মৃত্যুহীন চারু মজুমদার

চারু মজুমদার

চারু মজুমদার মধ্যবিত্তের নায়ক হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন নিপীড়িত মানুষকে নায়কের আসনে বসাতে।  আর তাই ভারতবর্ষের বুকে তিনি তৈরী করেছিলেন ভূমিকম্প। সেই ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া দার্জিলিং জেলার পাহাড় থেকে নেমে এসে কাঁপিয়ে দিয়েছিলো ভারতের রাজনীতি আর প্রশাসনের ঘুনে ধরা কাঠামোটাকে। আজ ২৮ জুলাই চারু মজুমদারের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ভারতের মার্কসবাদী রাজনীতির এই প্রবাদ পুরুষ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন ১৬ জুলাই। প্রায় ১২ দিন ধরে লকআপে অত্যাচার সহ্য করেছিলেন। তারপর ২৮ জুলাই ভোর ৪টায় কেবলমাত্র পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশের প্রহরায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তার নশ্বর দেহ । মাত্র ৯৬ পাউন্ড ওজনের ,অত্যন্ত দুর্বল শারীরিক কাঠামোর অধিকারী এই হাঁপানি আক্রান্ত মানুষটি স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস পাল্টে দেয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

কলকাতা শহরের এন্টিলি নামে একটি এলাকা। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ভোরবেলা কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশের দল ওই এলাকার একটি দোতলা বাড়ি ঘিরে ফেলে। ওই বাড়িতেই আত্নগোপন করেছিলেন এক সময়ে ভারতের রাজনীতির অগ্নিপুরুষ চারু মজুমদার।

চারু মজুমদার ও কানু সান্নাল

কলকাতা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে চারু মজুমদারের গোপন আস্তানার কথা ফাঁস করে দিয়েছিলো তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহযোগী দীপক বিশ্বাস। এই দীপক বিশ্বাস নকশাল আন্দোলনের অন্তিম সময়ে হয়ে উঠেছিলেন চারু মজুমদারের সবচাইতে কাছের মানুষ। চারুবাবু তাকে বিশ্বাস করতেন। ১৯৬৭ সালে, মাও জে দংয়ের সঙ্গে দেখা করতে এই দীপক বিশ্বাসকেই চীনে পাঠানো হয়েছিল। আজো চারু মজুমদারের বেঁচে থাকা অনুসারীদের কাছ থেকে জানা যায়, দীপক বিশ্বাস পুলিশের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মুখ খোলে। আর তাতেই ১৬ জুলাই ভোরে ধরা পড়েন চারু মজুমদার।

চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর দীপক শিলিগুড়িতে ফিরে আসে। কিন্তু নকশালবাদীরা বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেয়। শিলিগুড়িতে চারুবাবুর বাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে হিল কার্ট রোডে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভারতীয় পুলিশের দলিল মোতাবেক চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এমএল)-এর শাখা সংগঠন সেকেন্ড সেন্ট্রাল কমিটির কয়েকজন সদস্যের হাতে নিহত হন দীপক। আরেক নকশাল নেতা আজিজুল হক এই হত্যা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছন,‘অবশ্যই আমাদেরই কেউ হত্যা করেছে তাকে।’ অবশ্য এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের যোগাযোগের কথা তিনি স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করেননি।

জনসভায় শেষবার

চারু মজুমদার তাঁর হাজির করা দলিলে বলেছিলেন, একমাত্র সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের পথ ধরেই ভারতের কৃষক ও জনসাধারণ মুক্তি লাভ করবে সমস্ত শোষণ আর অত্যাচার কবল থেকে এবং ভারতবর্ষকে প্রকৃত ভাবে স্বাধীন করা সম্ভব শুধুমাত্র গণ বিপ্লবের মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন,ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে এক নয়া গণতান্ত্রিক সমাজ গড়া। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বিপ্লবের আগুনে। তারা হাসি মুখে দেশের মুক্তির স্বার্থে প্রাণ বিসর্জনও দিয়েছিলো। নতুন ভাষায় তারা লিখতে চেয়েছিলো ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাস।

চারু মজুমদারের হাতে লেখা পোস্টার

গ্রেফতারের পর চারুকে কলকাতার লালবাজারে পুলিশ চেকআপে রাখা হয়েছিল। গ্রেফতারের খবর পেয়েই পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ছুটে যান চারু মজুমদারের কন্যা অনীতা। কয়েকজন পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে বলে দেখতে পান। ‘নাজুক ছিলেন তিনি, বড্ড শীর্ণ আর ফ্যাকাশে লাগছিল। বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছিলেন,’ বলেছেন অনীতা। ‘ডাক্তারির ছাত্র হিসেবে ওই সময় বাবা অন্ততপক্ষে ইনহেলার বা অক্সিজেন পেলে ভালো হতো বলে মনে হয়েছিল তার। কিন্তু কিছুই পাননি। কথাটা বলতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত, তবে আমি মনে করি তাঁর জীবন রক্ষাকারী সব ওষুধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। আর এভাবেই তারা বাবাকে হত্যা করেছিলো। কিন্তু তাঁকে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতে দেয়া উচিত ছিলো তাদের, লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম খুলে নেয়া উচিত হয়নি।’

নকশাল আন্দোলনের খবর পত্রিকার পাতায়

পুলিশ স্টেশনে আটক অবস্থায় চারু মজুমদারের কাছে তাঁর অবস্থার কথা জানতে চেয়েছিলেন অনীতা। ‘এই পুলিশগুলোর সঙ্গে আছি, যা হওয়ার তাই হবে,’ পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে এটাই ছিলো তাঁর শেষ কথা। ২৮ জুলাই, ১৯৭২ গ্রেফতারের মাত্র ১২ দিন পর পরিবারকে জানানো হয় যে, চারু মজুমদার আর নেই।মেডিকেল কলেজ মর্গে চারু মজুমদারের মৃতদেহ দেখানোর জন্য একের পর এক লাশবাহী ট্রে খোলা হয়েছে। শেষ ট্রেতে রাখা ছিলো তাঁর প্রাণহীন দেহ। চারু মজুমদারের ছেলে অভিজিত্ সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, তার বাবার পায়ের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক কালো ছিল, যেন পোড়ানো হয়েছে।

এর পর একটা গাড়িতে করে পরিবারকে ক্রিমেটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়, যদিও কমিউনিস্ট হওয়ায় চারু মজুমদার কখনই চাননি তাঁর দেহ দাহ করা হোক। ক্রিমেটোরিয়ামের চারপাশ সেনাবাহিনীর লোকজন ঘেরাও করে রেখেছিল। শেষকৃত্য সম্পাদন করতে চেয়েছিলেন স্ত্রী লীলা, কিন্তু তাঁকে অনুমতি দেয়া হয়নি। ছোট অভিজিতকেই চিতায় আগুন ধরাতে বলা হয়েছিলো। সব মিটে যাবার পর চারু মজুমদারের পরিবারকে অবিলম্বে কলকাতা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। অবশ্য সেই রাতটা তারা একটা হোটেলে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাদের এক রাতের জন্য রুম ভাড়া দেয়ায় ওই হোটেলের ম্যানেজারকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

ছবিঃ গুগল