মৃত্যুঞ্জয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মেহেরাব মুন

পাঁচ.

আর ভাললাগছে না ! পথের যেন কোন শেষ নেই ! আজ মৃত্যুঞ্জয় সত্যিকারের মৃত্যুঞ্জয় হয়ে না আসলে সুমনের কি যে হতো কে জানে ! ঝুমার ফোন এলো । মৃত্যুঞ্জয় অনেক আগে থেকেই ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিলো ! ও এরকমই । কোন কিছুর দিকে মন চাইলেই অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে ! এই অল্প কিছুক্ষণে ওর অনেক বিশেষত্বই আলাদা করা গেছে যেটা আর সবার থেকে আলাদা !

ঝুমা ফোনের ওপাশ থেকে যা বললো , সে কথা শুনে সুমনের হাত তখন রীতিমত কাঁপছে ! কিছুক্ষণ আগে বাড়িতে খবর এসেছে – হাবুর মোড়ে সাংঘাতিক মারামারি হয়েছে । কে বা কারা হাকিম বি এস সি র ট্রাকের গতি রোধ করে ইট সুড়কি ফেলে দিচ্ছিলো , আর তখনই গ্রামের দুই পক্ষের লোক মিলে রক্তক্ষয়ী গণ্ডগোলটা শুরু হয় ! সেই সময় ঝুমারা মৃত্যুঞ্জয়ের কথা মত আরেক রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলো ! ওই পথে গেলে আজ নির্ঘাত মাঠে মারা পড়তে হতো !
মৃত্যুঞ্জয় আবারো এক মৃত্যুকে জয় করলো ! সুমন কেন জানিনা বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠলো ওর প্রতি ! ওকে জিজ্ঞেস করলো –
মৃত্যুঞ্জয় , বিয়ে করেছেন ? মৃত্যুঞ্জয় কথাটা শোনা মাত্রই চমকে উঠলো আর ঠিক সেই মুহুর্তে গাড়ির রেডিও আর ডিভিডি একই সঙ্গে বেজে উঠলো ! সুমনের জীবনে এই রকম সমস্যা কখনো হয়নি আগে ! বন্ধই হচ্ছে না ! একটা চাপড় মেরে দেয়াতে দু’টোর আওয়াজই থামলো ! সুমন বললো – কি যে হয় মাঝে মধ্যে গাড়িটার !
মৃত্যুঞ্জয় , আর কতক্ষণ লাগতে পারে জামালপুর যেতে ? মৃত্যুঞ্জয় বললো – ১০ মিনিট লাগবে । সুমন তেলের সম্ভাবনা মিলিয়ে নেয় । পাঁচ মিনিট পর সমস্ত সম্ভাবনা গুড়িয়ে তুসের ছাই বানিয়ে দিয়ে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায় ! তার মানে তেল শেষ ! সুমন মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে এক জোড়া বিকল চোখ নিয়ে তাকায় । মৃত্যুঞ্জয়কে কিছুই বলে দিতে হয়না ! সে সোজা নেমে গিয়ে গাড়ি ঠেলতে আরম্ভ করে দেয় !
কি ভীষণ অপরাধবোধ যে হচ্ছে সুমনের ! বোঝানোর উপায় নেই ! এই লোকটা গাড়ি পর্যন্ত ঠেলছে ! ইদের পরদিন বাড়ি এসে দোকান সখের বসে খুলেছে ! বউ বাচ্চা অপেক্ষা করছে হয়তো ! বউ বাচ্চার কথা আসতেই সুমনের মনে পড়ে – আচ্ছা ছেলেটাকে বাড়িতে একটা ফোন করতে দেখেনি তো ! এই কথা ভাবতেই সুমন আন্দাজ করতে পারলো – গাড়ি বেশ জ্বোরে চলে যাচ্ছে ! এত জ্বোর দিয়ে একলা কোন মানুষের পক্ষেই গাড়ি ঠেলতে পারা সম্ভব নয় ! সুমন আয়নায় দেখবার চেষ্টা করল মৃত্যুঞ্জয়কে । কিন্তু একি ! কোথায় সে ? গাড়ি ঠেলছে কে তবে ?
হঠাৎ সুমন টের পেলো গাড়ি আর ঠেলছে না কেউ ! সামনে অনেক লম্বা গাড়ির লাইন দেখা যাচ্ছে ! ডান পাশে আঁতকা মৃত্যুঞ্জয় জানালা দিয়ে এসে সুমনকে চিৎকার করিয়ে দিতে বাধ্য করলো !
মৃত্যুঞ্জয় গম্ভির মুখ নিয়ে বললো – ভয় পাইয়ে দিলাম নাকি ! আমরা এসে গেছি ! সম্ভবত ভোর হয়ে যাবে গ্যাস নিতে নিতে ! আমি অপেক্ষা করছি । আপনি যান ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিন । আর আপাকে পারলে একটা ফোন করে দিন । সুমন এইবার চলে যাবার সময় খপ করে মৃত্যুঞ্জয়ের ঠাণ্ডা হাতটা ধরে ফেললো । মৃত্যুঞ্জয় একটুও না চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল সুমনের দিকে যেন সে জানতো সুমন এখন ওর হাত টেনে ধরবে ! সুমন বললো – কে তুমি ভাই ? গাড়ির মিস্ত্রি হয়ে এসেছিলে ! কিন্তু যা করলে … ! টাকা দিয়ে কি করে আমি এর শোধ দেব বলতে পার !!
মৃত্যুঞ্জয় বললো – দেবেন না ! টাকাই যে সব বিনিময়ের মধ্যস্থতাকারী এই সত্য কে কবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছে ?
সুমন ওর কথার কাঠিন্যে থমকে গেলো ! এইভাবে মাঝে মধ্যে ঝুমা কথা বলে ওকে চমকে দেয় ! ভোর হয়ে যাচ্ছে , গ্যাসের লাইনে সুমনের গাড়ি এগিয়ে এসেছে অনেকটা । গ্যাস নেয়া শেষ হলো । মৃত্যুঞ্জয় কোথায় যেন গিয়েছিলো । মনে হল একটা জংগল থেকে বেরিয়ে আসছে ! গাড়িতে উঠে মৃত্যুঞ্জয় বললো – আমাকে সামনে নামিয়ে দেবেন । সুমন বললো – কেনো? ধনবাড়ি নামিয়ে দিয়ে আসি ! মৃত্যুঞ্জয় বললো – না। তার দরকার হবে না। আমাকে একটা কাজে যেতে হবে সামনে ! সুমন মাথা মুণ্ডু কিছুই না বুঝতে পেরে সামনে মৃত্যুঞ্জয়ের কথা মতো ওকে নামিয়ে দিল । মৃত্যুঞ্জয়কে টাকা দিতে চাইবে এমন সময় ও বললো – বলেছি তো … টাকা দিয়ে সব দায় থেকে মুক্ত হতে নেই ! আর আমার কাছে আপনার কোন দায় এমনিতেও থাকবে না ! যাই ! আপনি গ্লাস আটকে সোজা টেনে যাবেন । থামবেন না । রাস্তায় এই সময় নানান কিসিমের জিনিস থাকে । সাবধান !
এক মুহুর্তেই মৃত্যুঞ্জয় গায়েব হয়ে গেলো মনে হলো ! সুমন ডান দিকে গাড়ি মোড় নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের কথা মতো গাড়ি টান দিলো । আয়তুল কুরসি, সূরা নাস একে ওপরের সঙ্গে বিনিময় হতে থাকলো সুমনের মুখে মুখে ! কে কোনটা ঠাহর করা মুশকিল ! তবুও সুমন পড়ছে ! ভুতের ভয় বড় ভয় এই একলা পথে ! যে ফেইস করেছে সেই জেনেছে !
ঝুমা বাড়ির সিঁড়িতে বসে আছে ওর কাজিনদের নিয়ে। নতুন বিয়ে করা বউও এসে বসেছে । সুমন এলে তবেই সবাই ঘরে যাবে ! ঝুমা বারবার ফোন দিচ্ছে না, তা সে যতোই জানবার উদ্দীপনা থাকুক যে ,সুমন কোথায় আছে এখন ! গাড়ি চালাবার সময় এই গ্রামের পথে ফোনালাপ না করাই চালকের জন্যে হিতকর !
