মৃত্যুঞ্জয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মেহেরাব মুন

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

এক.

এভাবে বিনা নোটিশে গাড়িটা খারাপ হয়ে যাবে চিন্তাই করেনি ওরা । খারাপ হবার তো একটা কারণ থাকা চাই, নাকি ! ঝুমা আর সুমন অনেকক্ষণ হয় চেষ্টা করে যাচ্ছে ! টর্চ নেই সঙ্গে । আইফোন সিক্স এস প্লাস জ্বালিয়ে ধরেছে সুমন । ঝুমা গিয়ে বসেছে সেই টি স্টলে ! আর ১০ মিনিটের পথ পেরুলেই বাড়ি । বাড়ি বলতে বাড়ি নয় আসলে । ওটা ঝুমাদের দাদার বাড়ি । পুরোনো ভীষণ ! এবারের ঈদে ওরা এসেছে এখানে ছুটি কাটাতে । আর এসেই একের পর এক বিপদে পড়তে হচ্ছে ওদের ! সেদিন স্যামসং নোট ফাইভটা গেলো । আর আজ গাড়িটা ! টি স্টলে গরুর দুধের চা খেয়েই বাড়িতে ঢুকবে ভেবেছিলো ওরা । ইদের দ্বিতীয় দিনে ওরা গিয়েছিলো যমুনা নদী দেখতে । আসবার সময় হয়েছে এই বিপত্তি । এমন হবে কে ভেবেছিল !

সুমন, গ্যাস শেষ নাকি ?
না এক পয়েন্ট আছে । আর আমি তো সেই তখন থেকে তেলেই চালাচ্ছি । আসবার সময় ট্যাংক ভর্তি করে তেল নিলাম!
ঝুমা গালে হাত দিয়ে বসে থাকে স্টলের মাচাং-এ ।
পাশের বটগাছে একটা পেঁচা ডেকে ওঠে । টি স্টলে কিছু লোক বসে ঈদের গল্প করছিলো । ওরা দেখছিলো ঝুমা আর সুমনের কাণ্ড । এদের একজন সাহস করে বলেই ফেললো, – আপনেরা কুন বাড়ির ?
আমরা খান বাড়ি এসেছি । ঝুমা উত্তর দিলো ।
আচ্ছা, আশপাশে কোন মিস্ত্রী পাওয়া যাবে ? সুমন খুব বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো টি স্টলের লোকদের দিকে তাকিয়ে ।
স্টলের একজন বললো , এইখানে পাবেন না, আপনাগো ধনবাড়ি যাইতে হবে !
কথাটা শুনেই ঝুমা মোবাইলের ঘড়িতে সময় মিলিয়ে নেয় ! এখন বাজে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা ! ধনবাড়ি সে কম করে হলেও ৪০ মিনিটের পথ । আসতে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা ! তার উপর মিস্ত্রী খুঁজে বের করা ! কতক্ষণ লাগে কে জানে !
সুমন উত্তরার পরিচিত গ্যারেজগুলোয় ফোন দেয়। সবাই ছুটিতে চলে গেছে বাড়িতে । এদেরই কেউ একজন বললো,- দেখেন , উমুক জায়গায় চারটা বক্স আছে । চার জায়গার এক জায়গায় ও যদি কারেন্ট না পায় তবে … গাড়ি স্টার্র্ট হবে না । সুমন পরীক্ষা করে দেখে , চারটার কোনটাতেই কারেন্ট সাপ্লাই করতে পারছে না ব্যাটারি !
ঝুমা বাড়িতে ফোন দেয় ওর ছোট ভাইকে । বাড়ির সামনে হাবুর মোড়ে এত কাদা , ওখানে কোন ভ্যান চলে না । ভ্যান বলতে ব্যাটারি চালিত তিন চাকার চলন্ত তক্তা । এখানকার একমাত্র যানবাহন । পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে হয় । আজ সেটাও নাকি চলছে না । চরম বৃষ্টি হয়েছে আজ এই এলাকায় । যমুনায় বেড়াতে গিয়েছিল ঝুমারা । ওখানে বেশ বাতাস ছিলো , বৃষ্টি ছিলো না একদমই । ওরা তাই জানেনা এদিককার কাঁচা রাস্তার অবস্থা ! বাড়িতে নাকি ইলেক্ট্রিসিটি ও নেই ! ঘুটঘুটে অন্ধকারে, কাঁদার স্তূপ মাড়িয়ে বাড়ি থেকে ওদের গাড়ি অব্দি সহজেই আসতে পারাটা তাই নাসার রকেট নিয়ে চাঁদে যাবার সমান !
ঝুমা আর সুমন মিস্ত্রী ডেকে আনতে রাস্তা থেকে একটা ব্যাটারি চালিত ভ্যান নিয়ে ধনবাড়ি যেতে চাইলো। কিন্তু সবাই এখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছে । কেউ উল্টো পথে ধনবাড়ি যাবে না ! ওদিকে বাড়ি থেকে লোক এসে গাড়ির প্রহরী হতেও কতক্ষণ লেগে যাবে কে জানে ! অবশেষে সুমন টি স্টলের মালিককে অনুরোধ করে ওদের গাড়িটা দেখে রাখবার জন্য । আর ওমনি একটা ধনবাড়ির দিকে যাত্রারত খালি ব্যাটারি ভ্যান ওরা পেয়েও যায় ! সুমন আর ঝুমা ওতেই চড়ে বসে । দাম দর জানেনা কিছু তো করবে কি ! যা চায় তাই দেবে ! পেয়েছে যে এটাই অনেক ! স্টলের মালিক বলে, ওরা ফিরে আসা পর্যন্ত সে দোকান খোলা রাখবে ! গ্রামের মানুষগুলো এই জন্যেই আলাদা ! এই কথাটা ওদের কত শক্তি দিয়েছে যদি বোঝানো যেতো !
ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে ! অদ্ভুত সব পোকা ডাকছে সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ! না জানি একে অন্যকে কি বলছে ওরা ! কেউ হয়তো মানুষের বদনাম করছে ! কেউ হয়তো বলছে বর্ষার পানি বেড়ে গিয়েছে … মানুষের বাড়িতে হামলা করতে হবে অচিরেই ! বাঁশ বনের আনাচে কানাচে থেকে ডেকে উঠছে বন্য টিয়া , কিংবা অন্য কোন পাখি ! সেই ডাক শুনে আবার প্রতি উত্তর করছে আরেক জন ! কি বিচিত্র অনুভূতি ওদের ! দূরে কোন বাড়ি সুরক্ষা করতে গিয়ে আচমকা ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠছে কোন কালু বা লালু নামের কুকুর ! ওদের মৌসুম খুব শুভ এখন ! চারিদিকে খাবার ! হাড্ডি আর মাংসের ছড়াছড়ি ! কদিন পরেই আবার ওরা অনাহারী হবে অর্ধাহারী হবে !
একবার ছোট চাচার সঙ্গে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলো ঝুমা ! কুকুর খাবার সংরক্ষণ করে খেতে চায় খুব ! খাবার পেলে দূরে নিয়ে একলা কাওকে না জানিয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে ! কিন্তু আফসোস , ওদের ঘিলু কম মাথায় আর ওরা যেখানে মাংস লুকিয়ে রাখে , সেখানে কোন চিহ্ন রাখতে ভুলে যায় । সে কারণেই পরদিন এসে সেই মাংস কোথায় রেখেছিলো সেটা হাজার চেষ্টা করেও আর খুঁজে পায় না ! বাড়ির পাশে এক কুকুরের কাণ্ড দেখে ছোট চাচা আর ঝুমা খুব হেসেছিলো সেদিন ! আজ কেন জানিনা কুকুরের ডাক শুনে ঝুমার মনে হলো , সেই কুকুরটিই ওদের পরিস্থিতিকে উপহাস করে প্রতিশোধ নিচ্ছে !
ঠাণ্ডা বাতাস জমিতে জমে থাকা হাঁটু পানিকে স্পর্শ করে ঝুমা আর সুমনের শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে বয়ে যাচ্ছে ! ভ্যান চালকটা অদ্ভুত ! পেছন থেকে মনে হচ্ছে যেন একটা রোবট ভ্যান চালাচ্ছে ! পেছনে দুই পাশ থেকে ভাঙ্গা চাপার দুই কোণা দেখা যাচ্ছে ! ঝুমা শক্ত করে সুমনের ডান হাত টা ধরে আছে ওর বাম হাত দিয়ে । আর সুমন ধরে আছে চালকের ক্ষুদ্রতম গদি !
পথের মধ্যে ভ্যান চালক বলে উঠলো … একটু থামন নাগব ! নুক উঠবো একজন !
ঝুমা ভয় পেয়ে সুমনের দিকে তাকালো ! চারপাশে কেউ নেই! দূর দূরান্তে তাকালেও কোন আলো চোখে পড়ে না এক ভ্যানে থাকা চাইনিজ লাইটটা ছাড়া ! এখন ? ডাকাত চক্র হলে !! কি করবে ওরা ! সুমন বলে … কিসের লোক ভাই ? তুমি চালাও না । তোমার লোকের ভাড়া আমিই দেবো তোমাকে ।
ভ্যান ওয়ালা বললো , ভাড়ার নিগা না । লাশ আনছিলাম একটা আহনের হুময় । হেই বাড়ি থিকা একজন আইবো , হে ই লাশের বাড়ি খুঁইজা বাইর করছে আমারে নিয়া …(চলবে)

একটি অতিপ্রাকৃত সত্যি গল্প


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box