মেঘলা আকাশে উতলা বাতাসে ভেসে বেড়াই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

অবশেষে রাত বারোটার দিকে আমরা গ্রেহাউন্ড এর ডালাস বাসডিপোতে থামলাম। নেমেই দেখি মিলি আপা ও রাশেদ দুলাভাই। তাঁরা অসম্ভব হাসিখুশি মানুষ। আমরা যে তাঁদের দুটো এয়ারটিকেট নষ্ট করলাম তাতে তাদের কিছুই যায় আসেনা।অথচ আমরা ভয়ে ছিলাম।মায়ের মতো বড় বোন,তারচেয়েও বড় দুলাভাই, তাঁরা বকে দিলেও পারতেন কিন্তু উল্টো এতো লম্বা জার্নিতে আমাদের কষ্ট হয়েছে কিনা সেই কুশলাদিই জিজ্ঞেস করতে করতে তাঁদের গাড়িতে উঠালেন।বাসায় গেলাম। আপা দুলাভাই এর তিন কন্যা। ফারহীন, মেহরিন, তাজরিন।তারা যেন মামার চেয়ে মামীকে পেয়েই বেশি খুশি। খুবই আনন্দে দিন কাটছিলো। এখানে ওখানে বেড়ানো, রেস্টুরেন্টে মজার মজার খাওয়া হাসির ফোয়ারা চলছিলো। রাশেদ দুলাভাই খুব গান পছন্দ করেন।

বস্তুত তাঁদের গোটা পরিবারই তাই।একটু পর পরই দুলাভাই গান এ টান দেন বেসুরো গলায়। তিনি তাঁর শ্যালক কে বলেন তুমি তো সুরকার।আমাকে গান শেখাও প্লিজ। তাঁর শ্যালক বলেন আর যাইহোক আপনার এই গলায় গান হবে না।দুলাভাই বলেন আর আমি যদি শিখতে পারি তবে? শালা দুলাভাই এর সেইরকম হাস্যরস চলছে।দুলাভাই বলেন অনেক সাধনা করে একটা আস্ত গান যদি আমি গাইতে পারি তো কি দিবা কও?শ্যালক বলেন যদিও এটা অসম্ভব তারপরও সাধনা বলে কথা, যান,আপনি একটা আস্ত গান সুরে গাইতে পারলে আমি আমার বউ দিয়ে দেবো! সবাই তো শর্ত শুনে হেসে গড়াগড়ি। যাইহোক। আপার মেঝোমেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। সে এক পাগলী মেয়ে।সব কথাতেই তার হাসি পায় আর হাসলেই গড়াগড়ি! সত্যিই কয়টা দিন আমাদের অসম্ভব আনন্দে ভালোবাসায় কাটলো। অনুষ্ঠানের দিন ঘনিয়ে এলো। আমার গান আর ভারতীয় কত্থকনৃত্য শিল্পী আনিতা ব্যানার্জি । স্টেজ রিহার্সাল করতে গেলাম। খুবই পেশাদার সে মঞ্চ।সাউণ্ড প্রুফ দৃষ্টিনন্দন সে অডিটোরিয়াম।

সাতশো দর্শকের মঞ্চ।সে মঞ্চে একটা অভিনব ব্যাপার। অনুষ্ঠানের দিন দেখলাম মঞ্চের প্ল্যাটফর্ম একতলা নীচে।সেখানে আমি বসা।নাম ঘোষণার পরে আমি সেই নীচতলাতেই গান ধরলাম। নজরুল সঙ্গীত,খোলো খোলো খোলো গো দুয়ার, গাইছি আর মঞ্চ উপরে উঠছে।ধীরে ধীরে গান আধাআধি গাইতে মঞ্চ জায়গা মতো সেট হয়ে গেলো। দর্শক হাততালিতে ফেটে পড়লো। মনে আছে প্রায় আড়াই ঘন্টা সে মঞ্চে পিন ড্রপ সাইলেন্স এর মাঝে গাইলাম। নজরুল সঙ্গীত,  লালন গীতি, আধুনিক বাংলা গান,পুরনো দিনের হিন্দি গান, ভজন, গজল ও শেষে ঠুমরী। এতো সুন্দর মঞ্চ আর লাইটিং ব্যাকড্রপ এবং দর্শক আমি হাজার হাজার মঞ্চের মাঝে খুব কমই পেয়েছি। ওই অনুষ্ঠান আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ অন্যতম অনুষ্ঠান হিসেবে স্মৃতির মনিকোঠায় রয়ে গেলো।এবার বাড়ি ফেরার পালা। আপা অনেক কিছু কিনে দিলেন আমাকে। নিজেরাও শপিং করলাম। স্যুটকেস গোছাচ্ছি আর সবার মনে বিষাদের ছায়া ঘনিয়ে আসছে।বিদায়ের আগে আমার সাহেব তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ দুলাভাইকে বললেন দুলাভাই অনেক দুষ্টামি করেছি।বেয়াদবি নেবেন না।

দুলাভাই অট্টহাসি হেসে বললেন ফাইজলামি করো শালা,গান একটা আমি শিখমুই আর তোমার মিয়া কথা রাখতে হইবোই।কথা ইজ কথা, ওয়াদা বলে কথা! সবার মাঝে হাসির ফোয়ারা বয়ে যায় কিন্তু সবার অগোচরে বিষন্নতা আবারও এসে ভর করে। উনি এবার সিরিয়াস হয়ে বলেন কি শালামিয়া,চিন্তায় পড়ছো? চিন্তার কোন কারণ নাই।কনককে আমি খুবই স্নেহ করি।ছোট বোনের মতো। তবে গান আমি আস্ত একটা শিখমুই,কি কও কনক! হাহাহা হাহাহা হাহাহা। এয়ারপোর্টে বিদায় নিয়ে ফ্লাইট এ চড়ে ধাতস্থ হতেই নিজের অলক্ষ্যে চোখ অস্রুতে ভরে যায়।এতো ভালোবাসা! এ সবই আমার প্রাপ্য! অথচ আমার মনে অনুরণিত হচ্ছিলো কেবল “মেঘলা আকাশে উতলা বাতাসে ভেসে বেড়াই কি গান গাবো যে ভেবে না পাই”। ভাবছিলাম এই গান তো আমি কখনই গাইনা তাহলে কেন মনে এলো! পরক্ষনেই মনে পড়লো আমি তো আসলে এখন মেঘের উপর ভেসে আছি! আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box