সুমন আনুমানিক ৪ টা নাগাদ বাড়ি এসে পৌছালো ! ঝুমা খাবার গরম করে রেখেছে । ইলেক্ট্রিসিটি চলে না গেলেই হয় এখন ! তবু পাশে মোমবাতি আর হাত পাখা রেখেই খেতে দিয়েছে সুমনকে ।
সুমন খাচ্ছে আর গল্প করছে- মৃত্যুঞ্জয় কি করে প্রাণ বাঁচিয়েছে আজকে ওর !
ঝুমার কেমন যেন ঠেকে সব কিছু ! সুমনকে বলে – যাবার সময় গ্যারাজে ওর সঙ্গে একটু দেখা করে যাবো আমরা কেমন ?
সুমন বলে- গুড আইডিয়া । ওকে একটা গিফট দিতে চাই আমি। ওই বেটা কিছু নিলোই না জানো ? বলে কিনা আমার নাকি ওর কাছে কোন দায় নেই ! কথা হলো !
দুই দিন পর । ওরা রওনা হচ্ছে ঢাকার উদ্দেশ্যে । সেই বট চা এর ওখানে আবার গাড়ি থামিয়ে চা খাচ্ছে ওরা । চাওয়ালাকে প্রশ্নের তোড়ে টিকতে না পেরে সব বলতে হয়েছে কিভাবে গ্যাস নিয়েছে সেদিন ; কিভাবে বাড়ী ফিরেছে !
ধনবাড়ি গিয়ে সেই গ্যারেজে দেখা করে আসবে ওরা মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে । কোন পথে যেন ছিলো ! সেদিন রাতকরে এসেছিলো … এখন ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না ! ডানে মোড় ঘুরে বাঁমেই ছিল সম্ভবত ! ঝুমা বললো – সুমন ওই যে বকুল ফুলের গাছটা দেখা যাচ্ছে !
কিন্তু একি ! এ গাছ তো মরে গেছে ! দুইদিন আগেই না কত ফুল ধরেছিল গাছে ! ঝুমা এসে ফুল কুড়িয়েও নিয়েছিলো ! আর দোকানের নেমপ্লেট কোথায় ! এত কাঠ আর গাছের গুড়ি দোকানের সামনে !
আচমকা একটা লোক চলে এল সামনে ! আপনারা কাকে খুঁজছেন ?
সুমন বললো – মৃত্যুঞ্জয়কে ! ও কি দোকান বন্ধ করে চলো গেলো নাকি ? দুইদিন আগে আমি এখানে এসেছিলাম ! ওর সঙ্গে একটা ব্যাপারে কথা বলার ছিলো !
প্রশ্নকারী লোকটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললো – এই দোকান তো তিন বছর ধরে বন্ধ !
ঝুমার মনে হলো মাথা ঘুরে গেছে ! টলতে টলতে ও সুমনের কাঁধে ভর করে দাঁড়ালো !
সুমন বললো – মানে ? তিন বছর ধরে বন্ধ মানে ? কি বলছেন ? দুইদিন আগেই তো আমরা সারা রাত এক সঙ্গে ছিলাম !
লোকটা সুমনের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো – আরে বাবা ! তিন বছর আগে মৃত্যুঞ্জয় এই দোকানে বসতো। ওর বউ আর ও মধুপুর বনে বেড়াতে গিয়েছিলো। সেখানে ওর বউ কে তুলে নিয়ে মেরেছিল কিছু বখাটে সন্ত্রাসী ! আর মৃত্যুঞ্জয়ের লাশ পড়েছিলো রাস্তায় ! মামলা করেছিলো ওর দুই ভাই আর ভগ্নীপতি , ওদেরকেও কেউ আর খুঁজে পায়নি । পেছনেই ওর বোনের বাড়ি রয়েছে , সেটাও তালা মারা সেই থেকে । আত্মীয় স্বজন সবাই ইন্ডিয়া চলে গেছে কোন এক মাসতুতো ভাই এর কাছে । আর সেই থেকে এই গ্যারেজটাও বন্ধ আছে !
