ম্যাহেকি ম্যাহেকি আজাদি আনতে হবে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

(কলকাতা থেকে): ওলা বা উবারের বাইকে বসে গল্প করাটা এখন নেশা আর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই খানিক ক্ষণের জার্নিতে অন্য একটা মানুষের জীবনের জার্নির অংশ জেনে ফেলতে পারার মজাই আলাদা ঠেকে আমার কাছে। কত কী যে জানা যায়, আর কত কী পাওয়া যায়! আর আমি পারিও গল্প করতে, উফফ…!

সেদিন শ্যামবাজার থেকে উত্তরপাড়া যাওয়ার পথে জেনে ফেলেছিলাম, ভদ্রলোক ১৬ বছরের একটি মেয়েকে ফুঁসলে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। তাঁদের এখন দুটি মেয়ে, সেই দুই মেয়েই আবার সিজারে জন্মেছে। একটি এইচএস দিয়েছে, অন্যটি ফাইভে পড়ে।

আর এক দিন বাড়ি থেকে অফিস গিয়েছিলাম, এক থিয়েটার আর্টিস্টের সঙ্গে। বিহারের গ্রামের ছেলে। পাটনায় থিয়েটার করতো। পেট চালাতে কলকাতা এসেছে। কয়েক মাস অন্যের ট্যাক্সি চালানোর পরে এখন নিজের স্কুটি কিনে নেমেছে। একটু টাকা জমলেই ’ফিরসে স্টেজ করেঙ্গে’।

যাইহোক, আজ রাতে বাড়ি ফেরার সময়ে বুকিংয়ের পর ড্রাইভারের রেটিং দেখি ৪.৯৫। বাঙালি। ‘কোথায় যাবেন’ প্রশ্নটা না করেই টুক করে লোকেশনে চলে এলেন। তখনই ভাল লেগে গেলো। বাইকে উঠেই শুরু করলাম।

–ঠান্ডাটা আবার কী সুন্দর পড়লো না!
–হ্যাঁ ম্যাডাম। যদ্দিন থাকে এই করে আর কী, সারা বছর তো তাতাপোড়া গরম।
–হুমম…
–আপনি সোদপুরের কোন জায়গাটায় নামবেন?
–সোদপুরের আগেই, মেন রোডের ওপরেই।
–আচ্ছা আচ্ছা। আমার হোম মারা আছে তো হরিদেবপুর, তাই বললাম।
–হ্যাঁ, কাছেই।

উনি রাসবিহারীতে একটা মোটরগ্যারেজে কাজ করেন। সকাল সাড়ে ন’টা থেকে সন্ধে ছ’টা। তার পর বাড়ি এসে, জামা বদলে, টিফিন খেয়ে বেরিয়ে পড়েন বাইক নিয়ে। কয়েক ঘণ্টা চালিয়ে ১১টার মধ্যে বাড়ি। আবার পরের দিন। মেয়ে ছোট, কুঁদঘাটের একটা ভাল স্কুলে ভর্তি করেছেন। খরচ অনেক। এক্সট্রা রোজগার করতেই হয়। ওঁর বৌ টুকটাক জিনিসপত্র বিক্রি করেন বিভিন্ন কোম্পানির। ওই রিসেলিংয়ের মতো।

এসব নানা কিছু পার করে, কোনও কোনও উবারচালক কেমন দুষ্ট-প্রকৃতির ক্যানসেলবাজ হন, সে প্রসঙ্গে এসে পৌঁছেছি আমরা।

–আমি কোনও মহিলার বুকিং ক্যানসেল করি না ম্যাডাম। বিশেষ করে রাতে হলে।
–তাই? বাহ্!
–হ্যাঁ ম্যাডাম। রাতে কোনও মহিলা বাইক বুক করছেন মানে তিনি তো কোনও দরকারেই করছেন বলুন?
–তা তো বটেই!
–এই যে আপনি সারাদিন কাজ করে এত রাতে ফিরছেন, না পেলে আপনার অসুবিধা হতো না?
–তা তো হয়ই। রোজই কয়েকজন ক্যানসেল করে দেন, তার পর পাই। দেরি হয়ে যায়।
–তবে! আমি কখনও ক্যানসেল করি না। আমার বৌটাকেও তো এদিক ওদিক যেতে হয়। মেয়েটাও বড় হচ্ছে। আমি বুঝি।

আমি তো রীতিমতো গদগদ তখন! বললাম,

–খুব ভাল। সবাই এটুকু বুঝলে আমাদের অভিযোগ কত কমে যেতো বলুন তো!
–হ্যাঁ ম্যাডাম। সেই জন্যই আপনাকে জিজ্ঞেসও করিনি, কোথায় যাবেন। আপনি যেখানেই যেতেন, চলে যেতাম।
–খুব ভাল। এমনই করবেন।
–আমি রাতের দিকে শুধু মুসলিমদের পিকআপ থাকলে ক্যানসেল করে দিই।

চড়াম করে একটা চাবুক খেলাম যেন। এতক্ষণ ধরে তৈরি করা মুগ্ধতার পাহাড়ে যেন কেউ ভূমিকম্প ঢেলে দিলো। একটা সুন্দর করে আঁকা ছবিতে যেন কালি ছিটকে এসে পড়ল। ঠিক শুনলাম আমি? ঠিকই শুনলাম? এভাবে বললেন? উনি তখনও বলছেন…

–মুসলিম নাম দেখলে আমি রাতে তুলি না।
–মানে… কেন? (খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলাম।)
–ওদের বিশ্বাস নেই ম্যাডাম। কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।
–কী হবে?
–জানি না, কিছু যদি হয়। ওসব এলাকা ভাল হয় না তো।
–আপনার সঙ্গে কখনও কিছু হয়েছে, ওরকম কোনও এলাকায়?
–না, তা হয়নি।
–কোনও মুসলিম কখনও আপনাকে কিছু করেছেন?
–না, কেউ কিছু করেনি। তবু আর কী। সাবধানতা নিজের নিজের বলুন!
–সে তো বটেই, সে তো বটেই। কিন্তু কীসের থেকে সাবধান?
–ওই… মুসলিমদের থেকে।

আমি যত জন মুসলিমকে চিনি… বন্ধু, ভাই, দাদা, দিদি… সবার মুখ মনে পড়ে গেল একবার করে। সাবধান হওয়ার চেষ্টা করবো বলে ভাবলাম… মানে ঠিক কোন জায়গা থেকে একটা মানুষ এমন করে বলেন…দিশাহারা লাগছিলো।
হঠাৎ একটা কথা মনে এলো! আমার উবার অ্যাকাউন্টের নাম শুধু তিয়াষ লেখা আছে। পদবি নেই।

–আচ্ছা, আমায় কেন নিলেন? আমি যে মুসলিম নই কী করে জানলেন?!
–আ-আ-আপনি… মহিলা বলেই নিয়ে নিলাম ম্যাডাম।
–আর নাম দেখে মুসলিম মহিলা বলে বুঝতে পারলে?
–ওই আর কী… কোথায় যাবে জেনে নিই। বেশি ভেতরে হলে….
–বেশি ভেতরে হলে নেন না? সে কীভাবে ফিরবে তবে?
–দেখতে হবে তখন…

বাড়ি এসে গেলো। নামতে হলো। এ আলোচনা আমায় থমকে দিয়েছে আজ দিনের শেষে। এত সুন্দর একজন মানুষ, এত পরিশ্রমী, সৎ, মানবিক… অথচ…
এ কোন বিদ্বেষের শিকার উনি…! এ কোন অনায়াস বিভাজনে আক্রান্ত আমরা!

আমি টাকা দেওয়ার সময় বললাম, সকলেরই দরকার থাকে দাদা। দরকারেই সকলে গাড়ি বুক করে। মহিলা, পুরুষ, হিন্দু, মুসলিম সকলেই। ধর্ম দেখে কাউকে ক্যানসেল করবেন না প্লিজ…

–আচ্ছা ম্যাডাম, তাই হবে। আমায় রেটিংটা একটু…
–দিয়ে দেবো। থ্যাঙ্কিউ…

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রেটিং দিলাম। এক আর পাঁচে আঙুলটা ঘুরছিলো। এক জন ভাল, মানবিক এবং নিরাপদ ড্রাইভারের রেটিং দিতে চাইছিলাম। একইসঙ্গে এক জন বিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক চিন্তায় আচ্ছন্ন মানুষের নম্বর কেটে নিতে চাইছিলাম। কনফিউজড লাগছিলো। শেষমেশ দিয়েই দিলাম। পাঁচতারা রেটিং।

আর যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, যে সমাজতন্ত্র, যে পরিস্থিতি, যে পারিপার্শ্বিক ওঁর এই চরম ভুল ও পরম অন্ধ ধারণা তৈরি করেছে, তাদের জন্য একরাশ নেগেটিভ মার্কিন রাখলাম বুকের ভেতর।
তার পর একটা বড় করে শ্বাস নিয়ে মনে করে নিলাম, এই বিচিত্র দুনিয়াকে মন্থন করেই বিভেদের অচলায়তন থেকে ম্যাহেকি ম্যাহেকি আজাদি আনতে হবে আমাদের…!

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]