ম্যারিয়েটা ম্যারিয়েটা

‘চলে যেতে যেতে’ আসলে স্মৃতি নির্ভর রচনা। একটা শহরের ভাঙ্গা ভাঙ্গা গল্প। সেই একটি শহর যেখানে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। শহর ঢাকার প্রেমে পড়ে আছি একটা জীবন। পেছন ফিরে তাকালে দেখি কতকিছু যে হারিয়ে গেছে জীবন থেকে, স্মৃতি থেকেও। ছোট চায়ের দোকান, বইপাড়া, আড্ডা, অদ্ভূত সব মানুষ, রাস্তা, গলি। মনে হয় সবকিছুর এবারি পাট উঠলো বোধ হয়। যাবার সময় হলো আমারও। তাই চলে যেতে যেতে লিখে রাখি সেই হারানো গল্পের খানিকটা।এখন থেকে প্রাণের বাংলায় ধারাবাহিক ছাপা হবে এই ঢাকা শহরের নানা গল্প। আর সেসব গল্পের আড়ালে একজন মানুষের বেড়ে ওঠার কাহিনি। ম্যারিয়েটা ম্যারিয়েটা এই বিভাগের প্রথম কিস্তি।

এক চিলতে দোকান। ডান থেকে বাঁয়ে ঘুরলে থরে থরে শুধু বই সাজানো। একপাশে ছোট্ট একটা সাইড টেবিলের উল্টোদিকে চেয়ার পেতে বসে আছেন স্বত্তাধিকারী খালেদ ভাই। মাথায় চুলের বেশ অনেকটাই অনুপস্থিতি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট, চেয়ারের পেছনে ঝুলছে তার কাপড়ের ঝোলা।ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেটের দোতলায় একসময়ে জ্বলজ্বল করতো ম্যারিয়েটা,বই পড়ুয়াদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।
পেছন পানে তাকালে মনে পড়ে কত উজ্জ্বল সন্ধ্যায় আমাদের তুমুল আড্ডার স্মৃতি পড়ে আছে সেই চিলতে দোকানটার সামনের চওড়া বারান্দায়। সময়টা আশির দশকের গোড়ার দিক। ঢাকা স্টেডিয়ামের দোতলার অবয়ব তখন একেবারেই অন্যরকম ছিল। কয়েক ঘর বইয়ের দোকান, একটি প্রাচীন ছবি তোলার দোকান, বৃদ্ধ দাঁতের চিকিৎসক মাস্তানার চেম্বার পাশাপাশি; বাকী সব শাটার ফেলা গুদাম ঘর। লীগ ফুটবলের জমজমাট খেলা ছাড়া জায়গাটা নির্জনই পড়ে থাকতো। ম্যারিয়েটায় আমাদের একটা আড্ডা ছিল।দোকানের সামনের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে বেশ বিপজ্জনক ভঙ্গীতে অলস সন্ধ্যা কাটানোর আকর্ষণে সেখানে হাজির হতেন, সাপ্তাহিক অনন্যা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ শহীদ, আসতেন লুপ্ত দৈনিক বাংলার রিপোর্টার খায়রুল আনোয়ার, কবি রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা মোহাম্মদ রফিক, প্রয়াত সাংবাদিক মাসুদ আহমেদ রুমি, চলচ্চিত্র বোদ্ধা মোহাম্মদ খসরু, সাংবাদিক স্বদেশ রায়, সানাউল্লাহ লাবলু, প্রয়াত লেখক ও সাংবাদিক আহমদ ফারুক হাসান, মালিক আল ইমরান, প্রণব সাহা, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা সাইফুল, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সংগঠক সালাম ভাই,  এবং আরও কত কত মুখ।এই আড্ডায় কখনো যোগ দিতেন স্বল্পবাক কথা সাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের, কবি নির্মলেন্দু গুণ।আড্ডায় প্রণোদনা পানীয় হিসেবে থাকতো চা আর পেঁয়াজু, ডালপুরি।
