মেঘ বলেছে যাবো যাবো!

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

যেদিন ভাবি তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরবো। সেদিনই কেন জানি প্যাচটা লাগে। রাজ্যের কাজ আর ঝামেলা এসে যোগ হয় সময়ের সঙ্গে। তখন কিসের আর তাড়াতাড়ি ফেরা, সবচে বেশী দেরী হয় সেদিনই। ৩রা জুনও তাই হলো। তাড়াতাড়ি ফেরা হলো না। বাসায় যখন আসলাম তখন বাজে ৩টা ৫। আমাদের গাড়ি ছেড়ে যাবে ৩টায়। যত দ্রুত সম্ভব দরজা জানালা লাগিয়ে রেডি হচ্ছি। এমন সময় দিনাজপুর থেকে এলো লিচু। আমরা থাকবনা ৫দিন। বসে গেলাম লিচু বের করে ফ্রিজে রাখতে। আমাদের দেরী দেখে মুখ গম্ভীর করে বাসায় এলো মেজ বোন। ওরা সব রেডি। আমরা তখনও রেডি হতে পারিনি। দেরী দেখে ও কিছুটা বিরক্ত হয়ে চলে গেলো। দুর্গার মতো দশ হাতে দ্রুত কাজ করতে লাগলাম। একদিকে মুখ চলছে। অন্যদিকে যেন দশ হাত। গিজার অন করলাম এক বাথরুমে। টেনশনে শাওয়ার নিলাম আরেক বাথরুমে। তারপর, রুপি, সানগ্লাস, স্যান্ডেল বাসায় ভুলে রেখে ৩.৪০ মিনিটে ৭জনের দলটা ঢাকা ছাড়লাম। গন্তব্য মেঘের দেশ শিলং।

আহা মেঘ! চলিষ্ণু মেঘ!

শিলং এর আকাশে মেঘ, রাস্তায় মেঘ। পাশে মেঘ, সামনে মেঘ। নরম মেঘ। ঘন মেঘ। সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। কাঁচের মতো মেঘ। কত যে মেঘের রুপ! আর কি তাদের দাপট। এই দেখা দেয়, এই মিলিয়ে যায়। এই ছুঁয়ে যায়। ওই আকাশে চলে যায়। মনে হলো আমি যেন মেঘ রাজ্যের এক প্রজা। মেঘের মর্জিমতো চলতে হবে আমাকে। তাই সই! মেঘ রাজা বলে কথা। এর মাঝে শুরু হলো টিপটিপ বৃষ্টি। ডাউকি বর্ডারে উমগট নদীর স্বচ্ছতা নিয়ে গল্প শুনেছিলাম। ছবিও দেখেছি। তবে আমরা দেখলাম ঘোলা পানি। বৃষ্টির কারনে নদীর পানি লালচে হয়ে গেছে। ঘাড় উচিয়ে দেখলাম ওপাশে সিলেটের জাফলং। নদী প্রায় ভরাট। বালি আর মানুষে ভরা আমার দেশ। মন বিষন্ন হয়ে গেল। ইস! ইস! শব্দে পাইন, ওক আর চিকন বাঁশের ঝাঁড় পেরিয়ে আমরা ছুটে চলি। যাই মাওলিন গ্রামে। মেঘ ছুঁয়ে যায় আমাদের। লিভিং রুট ব্রিজ বা শিকরের ব্রীজ দেখে মুগ্ধতা বাড়ে। পাথুরে রাস্তায় শোনা কথা ১৯৪১ সালে বৃটিশরা করে যায় এ ব্রীজ। একটা ছোট্ট শিকর আর পাহাড়ী ঝরনাকে কেন্দ্র করে এত সুন্দর পর্যটন স্পট করা যায়। ভাবা যায়না। আসলে ওরা ভাবতে পারে। আমরা পারিনা। আমরা বন খাই, নদী খাই, গাছ খাই, সমুদ্র খাই, পাথর খাই, পাহাড় খাই। আমরা হাঁউ মাঁউ করে সব খাই। খেয়ে খেয়ে আমাদের আঁশ মেটেনা। ক’দিন পর মেঘ খাবো কি ?
যত পথে যাই তত মুগ্ধতা বাড়তে থাকে। ছোট ছোট ঘাসও এখানে যেন নিরাপদ। কেউ ওকে মাড়িয়ে যায় না। ওর স সৌন্দর্য নিয়ে ও ফুটতে থাকে। লাল, হলুদ, বেগুনী, সাদা তারার মতো সব ফুল। কাকে ছেড়ে কাকে দেখি। পথে পথে বিছানো সব বেগুনী রঙের ফুল। পাথরের গায়ে গায়ে ফুটে আছে তারা। এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ী পথ। অমিত লাবণ্যের দেখা হয়েছিলো বুঝি এখানেই। সেই অমিত! অসম্ভব রোমান্টিক এক স্বপ্ন তরুন। যার জন্য হাজার বছর বুঝি অপেক্ষা করা যায়। পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী। তবে লাবন্যকে খুঁজিনা। সে তো আছে মনে মনে। হাওয়ায় হাওয়ায় শেষের কবিতার লাইন আওড়াই
রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য;
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত।

শিলং ফুল আর ৩টে চড়ুই!!

গেলাম Mawphlang Sacred ফরেস্ট দেখতে। খাসিয়া গাইড খুব গম্ভীর মুখে আমাদের বনের সামনে দাঁড় করালো। তারপর বললো, তোমরা বনে কেউ থুথু ফেলবে না, গাছের পাতা ছিঁড়বে না, শব্দ করবে না। যদি ভুল করে কেউ পাতা ছিঁড়ে ফেলো, দেখবে কিছু একটা বিপদ হবে। সাবধান। ওর কথায় আমরা খুব সাবধান হয়ে গেলাম। বনে ঢুকবো, এমন সময় ৭ জনের দলের এক সদস্য হঠাৎ বলে ওঠলো, তার থুথু চলে আসছে। কি করবে? ফেলতেই হবে, এক্ষুনি। বলে কি! আমরা বিস্মিত হওয়ার আগেই টেনশনে কাজটি করে ফেললেন তিনি।
আমরা বনে ঢুকে গেলাম। গাইড নিয়ে গেলো একটা রুদ্রাক্ষের গাছের কাছে। চোখের সামনে ভেসে ওঠলো জটাধারী এক মানুষ। যার গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। চোখ দুটো লাল। ভয়ে হাত পেছনে রাখলাম যদি পাতা ছিড়ে ফেলি। তাহলে কি যে বিপদ হয়। তাড়াতাড়ি সরলাম সেখান থেকে। এরপর আপু দাঁড়ালো এক কিডনী গাছের কাছে।আমি ছবি তুললো হার্টের রোগ ভালো হয় এমন এক গাছের কাছে। বললো, মনে থাকবে কে কোন গাছ? ও কিডনী গাছ। আমি নাকি হার্ট গাছ। এরপর ছবি তুললাম লিলি কোবরার সঙ্গে।
এবার গাইড একটা গাছের পাতা ছিঁড়লো। এ পাতা খেলে যকৃতের অসুখ ভালো হয়। শুনেই অপি আর জুয়েল ভাই পাতা চিবুতে লাগলো। দু’জনের চেহারা দেখে মনে হলো এখনই ওদের যকৃত চকচকে হয়ে গেছে।
এলো বৃষ্টি। মুগ্ধতা নিয়ে ঝরাপাতা মাড়িয়ে আমরা হেঁটে চলছি বনের পথে পথে। মনে মনে ভাবছি আমাদের সুন্দরবন, মধুপুরের গড়ের কথা। কত কি করতে পারি এসব বন নিয়ে। কিন্তু কিছুই করা হয়না। সব ধ্বসে যায়। হঠাৎ খেয়াল করলাম বনে কোনো পাখির আওয়াজ নেই। অদ্ভুত লাগলো। পাখি কই ? শিলং এ একদিন দুটো কাকের আওয়াজ আর ৩ টে চড়–ই পাখি ছাড়া তো কোনো পাখি দেখিনি। কেন ? ড্রাইভার জানালো, শিলং এ পাখিরা থাকেনা। খাসিয়ারা পাখি খেয়ে ফেলে বলে পাখিরা নিরাপদ মনে করেনা এ শহর। ভীষণ কষ্ট হলো। এত গাছ এত সবুজ! অথচ পাখি নেই? দম বন্ধ হয়ে আসলো আমার। ফুলের কাছে গেলাম। কোনো গন্ধ নেই। পল নামের একজন জানালেন, প্রবাদ আছে, শিলং ফুলে গন্ধ নেই। আমার কান্না পেলো। এত ফুল! থোকা থোকা সব গোলাপ, লিলি। কারও কোনো মিষ্টি গন্ধ নেই! পাখি নেই বলে কি ফুলে গন্ধ থাকেনা ? আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর কেউ দিতে পারলনা।
ছোটবেলায় এক গল্প পড়েছিলাম। এক দৈত্যের বাগান ভরা ছিলো রঙবেরঙের ফুল। তাতে পাখিরা নাচতো। তবে কাউকে ফুল ছিঁড়তে দিতো না সে। ছোট ছোট শিশুরা দৈত্যকে লুকিয়ে বড় প্রাচীর ডিঙিয়ে সেই ফুল ছিড়ে খেলতো। একদিন দৈত্য ধরে ফেলে তাদের। ফুল ছেঁড়ার অপরাধে তাদের বন্দী করে। পরদিন দৈত্য দেখে তার বাগানের ফুলগুলো সব শুকিয়ে গেছে। পাতারা হয়ে গেছে হলুদ বিবর্ণ। একটাও পাখি নেই। দৈত্য অনেক চেষ্টা করেও বাগানে আর ফুল ফোটাতে পারেনা। একদিন এক শিশু মলিন মুখে বাগানের প্রাচীরের কাছে আসে। দৈত্য ধরে ফেলে তাকে। বলে কেন এসেছো ? শিশুটি বলে আমার ভাই বোনদের খুঁজছি। ওদের না পেয়ে আমার বাবা মার চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। তুমি কি দেখেছো ? কথা শুনে দৈত্যর খুব মায়া হয়। ঘরে যেয়ে সবাইকে মুক্ত করে দেয়। পরদিন সকালে পাখির ডাকে দৈত্যর ঘুম ভাঙে। বাইরে যেয়ে অবাক হয়ে দেখে বাগান ভর্তি রঙ বেরঙের সব ফুল ফুটে আছে। দৈত্যর অনুতাপ হয়। ভেঙে ফেলে বাগানের প্রাচীর। সব ফুল দিয়ে দেয় শিশুদের। সেই তখন সবুজ বনে দাঁড়িয়ে আমার মন ছুটে যায় দেশের দোয়েল টিয়ে আর চড়ুইয়ের কাছে। গন্ধ যেন পাই বেলি, গন্ধরাজ আর হাস্নাহেনার।

ছবি: লেখক