মেঘেডোবা শহর

জয়দীপ রায়

(কলকাতা থেকে): অবসর একবার দার্জিলিং গেলো। তার আগে কোনওদিন যায়নি। শুধু পরিমল ভট্টাচার্যের লেখা একটা বই পড়েছিলো। ছোটবেলায় পাড়া থেকে বাসও ছেড়েছিলো। পোস্টার পড়লো তেমাথার লাইটপোস্টে। দার্জিলিং। তৎসহ: মিরিক ও পশুপতি। ৫ রাত ৪ দিন-৫৫০ টাকা। সেই বাসটা অনেক চেষ্টা করেও ধরতে পারে নি অবসর। আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি।
বড় হওয়ার বিভিন্ন স্টেজে কেউ কেউ বলেছে, যাস না। কংক্রিটের জঙ্গল। নোংরা। কেউ কেউ ভয় দেখিয়েছে গোর্খাল্যান্ডের। পাহাড়ী খুকরি নাকি খুব চকচক করে। কেউ বলেছে ওর চেয়ে সিকিম যাও। ছাঙ্গুর বরফ দিয়ে সস্তায় হুইস্কি খাও। একবার তমালিরা ঘুরে এসে বলেছিলো, ধোস্, চারদিন থাকলাম। একদিনও কাঞ্চনজঙ্গা দেখতে পেলাম না। কি বৃষ্টি! রোদই ওঠে না। অ্যাজমা হয়ে যাবে তো ওরকম স্যাঁতসেতে ওয়েদারে থাকলে!
শুধু মা বলেছিলো, দেখিস মনা, জানলা দিয়ে কিরকম মেঘ ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে!
গাড়ি যখন কার্সিয়াং ট্যুরিস্ট লজে পনেরো মিনিটের চা মোমোর ব্রেক দিয়ে হিলকার্ট রোড ধরলো, অবসর ন্যাপস্যাক থেকে পুলওভারটা বের করে হাতে নিলো। গাড়ি বলতে শেয়ার সুমো। এনজেপি স্টেশন থেকে সস্তায় পেয়ে গেছিলো। এবার টয়ট্রেন লাইন ধরে ফেলেছে রাস্তাকে। অথবা রাস্তা টয়ট্রেন লাইনকে। লাইনের সঙ্গে, খাদের সঙ্গে প্যাঁচ খেলতে খেলতে অবসরদের শেয়ার সুমো একসময় কুয়াশার মধ্যে ঢুকে গেলো। ভেজা ঘন আলো না পড়া সবুজ পাহাড়ের মধ্যে ঢুকে গেলো। আবার আলোতেও এসে পড়লো বাঁক পেরিয়ে। এইভাবে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে আলো পেরোতে পেরোতে লাল সুমোটা টুং সোনাদা পেরিয়ে ঘুম ষ্টেশনের সামনে এসে থামলো। অবসর ঘুমিয়ে পড়েছিলো বলে মনে করতে পারলো না, কোথাও যেন অঞ্জন দত্ত বাজছিলো।
মেয়েটা নেমে গেলো ঘুম ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। অবসর জানে না এরকম আর কোনও পাহাড়ী রাস্তা আছে কিনা যেখানে গাড়ি থেকে সোজা ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে নেমে যাওয়া যায়। নেপালী মেয়ে একটা। শিলিগুড়িতে নেওটিয়া হসপিটালের নার্স। বাড়ি ফিরছে, বিজনবাড়ি। অবসর জিপিএসে দেখে নিয়েছে ঘুম ষ্টেশনের নিচে দিয়ে চলে যাওয়া সুখিয়া রোড ধরে খানিকটা গেলেই ডানদিকে বিজনবাড়ির রাস্তা অনেক নীচে নেমে গেলো। বিজনবাড়ি নামটা খুব পছন্দ হলো অবসরের। তখনই গাড়ি ছেড়ে দিলো ড্রাইভার দাজু পরধান্।
গাড়ি যখন লাডেন লা রোড দিয়ে ক্লক টাওয়ারের সামনের জিপস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো অবসর বুঝলো এবার নামতে হবে। ইচ্ছে করছিলো না। শিলিগুড়ি ছেড়ে পাঙ্খাবাড়ি রোড ধরার পর থেকে যে সিনেমা চালু হয়েছিলো, এই এখন থামলো। ভাগ্য করে সামনের সিটটা পেয়েছিলো অবসর। দেড়শো টাকায় শপিং মলে দেখা ফাইভ ডি অ্যানিমেশনের মজা। পাহাড় জঙ্গল মেঘ কুয়াশার থ্রি ডি ভেদ করে বৃষ্টির ছাঁট আর ঠান্ডা হাওয়া আরও দুটো ডাইমেনশান বাড়িয়ে তোলে। অবসর সামনের সিটে বসে বুঁদ হয়ে যায়। কার্সিয়াং ছাড়ার কিছুসময় পর থেকে অবসর সবকিছু মনে করতে পারে না। অথচ পুরোপুরি ঘুমিয়েও পড়েনি। প্রথম দার্জিলিং চড়ার অভিঘাতে অবসর যেন হ্যালুসিনেট করতে করতে ঘুমে এসে হুঁশ পায়। ঘুম ষ্টেশন। যার নিচে দিয়ে বিজনবাড়ির রাস্তা নেমে গেছে।

-কাঁহা ঠ্যাহেরেঙ্গে? ভাড়া নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে ড্রাইভার দাজু।
-ডিসাইড নহী কিয়া। প্যাহলে কুছ খা লেতে হ্যায়। ভুখ লগা হ্যায় জবরদস্ত। অবসর লোনলি প্ল্যানেটের বইটা ড্যাশবোর্ডের নীচের ড্রয়ার থেকে বের করে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। বাকিরা আগেই নেমে গেছে সব। ট্যুরিস্ট ছিলো বেশিরভাগ। দার্জিলিং ষ্টেশনের আশপাশে নেমে গেছে।
-ইয়ে কার্ড রাখ্খিয়ে। মেরা আংকল কা হোম স্টে। আকেলে আদমি কো হর জাগা পে ঠ্যাহরনে নহী দেতা। ইঁহা ফোরেনার লোগ আতে হ্যায় জ্যাদা। জলপাহাড় রোড মে হ্যায়। উপ্পর সে দার্জিলিং দিখতা ভি হ্যায় অচ্ছা।
-ঠিক হ্যায় দাজু। আপকা মোবাইল নাম্বার দিজিয়ে। অবসর গাড়ির পিছন থেকে ব্যাকপ্যাকটা বের করতে করতে বলে।
-নাস্তা কেভেন্টার্স মে কর লিজিয়ে। নিজের কার রেন্টের একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দেয় আগন্তুককে ড্রাইভার দাজু।

কেভেন্টার্স পর্ক চিকেনের সালামি আর সসেজ নিয়ে খোলা ছাদে টেবিল সাজিয়েছে। চাররাস্তার মোড়ে। মুখোমুখি রাস্তাটা হল লাডেন লা রোড। সামনেই ক্লক টাওয়ার। ওর উপরে উঠেই রণবীর কাপুর ঘড়ির কাঁটা ধরে ঝুলছিলো। কোন সিনেমায় যেন। খানিক ডানদিকে ঘুরেই কেঁপে উঠলো অবসর। শহরের মাথাজুড়ে ঝকঝক করছে সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাহাড়ে এত বেলায় ওয়েদার ক্লিয়ার থাকেনা। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে বলে সব অস্বচ্ছতা ধুয়ে গেছে। উল্টোদিকে চড়াইয়ের মাথায় একটা পুরনো গথিক বিল্ডিং। প্ল্যান্টার্স ক্লাব। খাবারের অর্ডার দিয়ে লোনলি প্ল্যানেটটা খুলে বসলো অবসর। প্ল্যান্টার্স ক্লাব হল পুরনো দিনের চা বাগানের ম্যানেজারদের ক্লাব। থাকার জায়গাও আছে। ওরা একটা হসপিটালও চালায় ওই বিল্ডিংয়েই। বই ছেড়ে অবসব প্ল্যান্টার্স ক্লাবের দিকে ভাল করে দেখলো। বাঁদিকের বিল্ডিংটাই তো হসপিটাল মনে হচ্ছে। দোতলায় বড় ঘর। দুটো বড় বড় জানালা। পেশেন্টদের বেডও দেখা যাচ্ছে।

অবসর একবার কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে দেখে। একবার হসপিটালের জানালার দিকে। হসপিটালটা আরও উপরে। ওখান থেকে শহরটা আরও ভাল দেখা যাবে নিশ্চয়। একপ্লেট সালামি আর একপ্লেট সসেজ টেবিলে চলে আসে। অবসর বুভুক্ষুর মত খেতে থাকে। এরমধ্যে আবার মেঘ আসে। স্প্রে করা জলের মত বৃষ্টি নামে। অবসর ভিজতে থাকে। খেতে থাকে। মাঝেমাঝে শুধু মেঘে ঢেকে যাওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে আর উঁচুতে ঝাপসা হয়ে আসা হসপিটাল বেড দেখে। এবং ভেজে। স্প্রে থেকে ড্রিজলিং হয়। অবসর একটা আইসক্রিমের কথা বলে ওয়েটারকে। আরও জোর বৃষ্টি নামে। অবসর একা একা কেভেন্টার্সের ছাদে বসে ভিজতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার ধুম জ্বর আসে। আইসক্রিমও এসে যায় একসময়। অবসর জ্বরে পুড়তে পুড়তে আইসক্রিম খেতে খেতে চারিদিক ঝাপসা হয়ে গেলেও কেভেন্টার্সের ওপেন টেরাসে বসে থাকে। ওই হসপিটালে তাকে ভর্তি হতে হবেই। ওই জানালার ধারের বেড। তিনচারদিন নিখরচায় কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশে শুয়ে থাকার সুযোগ সে হাতছাড়া করবেনা কোনওমতেই।
মেঘেডোবা শহরে একসময় জ্বরে ডুবে যায় প্রথম দার্জিলিং আসা যুবক।

ছবি: গুগল