মেঘলা আকাশে উতলা বাতাসে ভেসে বেড়াই

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

বগুড়াতেই কনফার্ম হলাম যে আমি মা হতে চলেছি।কয়েকদিন পরই ঢাকায় ফিরে এলাম।জীবন কেমন যেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। শরীর ভালো না থাকলে কি আর কিছু ভালো লাগে? অথচ জীবন তো জীবনের মত দাঁড়িয়ে, তাকে ঠেলে গুঁতিয়ে সচল তো আমাকেই করতে হবে। খাগড়াছড়ি পুলিশের একটা অনুষ্ঠান এলো।আমার হ্যাজবেন্ড জিজ্ঞাসা করলেন যেতে পারবো? আমি বললাম অবশ্যই পারবো। যারা চাকরি করে তারা গর্ভাবস্থায় কাজ করেনা? ঠিক করলাম অনুষ্ঠানটি করবো। শিল্পকলা থেকে যাওয়া হচ্ছে।অনেক বড় বড় শিল্পী। সবাই শ্রদ্ধেয় শিল্পী। সৈয়দ আব্দুল হাদী. খন্দকার ফারুক আহমেদ, ফকির আলমগীর, আপেল মাহমুদ, নাদিরা বেগম, মৌসুমী কবির সহ নাচের কয়েকজন শিল্পী। রওনা হলাম।চলছি তো চলছি।বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছালাম। চা পানি খেয়ে মুখ হাত ধুয়ে আবার রওনা…। যাচ্ছি… যাচ্ছি… যাচ্ছি…।বড় বড় সিনিয়র শিল্পীরা অনেক মজার মজার গল্প করছেন। আমি সেসব হাসি তামাশায় যোগ দেইনা কারণ আমি আসলে তাঁদের সন্তানের বয়সী। খাগড়াছড়ি যাচ্ছি, প্রকৃতি দেখে আপ্লুত হওয়ার কথা কিন্তু শরীর ভালো না তাই আপ্লুত হওয়া যাচ্ছিলোনা।পথে আবারও থামা হলো এবং বলা হলো এর পর আর থামার জায়গাও নাই, থামা উচিৎ ও হবেনা।কারণ রাস্তা আসলে নিরাপদ নয়।খাবার জন্যও এটাই শেষ বিরতি। যাইহোক। মেয়েদের রেস্টরুম বা টয়লেটে গেছি।হঠাৎ মৌসুমী কবির আপা বললেন ‘শোন মেয়ে, তোমার কি লজ্জা টজ্জা কিছু নেই! হোক মইনুল একজন মিউজিক ডিরেক্টর আর তুমি শিল্পী, তাই বলে কি সারারাস্তা একদম তার কোলে বসে আসতে হবে? মুরুব্বি টুরুব্বি কিছুই মানোনা?’ আমি উনার কথা শুনে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না।কি উত্তর দেবো ভাবতেই নাদিরা বেগম আপা হাসতে হাসতে বললেন ‘শোন, তুমি যা ভাবছো তা নয়।ওরা প্রেমিক প্রেমিকা না, ওরা স্বামী স্ত্রী।’ মৌসুমী আপা তখন বললেন ‘তাই বলো, আমি কি না কি ভাবছিলাম। কিন্তু এতো অল্প বয়সে বিয়ে করেছো কেন?’ এর তো আর উত্তর নেই।যথাযথ সময়ে বাসে চড়ে আবারও রওনা হলাম। এবার যাচ্ছি পাহাড়ী রাস্তায়।চাঁদের আলোয় বিশ্বচরাচর ভেসে যাচ্ছে।কি আধিভৌতিক পরিবেশ। আমি আবার আমার হ্যাজবেন্ড এর কোলের ভেতর নিজেকে গুঁজে দিলাম।ভুতের ভয়াবহ সব গল্প সত্যিমিথ্যা বানিয়ে চলছে।কেউ হাসে কেউ ভয় পায়।কি অবস্থা।হঠাৎ বাস থেমে গেলো।বাসে ধুমধাম করে সাত আট জন নওজোয়ান মানুষ মুখে কালো কাপড় বেঁধে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে ভেতরে এলেন। ভয়ে সবাই চুপ। আপেল মাহমুদ ভাই আর হাদী ভাই তাদের সঙ্গে কোঅর্ডিনেট করছেন। নাম পরিচয় নিলেন তারা, যাত্রার উদ্দেশ্য শুনলেন। এই অফ টাইমে কেন জেনেশুনে রওনা দিলাম তার জন্য রক্তচক্ষু দেখিয়ে বকাও দিলেন।আমরা শিল্পী, তাই নেহাত মারতে পারছেন না তাও বলে বলে বড়ই বদান্যতা দেখালেন। আর যেন এমন না করি বলে আবারও ধুমধাম নেমে গেলেন। জীবন ধন্য করে তারা চলে গেলেন। তাঁরা যে কারা আমি আজও জানিনা। বাসের সবার মুখ মনে হলো চুনকালি মাখা।হাসি-তামাশা বন্ধ হয়ে গেলো। কোনমতে পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ি। কি দারুণ কি দারুণ! কি দারুণ প্রকৃতি আলহামদুলিল্লাহ। গান গেয়ে পরদিন আবার সে পথেই ফিরলাম।এবার ঘটলো অভূতপূর্ব কাণ্ড।যারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে না মেরে, না গুলি করে দয়া করেছিলেন তারা চা নাস্তা ফলমুল নিয়ে অপেক্ষমান! তারা বললেন আমাদের ধারণা ছিলোনা আপনারা জাতীয় সম্পদ।তাহ‌লে কালকেও এমন আপ্যায়ন করতাম।আমাদের ভুল হয়েছে, ক্ষমা করে দেবেন। অনেক কোলাকুলি হলো, করমর্দন হলো।আবার ফিরে এলাম নিজ ডেরায়। এবং মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিলাম সন্তান প্রসবের আগে আর দূরবর্তী অনুষ্ঠান নয়।কিন্তু সংসার কি করে চলবে? বাচ্চার জন্য বাড়তি কিছু সঞ্চয়? দু’জন দু’জনকে শান্তনা দেই যে ‘আল্লাহ ভরসা’ একভাবে না একভাবে হয়েই যাবে ইনশাআল্লাহ। যাদের কেউ নাই তাঁদের আল্লাহ আছেন। আর আমরা দুজন আছি না? দুজনে দুজনার!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে