মোহান্ধ জীবন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফারহানা নীলা

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

গাবতলী বাস স্ট্যান্ডে খুপরি চায়ের দোকানে বসে ঝিমোচ্ছে সগীর। গত তিনদিন টানা বৃষ্টি। নাইট কোচের জন্য আগেভাগেই চলে এসেছে সগীর।হুট করেই চাকরীটা ছেড়ে দিল। সিগারেটটা ধরিয়ে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা শুরু। বাস আসতে দেরী হবে। প্যাঁক কাঁদায় এলাকা বিচ্ছিরি হয়ে আছে। কত রকমের মানুষ…  মানুষ দেখতে ভালই লাগে সগীরের। মানুষগুলো একেকজন একেক রকম। কত জায়গায় এদের যাত্রা! কত রকমের জীবনধারণ! বিচিত্রতা নিয়ে বোধ করি মানুষই জীবনযাপন করে…. অন্য কোনো প্রাণীর জীবন এত বৈচিত্রময় নয়!

গত দুই বছর ধরে প্রাইভেট গাড়ী চালায় সগীর। তার আগে কাভার্টভ্যান চালাতো। মাঝে অনেকদিন গাড়ী চালায়নি সে। হুট করেই খালাম্মাকে বলে দিল আর চাকরী করবে না সে।

….. তাহলে কি করবে তুমি সগীর? হঠাৎ এভাবে বাড়ী যাচ্ছো! কোনো অসুবিধা? কেন আর চাকরী করবে না? খালাম্মার কথাগুলো শুনে মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিল সগীর।

…. ভাল্লাগে না খালম্মা। গাড়ী চালাতে আর ভাল্লাগে না। বাড়ীতে যেয়ে কৃষিকাজ করবো।

…. তুমি বাড়ীতে থাকতে পারবে না সগীর। আবার সেই ঢাকাতেই চলে আসবে। বরং কিছুদিন ছুটি নিয়ে ঘুরে এসো।

সগীর গাড়ী চালাতে চালাতে ভাবে আসলেই তার ভাল লাগবে না। কিন্তু চাকরীও যে আর ভাল্লাগছে না। আজকাল মাথার মধ্যে কেমন একটা কষ্ট হয়! রাতে ঘুম হয় না। কেমন জানি একটা অশান্তি চেপে ধরে! অস্থির লাগে, বড় অস্থির লাগে।

লাইলীকে বিয়ে করেছিল পাঁচ বছর আগে। লাইলী বিয়ের ক’দিন পর একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে এলো। মেয়েটার নাম পরী। লাইলীর আগের ঘরের মেয়ে। সগীর কিছুই জানতো না। লাইলী তখন গার্মেন্টসে কাজ করে। থাকে কালাপানিতে। সগীরের সঙ্গে একই বাড়ীতে ভাড়া থাকে। ছোট ছোট ঘর,  রান্নাঘর একটা, বাথরুম একটা, কলতলা একটা…. মালিক এসব ঘর ভাড়া দিয়েই চলে। পাশাপাশি রুমে থেকেও কথা হয়নি কখনো। কলতলায় দেখা হতো। সগীরের একবার খুব অসুখ হয়। লাইলী তখন ক’দিন রান্না করে দিয়েছিলো।সগীরের কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। লাইলীর মেয়ের কথা তখন বলেনি সে। সগীর ঠিক করে লাইলীকেই বিয়ে করবে। হলোও বিয়ে। পরীকে আনার পর সগীর অবাক হলেও কিছু বলেনি। ভালই চলছিল সব। সগীর গাড়ী চালিয়ে ঘরে ফেরে, লাইলী তখন পরীকে নিয়ে আশেপাশে ঘুরতে যায়। সগীরের খুব মন খারাপ লাগে।

প্রায় ছয়মাস পর লাইলী একদিন বলে সগীরের সঙ্গে সে থাকতে চায় না। সগীর বুঝে ওঠে না বিষয়টা! তবে মেনে নেয় সগীর। নিজের ব্যাপারে চরম উদাসীনতা আর জীবনটাকে হেলাফেলা করাই তো তার দোষ।

লাইলী পরীকে নিয়ে চলে যায়। সগীর অনুরোধ করে কিন্তু কোনো কাজ হয় না।

কয়েকদিন পর দেশে চলে যায় সগীর। বাড়ীতে গিয়ে পাল্টে যায় সগীর। কারো সঙ্গে কথা বলে না। একা একা কথা বলে, খাওয়া দাওয়া বন্ধ। ঘরে থাকে না, পথে পথে ঘোরে। চুপচাপ বসে থাকে নদীর কূলে।

খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে সগীর। পানি পড়া, ডাব পড়া, মাথায় মালা চালান…  কত কিছুই চলে! মাইট্যা জন্ডিস ঝাড়ে কবিরাজ। বিছানার সঙ্গে মিশে যায় সগীর। বিড়বিড় করে সারাক্ষণ।  রাতের পর রাত ঘুমোয় না।

এ যাত্রা সুস্থ হয় সগীর। বাড়ীতে মন টেকে না। আবার ঢাকায় যেতেও মন চায় না। বাবা কৃষক মানুষ। এত কিছু বোঝে না। জোড় করেই ঢাকায় পাঠায় সগীরকে। বসে বসে থাকলে জীবন চলবে?

ঢাকায় এসে সগীর খালম্মার চাকরী শুরু করে। ভালই চলছিলো। আবারো আজকাল মাথায় সেই অসহ্য কষ্ট। কেমন লাগে বলতে পারে না। ধরাবাঁধা জীবনে হাঁপিয়ে ওঠে সে। রুটিন করে ডিউটি করতে মন চায় না। মনে কিসের ঝড় বয়ে যায় জানে না সগীর! ঘর ছেড়ে দিয়ে সব গুছিয়ে রওনা হয় বাড়ীর পথে।

বাসটা কালিয়াকৈর পৌঁছে গ্যাস পাম্পে থামে। এখনো বৃষ্টি পড়ছে। বাস থেকে নেমে একটা গাছের নীচে দাঁড়ায় সগীর। ঘুটঘুটে আঁধারে সড়কবাতির আলোয় একটা মেয়ে কোলে লাইলীকে দেখা যায়! চোখ কঁচলে আবার তাকায় সগীর। কই লাইলী? ওটা কি পরী কোলে?

খিলখিল হাসি ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারিপাশে। লাইলী খুব হাসতো,ঠিক এমন করে! মাথাটায় আবার সেই কষ্ট…. মাথা চেপে ধরে দু’হাত দিয়ে। কানে আঙুল ঠেসে ধরে। খিলখিল হাসিটা ক্রমশ কাছে আসে… খুব কাছে! সগীর খুব করে পালাতে চায়, খুব জোড়ে দৌড়ে বাসে উঠতে যায়।

খিলখিল হাসির শব্দে সগীর সব ভুলে হাঁটতে থাকে আঁধার ফুঁড়ে অজানা গন্তব্যপথ বরাবর। তমসাচ্ছন্ন রাতে মোহান্ধ মনে সগীর আঁধারের বুকে আঁকে অবহেলা আর পরাজয়ের তিলক। জীবনকে ভালবেসে থাকেনি যে জীবন…. সেই জীবনের হাতছানি এড়াতে পারে না সগীর!

ছবি: গুগল

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box