সুমনের মনে পড়লো হাড়গিলা লোকটা বলেছিলো যে হত্যার সঙ্গে আপন চাচা জড়িত ! তাই কৌতূহল না চেপে রাখতে পেরে ও লোকটিকে বললো , মৃত্যুঞ্জয়ের চাচা আছেন ?
লোকটি অবাক হয়ে জবাব দিল – নাতো ?
সুমন লোকটিকে অনেকটা জোড় করেই থামিয়ে রেখে আবারো জানতে চাইলো , তবে খুনের সঙ্গে যে জড়িত, তিনি নাকি আপন চাচা !
বিস্ময়ে হতভম্ভ লোকটি অনেকটা রেগে গিয়ে প্রতিউত্তর করলো – আরে বাপু ! একবার বলছেন দু’দিন আগে এসে কথা বলে গেছেন , আবার বলছেন যে চাচা খুন করেছে সে আপনি জানেন … ! কি অদিখ্যেতা কথা বলুন দেখি !! বলেই লোকটি বিদায় নিলো !
সুমন লোকটির চলে যাওয়া দেখতে দেখতে সামনের একটা বিকাশ এর দোকানে গিয়ে এক বোতল মাম পানির বোতল কিনতে চাইলো । আর দোকানিকে জিজ্ঞেস করলো – আচ্ছা , এই দোকানের মালিক মৃত্যুঞ্জয় … সে কি তিন বছর আগে … !! কথা শেষ না হতেই দোকানী বললো – যার সঙ্গে কতা কইলাইন হেইতিইতো মৃত্যুঞ্জয়ের বউ এর জ্যাডা ! মানে চাচা ! মৃত্যুঞ্জয় এর বউয়ের সঙ্গে এই বাড়িতে আইছিলো । মাঝখানে রাজনীতিতে হান্দাইছিলো ! হেরা বাকীরাতো বেহেই গেছে গা ইন্ডিয়া ! আর সব জায়গা জমি এই জ্যাডারেই দিয়া গেছে গা ! পাগল বুইড়া … কি তকদীরি কপাল নিয়া জম্নাইছে !! সারা রাইত ভুতের ভয়ে বনে বনে ঘুরে ! আর দিনের বেলায় কিচ্ছু মনে করবার পারে না !দুই বছর ধইরা এই রকম পাগল হইছে ! কাউরে নিজের পরিচয় কয় না ! কয় বলে – পরিচয় কইলে ওরে পুলিশের ভুতে ঘাড় মটকাবো !

কথাগুলো শুনে ঝুমা মাথা ঘুরিয়ে গ্যারেজের ধুলো পড়া সিঁড়িতে বসে পড়লো । সুমন আর কিছু বলার ভাষা পেলো না !
দু’জনে কোন রকমে গাড়িতে গিয়ে উঠলো !
একে একে মনে পড়তে থাকলো রহস্যময় ভ্যানওয়ালা… লাশওয়ালা … আর মৃত্যুঞ্জয়ের সব কথা …… !
ঝুমা আর সুমন গ্যারেজের গলি পাড় হয়ে যেতেই লুকিং গ্লাসের আড়াল থেকে দেখা গেলো … একটা তাজা বকুল গাছের নিচে খোলা গ্যারেজে মৃত্যুঞ্জয় ওর দুই ভাই আর ভগ্নীপতিকে নিয়ে কাজ করছে আর সিঁদুর পড়া এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা হাতে পাখা নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে বাতাস করছে …… তাজা বকুল গাছ থেকে ঝরে পড়ছে সুগন্ধি বকুল ফুল … !
ঝুমা আর সুমন দেখলো … দৃশ্যটা ওদের যেতে যেতে ঘোলা হয়ে পৃথিবী থেকে মুছে গেলো …… !!!(শেষ)

( একটি অতিপ্রাকৃত সত্যি গল্প )

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]