মৃত্যুঞ্জয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মেহেরাব মুন

চার.

ঝুমা তার চাওয়া ইচ্ছের টুঁটি টিপে না চাওয়া ইচ্ছের গলায় ফুলের মালা ঝুলিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। ওর কাজিন আর ছোট ভাইদের হাতে থাকে ব্যাগগুলো। আর সুমনের হাতে থাকে ঝুমার তাবৎ হৃৎপিণ্ডটা । ঝুমার কাছে যদি কিছু থেকে যায় , তো সে বাকি থাকে কেবল মাত্র অস্থিরতাই ।
মৃত্যুঞ্জয় হঠাৎ ভ্যান ওয়ালাকে বলে , হাবুর মোড় দিয়ে না, ভেঙ্গুলা বাজারের পথ ধরে গেলে কাঁদা কম পোহাতে হবে ! চায়ের দোকানের মালিক চমকে ওঠে কথা শুনে ! ও পথে রম্বা ডাকাতের বাড়ি ! রম্বা ডাকাত ক্রস ফায়ারে মরেছে গত বছর ! তাছাড়া মিরডাঙ্গার হিজল গাছের নিচে প্রায়ই এক মহিলার কান্না শোনা যায় ! মিস্ত্রি এই পথে কেন যেতে বলছে ভ্যান ওয়ালাকে ! সে তো ধনবাড়ি থেকে এসেছে ! পথের ইতিহাস সে কি করে জানবে যে বাতলে দিতে চাইবে !
দোকানের মালিক কাঁপা কণ্ঠ নিয়ে বলে ওঠে – না না ! ওই পথে না ! ওই রাস্তা খুব একটা ভালা না । হাবুর মোড় দিয়াই যাইন । মৃত্যুঞ্জয় তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো – আজ হাবুর মোড়ে গণ্ডগোল হবে । আমার গ্যারেজে অনেকেই আলোচনা করছিলো । ঠিকাদারি নিয়ে মারামারি হতে পারে রাত দশটার পর । এ রাস্তায় এখন না যাওয়াই ভালো হবে । বলে মৃত্যুঞ্জয় সুমনের দিকে তাকালো । সুমন বললো – ঠিক আছে , মিশু, তিতিল ? তোমাদের ফোন তো অন আছে না ? আর ঝুমা তোমার ফোন হাতে রেখো । ভেঙ্গুলা দিয়েই যাও । মিশু বললো – ভাইয়া আমি বাড়ি থেকে সুজা আর সামু কে আসতে বলে দিয়েছি ওরা পথেই আছে আপনি চিন্তা করবেন না ।
মৃত্যুঞ্জয়ের চোখে ঝুমা অনেক আগেই বিস্ময়কর কিছু একটা দেখেছিলো । এবারে তাকিয়ে থেকে সে আরও বিস্মিত হলো । মনে হলো যেন নেকড়ের চোখের মত জ্বলজ্বল করছে ওর চোখ । কিছুক্ষণ আগে মনে হওয়া ফ্যাকাসে চামড়ার রং এখন মনে হচ্ছে যেন মিশরের নিল নদের মত চিকচিক করছে ! এত জীবন্ত কোন জীবিত মানুষকেই মনে হয়নি ঝুমার আগে ! চোখের সামনে যেন মৃত্যুঞ্জয় নয় , দাঁড়িয়ে রয়েছে কোন যখ !
ঝুমার ভ্যানওয়ালা ভেঙ্গুলার দিকে ভ্যান ঘুরিয়ে যাত্রা আরম্ভ করে । হেঁটে হেঁটে সঙ্গে পথ চলে ওর ছোট ভাই আর কাজিন । রাস্তায় অনেক কাঁদা থাকবার কথা । কিন্তু এই রাস্তাটা চওড়ায় একটু কম হলেও কাঁদা একদম নেই । মাঝে মধ্যে ভাঙ্গা একটু । আর বাড়িঘর গুলোও বেশ অনেক দূর পর পর ! ভ্যান চলছে কিন্তু ঝুমার চোখ আটকে আছে মৃত্যুঞ্জয়ের চোখে ! কেমন করে এত স্পর্ধা হলো ঝুমার ও দু’টো কে বিশ্বাস করবার ! কেমন করে ছেড়ে দিয়ে আসতে পারল সুমনকে অচেনা জায়গায় অজানা একজনের সঙ্গে ! ইচ্ছে করছিলো ভ্যান ওয়ালাকে ভ্যান ঘুরিয়ে কাকনিয়াটা যেতে বলতে ! কিন্তু বললো না ঝুমা । বাড়ির দিকে চলতেই থাকলো নিরন্তর ।
