ে ছিলো বোঝা গেলো । ঝুমা এসে বসতে চাইলো ভ্যানেই । কিন্তু সুমন বললো, ভ্যান ওয়ালা চলে গেছে । আর মৃত্যুঞ্জয় ওর জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে ওদের সঙ্গে যাবে বলে ।
ওরা রওনা হলো আবার । কোন জায়গায় নষ্ট হয়েছে গাড়ি ! যাহ ! নামটাই তো জানে না জায়গার ! মৃত্যুঞ্জয় বললো, কাকনিয়াটা ! সুমন বললো – ওটা কি ? মৃত্যুঞ্জয় বললো, ওখানেই গাড়ি রয়েছে আপনাদের ! সুমন ভাবলো ভ্যান ওয়ালা মনে হয় বলেছে ওকে জায়গার নাম! তাও ভাল !
ওরা একটা ট্যাম্পো রিজার্ফ করে নিলো । মৃত্যুঞ্জয় বললো, ভাড়া তো বেশি চাইছে – ১০০ টাকার জায়গায় ৩০০ ! ট্যাম্পো ওয়ালা বললো – তিন বছর আগের ভাড়া চাইলে হোব ? এহনকার ভাড়া চান্নাগবো ।
সুমন বললো – থাক , আসুন এটাতেই ওঠা যাক । ওরা সবাই উঠে বসলো ট্যাম্পোতে । ভটভট আওয়াজ করছে ট্যাম্পো । রাতের নিস্তব্ধতা একটু হলেও তাড়িয়েছে এই যানটি ! ঝুমা তাকিয়ে দেখছে মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে । ছেলেটার গায়ের রং বাইরে কেমন বদলে গেছে ! মনে হচ্ছে যেন অনেকদিন কোন বাক্সে বন্দি ছিলো ! কেমন ফ্যাকাসে সাদা টাইপ হয়ে গেছে ! গায়ের শার্টটাও কেমন ময়লা ! মনে হয় যেন ধুলা আর রক্তের দাগ শুকিয়ে জায়গায় জায়গায় লেপ্টে আছে !
কি হচ্ছে আজ কে জানে ! ঝুমা সব দেখে বুঝে চোখ বন্ধ করে ফেলে ! মনে মনে জোর করে কাটাতে চায় সময়টুকু । যেন পলকের চাপে নিয়ে আসতে চায় ভোর !
ট্যাম্পো এগিয়ে চলে ব্যাটারির চেয়ে তীব্র গতিতে । তেলের গতি বড় গতি ! এই গতি জাহিলদেরকেও যুবরাজ বানিয়ে দেয় !
ঝুমা আর সুমনের কি হবে কে জানে ! কাকনিয়াটা চলে আসে ওদের ট্যাম্পো । ওখানে বসে আছে ঝুমার এক কাজিন আর ওর ছোট ভাই ! দুই তিনবার অন্ধকারে কাঁদায় আছাড় খেয়ে ওরা এসেছে এইখানে হেঁটে হেঁটে। ঝুমা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখে পাঁচ ছয়বার ফোন দিয়েছে ওরা । ও টয়লেটে যাবার সময় ব্যাগে ফোন রেখে গিয়েছিলো । শুনতে পায়নি ! সুমনকে দেখে ওরা এগিয়ে আসে। আর মৃত্যুঞ্জয় গাড়ি ঠিক করতে দ্রুত হাত লাগায় । সুমন ঝুমাকে বলে ওদের সঙ্গে বাড়ি চলে যেতে । গাড়ি ঠিক হতে কত সময় নেয় কে জানে ।
মৃত্যুঞ্জয় বলে, গাড়ি যদি ঠিক না হয় আমি ঠেলে গাড়ি ধনবাড়ি নিয়ে যাব । আপনি চিন্তা করবেন না । আপনি দিদিকে বাড়ি দিয়ে আসুন । আমি আছি !
ঝুমা সুমনকে ছেড়ে ওদের নিয়ে বাড়ি যেতে চায় না ! মৃত্যুঞ্জয়ের জয়ের সাহসী বাণী ঝুমার মনকে সিক্ত করতে পারে না । ঝুমা সুমনের দিকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় চোখ নিয়ে তাকায় । ঝুমাকে সুমন বলে – যাও , আমি ফোন করবো । ঠিক হতে সময় লাগবে গাড়ি !
এমন সময় মৃত্যুঞ্জয় বলে, তেলে ময়লা ছিলো সম্ভবত । ইঞ্জিনে ঢুকতে পারে । গ্যাসে চলছে গাড়ি ! কিন্তু বাড়ি পর্যন্ত গেলে আবার গাড়ি নিয়ে ফেরা যাবে না ! তাই জামালপুর গিয়ে গ্যাস আনতে হবে ! পথে গ্যাস ফুরিয়ে গাড়ি বন্ধ ও হয়ে যেতে পারে !
এমন পরিস্থিতিতে ঝুমার মন চায় না সুমনকে একা ছেড়ে যেতে ! কিন্তু … উপায় নেই ! মৃত্যুঞ্জয় হঠাৎ এক জোড়া জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে ঝুমার দিকে তাকায় … ! সেই চোখে কি ছিলো জানে না ঝুমা, কেবল ইচ্ছে হয় খুব শান্তি নিয়ে এখানেই ঘুমিয়ে পড়তে ! টি স্টলের মালিক বসে ছিলো দোকান খুলে । সবাইকে চা খাওয়ানো শেষ হলে চুলার শেষ কিস্তি চুকিয়ে সে ও দোকান বন্ধ করতে আরম্ভ করে দেয় । আর বলে বাইরের লাইট সে জ্বালিয়ে রাখবে গাড়ির কাজের জন্যে । একটা ব্যাটারি চালিত ভ্যানও ডেকে দেয় সে। দশ মিনিটের কাঁদার রাস্তাটা যাতে ও পৌঁছে দেয় ঝুমাকে । ঝুমার ছোট ভাই আর কাজিন হাতে নেয় গাড়িতে থাকা জরুরি ব্যাগগুলো … ! ওরা রওনা হয় ধীর গতিতে … পেছনে থেমে থাকে সুমনের স্থবির গাড়ির স্তব্ধ চাকা … আর মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে থাকে গাড়ি সহ ভবিষ্যতের চাবি ……(চলবে)

একটি অতিপ্রাকৃত সত্যি গল্প

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]