খালেদ ভাইয়ের এক সহচার ছিল। আমি ডাকতাম ‘শফি ভাই’ বলে।খালেদ ভাইয়ের সম্পর্কে শ্যালক আর ম্যারিয়েটার ম্যানেজার। কী অদ্ভূত, গত ৩৬ বছরে এই মানুষটির সঙ্গে ভুলেও আমার আর দেখা হয় নি।
ম্যারিয়েটায় এই আড্ডাধারীদের নামে আলাদা আলাদা প্যাকেট থাকতো। খালেদ ভাই কারো প্যাকেটের ভেতরে রেখে দিতেন খেলার পত্রিকা, কারো প্যাকেটে কবিতার বই, কারো প্যাকেটে জটিল প্রবন্ধ।আমি এই জীবনে কোনদিন দেখিনি কোন বইয়ের দোকানের পরিচালক পাঠকের রুচি বুঝে এভাবে প্যাকেটে বই রেখে দিতে। খালেদ ভাই ম্যারিয়েটার আড্ডাধারীদের পড়ার রুচিটা খুব ভালোভাবে জানতেন। আমি তখন সদ্য কবিতা লিখতে শুরু করেছি। ম্যারিয়েটায় গেলেই খালেদ ভাই কোনদিন ধরিয়ে দিতেন অরুণ মিত্রের ফরাসী কবিতার অনুবাদ, কোনদিন পাবলো নেরুদার ঝকঝকে পেঙ্গুইন কালেকশন।
ম্যারিয়েটায় আমরা বেশীরভাগ সময় আড্ডা দিতাম দাঁড়িয়ে। আমাদের বসার জায়গা হতো বারান্দার উঁচু রেলিংয়ে অথবা ম্যারিয়েটার বইয়ের কার্টুনের ওপর। ম্যারিয়েটায় নতুন বইয়ের চালান আসার দিনটা ছিল আমাদের কয়েকজন বিশেষ করে সৈয়দ শহীদ, খায়রুল আনোয়ার আর আমার জন্য উৎসবের দিন। শহীদ ভাই সকালেই ফোন করে জানিয়ে দিতো, ‘বই চলে এসেছে, দুপুরে চলে আসিস।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন আমি। বই আসার খবর পেলে দুপুরেই চলে যেতাম ম্যারিয়েটায়। তারপর বইয়ের প্যাকেট খোলা, বই সাজানো আর ফাঁকে ফাঁকে নিজের পছন্দের বইগুলো আলাদা করে সরিয়ে রাখা চলতো সন্ধ্যা পর্যন্ত। আমাদের বই বাকিতে দিতেন খালেদ ভাই। তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করি আমি। মাসের প্রথম বেতন পেয়ে শোধ করতাম বইয়ের দাম।
বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে সেই ম্যারিয়েটায়। আবার তাদের হারিয়েও ফেলেছি। হয়তো এখন একই শহরে থাকি, ঘুরে বেড়াই কিন্তু আমাদের দেখা হয় না। শহীদ ভাই, মানে সৈয়দ শহীদ নিউইয়র্কে বহুকাল, মুকল ভাই (খায়রুল আনোয়ার) একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলের সংবাদ বিভাগের প্রধান, আমি প্রায় লুপ্ত সাংবাদিক। মাঝে মাঝে আমি আর মুকুল ভাই কোথায় বসে সেইসব স্মৃতির জাবর কাটি। ঢাকা কত বড় হয়ে গেল, বদলে গেল সেই স্টেডিয়াম পাড়া, চওড়া হলো পথঘাট, ঝলমলে আলো জ্বলে উঠলো চারপাশে। শুধু থাকলো না আমাদের সেই ম্যারিয়েটা, ম্যারিয়েটার আড্ডা। ম্যারিয়েটা উঠে গেছে অনেক কাল আগে। খালেদ ভাই বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। তাঁর ছেলেরা ব্যবসাটা ধরে রাখতে পারে নি। আমাদের বুকের ভেতরে আজও স্মৃতির হাওয়া শুধু ম্যারিয়েটা, ম্যারিয়েটা বলে ডেকে ফেরে।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল