মেঘ মল্লারে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৌসুমী দাশগুপ্তা

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সুইং ডোর ঠেলে অফিস করিডোরে পা রাখা মাত্রই কার্ল তাকে এক ঝটকায় মাটি থেকে প্রায় ছাদের কাছাকাছি তুলে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘এতদিন কোথায় ছিলে ফ্রিডা? আসনি কেন?’ প্রায় সাত ফুট লম্বা সোনালি চুলের হাসিখুশি কার্লের ছেলেমানুষিতে হেসে ফেলে ফ্রিডা অথবা ফরিদা। এক রাশ কালো চুলের ফাঁকে ঝমঝমে সে হাসি অফিসের ইথারে ছড়িয়ে পরলে সবাই ছুটে আসে ফ্রিডাকে দেখতে। ভাললাগায় ভরে ওঠে তার মনটা, মনে মনে বলে ‘এই তো আমার আসল জায়গা’। কার্লের আলিঙ্গন শিহরণ জাগায় ক্লান্ত শরীর মনে, গত ক’দিনের ধকল ঝেড়ে ফেলে চনমনে হয়ে ওঠে সে।

ফরিদা নামটা তার কোন কালেই পছন্দের ছিলো না। তার মনে হত মা যদি ফরিদাকে জন্ম দিতে গিয়ে টুপ করে মরে না যেত, তাহলে নিশ্চয়ই তার জন্যে সুন্দর একটা নাম খুঁজে খুঁজে রাখা হতো। কিন্তু মা অমন হুট করে চলে গেল! বাবা অত ছোট্ট একটা বাচ্চাকে নিয়ে কী করবে ভেবে না পেয়ে নিজের বিধবা বোনকে ডেকে আনে ঘরকন্না সামলাতে।  এই বড় ফুপুই তার নাম রেখেছিলেন ফরিদা। ফুপুর দুই ছেলে ফয়সাল আর ফরহাদ এর সঙ্গে নাম মেলাতেই হয়তো।

ফয়সালকে ফরিদা দেখেনি কখনও, বার তের বছর বয়সে সে সার্কাস পার্টির সঙ্গে পালিয়ে যায় বাড়ি ছেড়ে, আর কখনও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফরহাদ যখন তার মা শাহানারা বেগমের সঙ্গে নানা বাড়িতে এসে উঠলো তখন তার বছর ছয়েক বয়স। ফরিদাকে সে ছোট বোনের মতোই কোলে পিঠে বড় করেছে। বরাবরই শান্ত শিষ্ট এ ছেলেটির সঙ্গে বেড়ে ওঠার পরও ফরিদা কেমন করে অত দুরন্ত হয়ে উঠলো তা বলা মুশকিল। মাঝে মাঝে একদম সামলাতে না পারলে শাহানারা বেগমকে বিড়বিড় করে বলতে শোনা যেতো, ‘মা গুণে বিটি! মা টি কী ছিলেন দেখতি হবি না নি!’ ফরিদার মাও এক দুরন্ত কিশোরীই ছিলো, ফুটবল মাঠে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলার সময় নব্য চিকিৎসক সোলায়মান শেখ তাকে এক নজর দেখেই দেওয়ানা হয়ে গিয়েছিলেন। দস্যি মেয়েটিকে পুত্রবধূ করে আনার ব্যপারে শেখগিন্নীর আপত্তি ছিলো, কিন্তু বংশের প্রথম সন্তান যে কিনা শহরে গিয়ে ডাক্তারি পাশ দিয়ে এসেছে তার জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত তিনি হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বিয়ের পর দশগাঁয়ে একমাত্র এমবিবিএস পাশ সোলায়মান ডাক্তার আনন্দের সঙ্গেই নিজ গ্রামে ডাক্তারি শুরু করেন। তাঁর কিশোরী বধূটি অনেকটা তাঁর শখের খেলনার মতোই ছিলো। অল্প বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মেয়েটি মারা গেলে তিনি নিজেকেই মনে মনে দোষী সাব্যস্ত করেন। পরবর্তী জীবনে সবার অনুরোধ উপরোধেও তিনি আর বিয়ে করতে রাজি হননি। বোনের হাতে ঘরকন্নার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের পেশাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফরিদার মাঝে তার মায়ের ছায়া দেখতে পেতেন বলেই হোক, অথবা মা মরা একমাত্র মেয়ে বলেই হোক, ফরিদাকে তিনি বেশি একটা শাসন করে উঠতে পারতেন না। শাহানারা বেগমই ভাই এর মেয়েটিকে ভব্যতা শেখানোর চেষ্টা করতেন যথাসাধ্য।

ফরিদা মেধাবী ছিলো, বড় হতে হতে তার পড়ালেখায় আগ্রহ বাড়তে থাকে। সোলায়মান শেখ তাতে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। বোনের আপত্তি ঠেলে তিনি ফরিদাকে শহরে পড়তে পাঠান। ফরহাদকেও তিনি নিজের খরচে পড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পড়ালেখায় তার উৎসাহ তেমন ছিলো না। সে গ্রামেই জমি জিরাত নিয়ে স্থিতু হয়ে বসে গেলো। শাহানারা বেগম আর সোলায়মান শেখের শেষ দিনগুলোতে ফরহাদই তাঁদের দেখাশোনা করেছে। ফরিদার তখন অনেক দূরে।

শহরে পড়তে এসে সে প্রথম যে ছেলেটির প্রেমে পড়ে সে যে ভালবাসার উপযুক্ত নয় সেটা বুঝতে ফরিদার বেশি সময় লাগেনি। সম্পর্ক বেশি দূর গড়ানোর আগেই সে আবার গা ঝাড়া দিয়ে পড়তে বসে গেলো। ছেলেটিও ক’দিন হুমকিধামকি দিয়ে তেমন সুবিধা হবে না বুঝতে পেরে অন্য মুখের সন্ধানে চলে গেলো। ছিপ ফেলতে জানলে পুকুরে মাছের অভাব কী! সবাই তো আর ফরিদা নয়।

ছাত্র জীবনের শেষের দিকে তার ঘোরতর প্রেম হয়ে গেলো এক টগবগে তরুণ ছাত্রনেতার সঙ্গে। তার একমাথা কোঁকড়ানো চুল, ভরাট গলা আর আদর্শের বুলিতে ফরিদা সত্যিই জ্ঞান হারালো। তার নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হলো, নিজের ছেলেমানুষি স্বভাবের জন্যে মনে মনে নিজেকে খুব ধমকালো সে। উচ্ছল মেয়েটি রাতারাতি কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো। ছেলেটির নাম রাব্বি, সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তান, কিন্তু সমাজ আর রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের আগ্রহে সে পরিবার, পড়াশোনা সবই ছেড়েছে। তাকে দেখা যায় ময়দানে আর বস্তিতে, তার সঙ্গে সবসময় একদল সাঙ্গোপাঙ্গ থাকে, বক্তৃতা মঞ্চে তার কন্ঠ শুনে ফরিদার প্রতিটি লোমকূপ শিহরিত হয়। তার ব্যাকুলতা রাব্বির অজানা থাকে না, একসময় সমাজের সঙ্গে সঙ্গে ফরিদাকে সংস্কারের দায়িত্বও সে নিজের কাঁধে তুলে নেয়। পড়ালেখা শিকেয় তুলে ফরিদাও রাব্বির সঙ্গে মাঠে নামে, মিছিলে শ্লোগান দেয়।

সোলায়মান শেখ খবর পেয়ে মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছিলেন, কিন্তু ফরিদার গ্রামে ফিরে যাবার কোন ইচ্ছেই ছিলো না আর। সে তার বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করে খুব, কিন্তু ততদিনে তাদের দু’জনের ভাষা আলাদা হয়ে গেছে, তারা কেউই আর কাউকে বুঝতে বা বোঝাতে পারলো না। সোলায়মান সাহেব দেশে গিয়ে আবার নিজের মনে ডাক্তারি শুরু করলেন, ফরিদা দু’দিনের মাথায় কোর্টে গিয়ে রাব্বিকে বিয়ে করে ফেললো।

বিয়ের কয়েক মাসের মাথায় পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাব্বি জার্মানি পালাতে বাধ্য হয়। তার বন্ধুরা কেউ মারা পড়ে, কেউ জেলে যায়, কেউ কেউ রাব্বির মতই বিদেশে পাড়ি জমায়। পারিবারিক সমৃদ্ধি আর প্রতিপত্তি সেই বিপদের দিনে রাব্বির খুব কাজে লেগেছিলো। ফরিদাকে রাব্বির বাবা মা বেশি একটা পছন্দ না করলেও ছেলের একাকীত্বের কথা ভেবে একসময় তার যাবার ব্যবস্থাও তাঁরা করে দিলেন। যাবার আগে ফরিদা একবার দেশে যেতে চেয়েছিলো, কিন্তু ফরহাদ তাকে কঠিন ভাষায় নিষেধ করে দেয়। শেখ পরিবার গ্রামের মানী পরিবার, ফরিদা তাদের মাথা হেঁট করে দেবে এটা হতে পারে না।

প্লেনে পুরো পথটা ফরিদা কাঁদতে কাঁদতে গেলো, বাবার কথা, ফুপুর কথা, তাদের বাড়িটার কথা ভেবে বারবার হাপুস চোখে কাঁদলো সে। কিন্তু এয়ারপোর্টে নামার পর  ফুলের তোড়া হাতে গম্ভীর মুখের রাব্বিকে দেখে এক পলকে সব কষ্ট ভুলে গেলো। সেই সন্ধ্যায় এক রুমের একটা ঘরে শুরু হলো তাদের ছোট্ট সংসার। ফরিদার এমন হাসি পাচ্ছিলো! মনে হচ্ছিলো ফরহাদ ভাই এর সঙ্গে পুতুল খেলতে বসেছে, এই বুঝি ফুপু এসে তুলে দেবে। একদিন দু’দিন করে সময় যেতে থাকে, রাব্বির মুখের মেঘও ঘন হতে থাকে। জার্মানিতে তার দল নেই, বন্ধুরা, ভক্তরা, কেউই নেই, এখানে রাব্বিকে কেউ চেনে না। তার উপর রাতদিন কাজ করতে হয়। পড়ালেখা শেষ করেনি বলে ভাল কাজ পাবার কোন সুযোগ নেই, স্বল্প মজুরিতে ফাস্ট ফুডের দোকানে চাকরি। যে রাব্বি গোটা দশেক বন্ধু নিয়ে ফাস্ট ফুডের দোকানে গিয়ে হাঁকডাক দিয়ে অর্ডার দিতো, তাকে আজ অন্যের অর্ডার নিতে হয়। দিনরাত্রির তিক্ততাটুকু ঝাড়ার জন্যে ফরিদা ছাড়া আর কেইবা আছে! ফরিদার মনটা খুব ছোট হয়ে যায়, সে বুঝে উঠতেই পারে না তার দোষটা কোথায়।

সংসারের আয় বাড়াতে সে কাজ খুঁজতে শুরু করে, জার্মান ভাষাটি আয়ত্ত্ব করতেও তার খুব বেশি সময় লাগেনি। যে পড়ালেখা একসময় অবহেলায় শেষ করেছিলো ফরিদা, এখন সেটাই তার খুব কাজে লেগে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটটির জোরে ছোট্ট একটা জার্মান কোম্পানিতে কাজ পেয়ে গেওেলা সে। ডজন দুয়েক লোক নিয়ে ছোট সংস্থা, তাই পরিবেশটি বেশ ঘরোয়া। শুরুতে কিছুটা জড়তা থাকলেও ধীরে ধীরে ফরিদা আবার নিজেকে ফিরে পেতে শুরু করে। আবার তার উচ্ছ্বল হাসি শোনা যায়, ডাগর চোখজোড়ায় আবার শখ করে কাজল পরে। ম্যাক্স ফ্যাক্টর এর kohl pencil দিয়ে ঠিক দেশের কাজলের মতই ঘন কালো রঙ হয়। ফরিদা আশা করে এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। রাব্বিকে জোড়াজুড়ি করে কাজ কমানোর জন্যে। তার খুব ইচ্ছে করে দু’জন মিলে সেজেগুজে ঘুরে বেড়াতে, ঠিক যেমন দেশে থাকতে রিকশায় ঘুরতো দু’জনে। কিন্তু পুরোনো রাব্বিকে আর কিছুতেই খুঁজে পায় না ফরিদা, তার হাসিতে না, কন্ঠে না, এমনকি চুমুতেও না। রাব্বি বলে দোষটা ফরিদারই, চাকরি পাবার পর থেকে সেই বদলে যাচ্ছে। সামান্য দামি কিছু কিনতে গেলেই রাব্বি সেটা নিয়ে তুলকালাম শুরু করে দেয়। ছুটির দিনে ফরিদা চায় শহর ছেড়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে, কিন্তু রাব্বি চায় কোন এক বাঙালি বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দিতে। বাঙালি আড্ডায় ফরিদা স্বচ্ছন্দ হতে পারে না, ‘ভাবি’ দের অকারণ কৌতুহল আর একনাগাড়ে ঘরকন্নার কথা কাঁহাতক আর সহ্য হয়!

একসময় তিক্ততা চরমে উঠলে ফরিদা আর রাব্বির সংসারটি ভেঙ্গে যায়, ফরিদা কেন যেন তাতে খুব একটা অবাক হয়নি। শুরু থেকেই তার মনে হচ্ছিলো সে যেন বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যমঞ্চে কোন এক নারী চরিত্রে অভিনয় করছে, এটা তার সত্যিকারের জীবন নয়।

ডিভোর্সের কাগজপত্র গুছাতে, নতুন আস্তানা যোগাড় করতে সপ্তাহ তিনেক ছুটি নিতে হলো অফিস থেকে। আজই প্রথম অফিসে ফিরলো আর ফিরেই কার্লের আলিঙ্গনে। কতদিন তাকে ওরকম স্বতস্ফূর্ত আলিঙ্গনে বাঁধেনি কেউ! বিয়ের পর রাব্বির আলিঙ্গন ছিলো শুধুই শরীরের প্রয়োজনে, বাঁধ ভাঙ্গা আবেগের কোন স্থান ছিলো না সেখানে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার তার শরীরে শিহরণ জাগে, সকালের সেই ক্ষণিকটুকু ফিরে পেতে ইচ্ছে করে খুব।

ফরিদার ডিভোর্সের কথাটি এক সময় অফিসে সবাই জেনে যায়, ফরিদাই বলেছে, গোপন রেখে লাভই বা কী! প্রাচ্যদেশীয় অকারণ কৌতুহল এদের নেই, ডিভোর্স ওদের কাছে বিশাল কোন ব্যাপারও নয়। একদু’কথায় সমবেদনা জানিয়ে তারা অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। শুধু কার্লের মনোযোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ফরিদার অফিস বান্ধবী জোয়ানা কার্লকে ফরিদার আশেপাশে দেখলেই মুচকি হাসে, কখনও ফরিদার দিকে তাকিয়ে আলতো চোখ টিপে দেয়। ফরিদারও মন আস্তে আস্তে গলতে থাকে লম্বা, সোজা, সোনালি চুল আর নীল চোখের জন্যে। কোঁকড়ানো কালো চুল আর বাদামি-কালো চোখজোড়া সে ভুলতে পেরেছে।

কার্লের সঙ্গে প্রথম ডেটের অপরাধবোধ পরের ডেটগুলোতে আর কাজ করে না। পাবে বসে ঠান্ডা বিয়ারে চুমুক দেওয়া অভ্যাস হয়ে যায়, অভ্যাস হয় নাইটক্লাবের নাচগানও। টপস, স্কার্ট আর কাঁধছোঁয়া চুলের ‘ফ্রিডা’ কে অনেকেই স্প্যানিশ বা পর্তুগিজ বলে ধরে নেয়। একদিন কার্ল তাকে পাকাপাকিভাবে কার্লের সঙ্গে থাকতে বললে ফরিদা বা ফ্রিডা সহজেই রাজি হয়ে যায়।

কার্লের ফ্ল্যাট রাব্বির এক চিলতে ফ্ল্যাটের তুলনায় অনেক বড় আর খোলামেলা। অসংখ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ভরা এই ফ্ল্যাটে কোনটা কী কাজে আসে সেটা বুঝতেই ফরিদার কয়েকমাস লেগে যায়। সময়টা তার দারুণ কাটছে। রোজ সকালে তারা একসঙ্গে কাজে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আবার তৈরি হয়ে বের হয় বেড়াতে আর খেতে। রান্না বান্নার হাঙ্গামা নেই, যে যার কাপড় নিজের মত করে ধুয়ে, ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখে, দু’জন মিলেই ঘর বাড়ি পরিস্কার করে। ফরিদা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে, আমাদের দেশের পুরুষ মানুষ গুলো এমন হয় না কেন! কেন বয়স বাড়ার পরেও তারা বড়সড় একটি শিশুই রয়ে যায়! সঙ্গিনীর চেয়ে আজীবন তাদের একটা মায়েরই যেন প্রয়োজন হয়। রাব্বি যেমন ফরিদা তার মায়ের মত পোলাও রাঁধতে পারে না বা কমলা বুয়ার মত কাপড় ইস্ত্রি করতে পারে না বলে রাগারাগি করতো।

জার্মানিতে ঘন বরফ যদিও বা পড়ে, কিন্তু ঘন বৃষ্টি সচরাচর পড়ে না। এক রবির দুপুরে হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। কার্ল তখনও আগের রাতের বিয়ারের খোয়াবে অচেতন। ফরিদা কী ভেবে যেন তার পুরোনো স্যুটকেস খুলে সুবীর নন্দীর একটি রেকর্ড বের করে কার্লের সাউন্ড প্লেয়ারে চালিয়ে দেয় – ‘কত বরষায় আমার হৃদয় শুধু মেঘ হয়ে যায় …’ ঝমঝমে বৃষ্টির সাথে ভরাট কন্ঠটি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে উঠে এসে একরাশ বিরক্তি নিয়ে কার্ল বললো, ‘কী শুরু করলে ফ্রিডা! এটা কী কোন মিউজিক হল? বন্ধ করো এক্ষুনি! এক্ষুনি বন্ধ করো বলছি!’ ঘন বরষার মেঘগুলো আকাশ ছেড়ে ফরিদার মনের কোণে জমা হয়। কার্ল সে মেঘ সরানোর কোন চেষ্টাই করে না। সারাদিন গুম হয়ে থাকার পর সন্ধ্যাবেলা ফরিদাকে জানিয়ে দেয় তার আর ফ্রিডার সঙ্গে থাকতে ভাল লাগছে না, ফ্রিডার সঙ্গে তার কিছুই মেলে না, সে যেন তার বাসা ছেড়ে দেয়। বলে প্রথম বারের মতো ফরিদাকে একা রেখে সে সান্ধ্য পোশাকে রোজকার মতোই বেরিয়ে যায়। আলো ঝকমকে শহরের মাঝে এক অন্ধকার ব্যালকনিতে ফ্রিডা অথবা ফরিদা স্থবির হয়ে বসে থাকে।

ইদানিং ফরিদা জোয়ানার সঙ্গে থাকছে। কার্ল তিনদিনের মাথায় নতুন বান্ধবী অলিভিয়াকে এনে তুললে ফরিদা অত দ্রুত কোথাও যাওয়ার যায়গা না পেয়ে শেষে জোয়ানার শরণাপন্ন হলো। জোয়ানা তাকে নিজের বাসায় এনে তুলেছে। জোয়ানা থাকে ওর পার্টনার জেনি আর তাদের ছেলে জ্যাসনকে নিয়ে। জ্যাসন জানে জেনি তার বাবা আর জোয়ানা তার মা। আন্টি ফ্রিডাকে তার খুব পছন্দ। ফরিদারও এখানে ভালই লাগছিলো, কিন্তু গত ক’দিন ধরে জেনির চোখজোড়া সে নিজের উপর টের পাচ্ছে। জোয়ানা ওর খুব ভাল বন্ধু, বলতে গেলে একমাত্র খাঁটি বন্ধু। জোয়ানার ঘর ভাঙ্গা ঠিক হবে না। নিজের একটা বাড়ি খুবই দরকার।

মুশকিল হল নিজের বাড়ি বললেই মনে পড়ে একটা ঘোলা জলের নদী, টিনের দোচালা ঘর, দেওয়ালে হেলানো একটা কালো সাইকেল আর ফর্সা মুখে কালো গোঁফ বসানো একটা মুখ। মনে হয় কী হতো সেদিন বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে গেলে! হয়তো ফরহাদ ভাই এর সঙ্গেই তার বিয়ে হতো, অথবা পাশের গ্রামের চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলে সাগরের সঙ্গে। ছোটবেলায় সাগরের সঙ্গে কতবার ফুটবল খেলেছে সে! এতদিনে তার দুটো তিনটে বাচ্চা থাকতো, বাড়ির পাশের শান্ত নদীটির মতোই শান্ত, নিস্তরঙ্গ জীবন হতো হয়তো। কিন্তু সেও কী তার ভাল লাগতো!

হঠাৎ করেই ফ্রিডার খুব ফরিদা হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে। বড় পাড়ের টকটকে শাড়ি আর অনেকগুলো গয়না পরতে ইচ্ছে করে, কাজল আর টিপে সাজতে ইচ্ছে করে, আর ইচ্ছে করে উষ্ণমন্ডলীয় ঝমঝমে বৃষ্টিতে খুব করে ভিজতে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]