মৃত্যুঞ্জয় গাড়ি স্টার্ট করে সুমনকে চাবি দিয়ে বললো,নিন এবার চলুন জামালপুর থেকে গ্যাস নিয়ে আসি । তিরিশ কিলোমিটার যেতে হবে । এক পয়েন্টে যাওয়া যাবে মনে হয় । সুমন বললো যদি পথে আটকে যায় ? গ্যাস শেষ হয়ে যায় ? মৃত্যুঞ্জয় সাহস দিয়ে বললো – আমি তো আছি ! দরকার হলে একাই ঠেলে নিয়ে যাব গাড়ি গ্যাস পাম্প পর্যন্ত । আপনি চিন্তা করবেন না । আপনি শুধু দেখুন যে আপা পৌঁছেছে কিনা ঠিক মতো ।
ওহ ! সুমনের তো মনেই ছিলো না ঝুমার কথা ! গাড়ির চিন্তায় একদম ফোন করবার কথা ভুলে বসে আছে ! ফোন করতে যাবে এমন সময় ঝুমার ফোন এলো । কথা শেষ করে সুমন গাড়ি নিয়ে জামালপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো । তখন রাত ১২ টা বেজে গেছে । রাস্তাঘাটে শুনশান নীরবতা । জীব বলতে কেবল সুমন আর মৃত্যুঞ্জয় ! কিংবা সঙ্গে এই গাড়িটাও !
সুমন মৃত্যুঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলো , এই এলাকায় কতদিন যাবত থাকা হচ্ছে ? মৃত্যুঞ্জয় বললো গত তিন বছর ধরে থাকি না । সুমন বললো – তবে ? গ্যারেজ কে দেখে – মৃত্যুঞ্জয় উত্তর দেয় – কেউ দেখেনা ! আজ অনেক দিন পর গ্যারেজ খুলেছি।
সুমনের কেমন অপরাধ বোধ হলো কথাটা শুনে । মৃত্যুঞ্জয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে দুঃখ নিয়ে বললো – আহারে – আর আজকেই আমি আপনাকে কত ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছি ! আপনি নিশ্চয়ই রিলাক্স মুডে দোকানে বেসেছিলেন আজ ! ইদের পরদিন বলে কথা !
মৃত্যুঞ্জয় আঁতকা গাড়ির স্টিয়ারিং হাত দিয়ে ঘুরিয়ে দিলো । আর একটু হলেই গাড়ি নিয়ে ওরা খাঁদে পড়ে যেতো ! এইখানে কালভার্ট করা আছে । তাই রাস্তা কাটা । রাস্তা বন্ধের সাইনবোর্ড কে যেন খুলে নিয়ে গেছে ! মৃত্যুঞ্জয়ের হাত না পড়লে বেহাত হয়ে যেত জীবন আজ ! সুমন ধন্যবাদ হিসেবে ওর পিঠে চাপড় দিলো । দিয়েই চমকে উঠল সুমন । মনে হল যেন মরা মানুষ ! শক্ত ! আর ভীষণ ঠাণ্ডা শরীর ! সুমন আবারো মৃত্যুঞ্জয়ের চোখের দিকে তাকালো একবার ! কেমন কাটা কাটা চেহারা ! জ্বলজ্বলে চোখের মনি ! এত স্বচ্ছ চোখ সুমন কখনো দেখেনি আগে !(চলবে)

( একটি অতি প্রাকৃত সত্যি গল্প)

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]