যখন আলোগুলো নিভে আসে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রাত গভীর হলে ভোর কাছে আসে।এমন ভাবনাতেই আমরা প্রায় দেড় বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলাম।পেলাম না সেই ভোরের দেখা।এখনও আমাদের সকাল হয় কোনো-না-কোনো মৃত্যু সংবাদ দিয়ে।তাই প্রতিদিন সকালে চোখ খোলার আগে ভয় হয়। নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকি। এক বছরের বেশী সময় শারীরিক ভাবে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব থেকে বিছিন্ন আমরা।সবার মনকেই ঘিরে ধরেছে অস্থিরতা,বিষন্নতা।তবুও মনের ঘরে জমা হয় কিছু কথা, কিছু দমচাপা কষ্ট। তেমনি কিছু মন কেমন করা অনুভুতি নিয়েই রইলো এবারের প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন ‘যখন আলোগুলো নিভে আসে’।

মহামারীর আতঙ্কগ্রস্ত ধূসর দিন কবে কাটবে…

রুমা মোদক
(লেখক)

কোন কোন দিনের বিশেষ রং থাকে।লাল, নীল, হলুদ একেকদিনের একেকটা রং,একেকটা রঙের একেকটা মানে।আনন্দ, বেদনা,মনভার।কোন দিনই কি আর নির্ভেজাল রঙের হয়? একটু রংচটা, চিনতে না পারা ধূসরও হয় কোন একটা দিন। কলেজে যেতে যেতে দেখলাম বৃদ্ধ মহিলাটি ভিক্ষার ঝুলি পাশে রেখে খুব যত্নে কমলার খোসা ছাড়াচ্ছেন।আহা! কমলার কয়েকটা কোয়া পচা।মহিলাটির চেহারায় ঘনায়মান আশাভঙ্গের ভাঁজ আমি পড়তে পারছি। আমার ব্যাগে কক্ষনো থাকেনা, কিন্তু আজ ভাগ্যক্রমে একটা কমলা ছিলো। নেমে কি মহিলাটিকে চমকে দেবো?ভাবনাটা জমাট বাঁধার আগেই অটোবাইকটা টান মেরে অনেক খানি এগিয়ে গেলো। মহিলাটি হারিয়ে গেলো ভীড়ে। আর কী খুঁজে পাবো তাঁকে? তাঁর জন্য প্রতিদিন একটা কমলা নিয়ে বের হবো আমি। যদি কোনদিন পেয়ে যাই…। আজ দেশে করোনাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দশহাজার ছাড়িয়েছে। উর্দ্ধমুখী সূচক থামানো যাচ্ছেনা,কোথাও কোন পদক্ষেপ নেই,কারো…। এক ডাক্তারের পোস্ট পড়ছিলাম সকাল সকাল,এই আক্রান্তের মৃত্যুর দাগগুলো পরবে আগামী সপ্তাহগুলোতে। কলেজ থেকে ফেরার পথে গলির মোড়ের দোকান থেকে একবাক্স মাস্ক কিনলাম। প্রতিদিন ফেসবুকে মেমোরি আসে,২০২০ এর এসময়,এই মার্চের সময়টুকু কী ভীষণ দুঃসহ ভার হয়ে জ্বলজ্বল করছে। আমরা এমন ভয়ার্ত উৎকণ্ঠার দিন আর পাইনি কখনো। খুব বন্ধু নিত্রাকে মনে পড়ে। একদম যুদ্ধাবস্থার মতো ঘরবন্দী আমরা, আমি নিত্রা,রুমা,হায়দার ভাই আরো কয়েকজন প্রতিদিন কিছু না কিছু করে যাচ্ছি ঘরে বসে৷ আক্রান্ত বাড়ছে,মৃত্যু বাড়ছে৷ এবছর নিত্রা শুয়ে আছে নির্বাক বিছানায়,বেঁচে থাকা নিত্রা এর কিছুই জানছে না,বুঝছে না। ফোন করে বলছে না, রুমাদি আজকে ডব্লিউ এইচ ও কী কী স্বাস্থ্যবিধি দিয়েছে দ্রুত বাংলা করে দেন,পোস্ট করে দেই। নিত্রা,দ্রুত উঠে বসো।খুব মিস করছি…। আমারো গা টা ম্যাজম্যাজ করছিলো,জ্বর জ্বর।থার্মোমিটার বলছে, না জ্বর নয়। ৯৮ কে জ্বর বলেনা। আমি ভালো আছি। কিন্তু রাঙাদি ঢাকায় কোভিড পজেটিভ,কতোক্ষন পরপর ভিডিও কল দেই,কেমন লাগছে এখন? দিদিভাই সিলেটে,হাসপাতালে। অক্সিজেন সাপোর্টে আছে। কাল আমাকে ম্যাসেঞ্জারে রিপ্লাই দিলো, আমি করোনার প্রেমে পড়েছি গো রুমা! জীবনটাই কাটিয়ে দিলেন প্রেমহীন, দিদিভাই কেনো বুড়ো বয়সে এ প্রেমে পড়তে গেলেন? দিদিভাইকে ফোন করিনা। কল ধরে কথা বলার অবস্থায় নেই দিদিভাই। কোন কোন দিন হয় ধূসর।ঝড় আসবে না রোদ উঠবে আকাশ আগাম বার্তা দেয়না। আমাদের মহামারীর আতঙ্কগ্রস্ত ধূসর দিন কবে কাটবে…

তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে

রুদ্রাক্ষ রহমান
(লেখক, সাংবাদিক)

পূব আকাশের রোদ এসে লাগছে পৃথিবীর শরীরে। শরীরেরঘরবাড়ি জেগে উঠছে। তোমার কাছে যেতে খুব ইচ্ছে করছে খুব আমার। ১৪২৭ সালের বৈশাখ মাসের ১৬ তারিখ, ২০২১ খ্রিস্ট অব্দের ২৯ এপ্রিল সকাল চোখ মেলে আমার এসব মনে হলো। রাতের ঝড়-বৃষ্টিধোয়া ঢাকা শহরে বিস্মিত হলাম পূব আকাশে চোখ রেখে। দক্ষিণে ঝড়-জলে পরিষ্কার সবুজ পাতায় আলোর ঝিলিক। উত্তরে শেষ না হওয়া দালানের ছাদের কোণে একটি বুলবুলির অবিরাম গেয়ে চলা। পশ্চিমে শব্দের হাঙ্গামা। মানুষ ছুটছে তার বাহনে শব্দের ফেনা তুলে। ২০২০ সালের মার্চ মাসের ৮ তারিখ। চীনে হস্ত-পদ স্কন্ধ-মাথাহীন এক আপদ নেমে এলো। চীন থেকে দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়লো গোটা দুনিয়ায়। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস নামক এই বিশ্বশত্রু’র হাত থেকে রেহাই মিললো না ‘বাঙালিমুসলমান’-এর ভূমি বাংলাদেশেরও। অথচ এতো মৃত্যু, এতো কান্নাদৃশ্য হাসপাতালে হাসপাতালে, এতো এতো হাহাকার, তারপরও এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ভেতরে ভেতরে এতোই বলিয়ান-তারা প্রকাশ্যেই বলে ‘এই ভাইরাস মুসলমানের কোনো ক্ষতি করতে পারে না’! তাই তারা সব সরকারি নির্দেশকে মুরুব্বি আঙুল দেখিয়ে দল বেঁধে মসজিদে যায়। এখনো অনেকে মাস্ক না পরেই ঘুরে বেড়ায়। আর দেশের সরকার ‘কঠোর বিধিনিষেধ’-এর নামে ‘আয় সখি ছি কিত কিত খেলি’ গেম দেখছে। পাশের দেশ ভারত করোনায় ‘মৃত্যুপরী’তে পরিণত হয়েছে প্রায়। আর সব দেখে শুনে আমরা চলছি দোকানদার আর গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের কথায়। সব খুলে দিয়ে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’! মন্ত্রীদের কেউ কেউ মেঠোবক্তৃতায় দেশজুড়ে একে ‘লকডাউন’ বলছেন বটে, তবে ইদানিং অধিক আলোচিত শব্দ ‘প্রজ্ঞাপন’-এ কোথাও লক ডাউন নেই। আছে কঠোর বিধিনিষেধ। আর এই কঠোরের রূপটা এতোই কঠোর যে রাজধানীর সড়কে এখন যানের জট লেগে যায়। তো সেই শুরুতে, করোনার প্রথম ধাক্কায়, আমরা ভেবেছিলাম, এমন আগামীকালহীন জীবন, এমন বিপদে বাংলাদেশের মানুষ, বাঙালি মুসলমান ভালো হয়ে যাবে। অন্তত জেনে-বুঝে তারা আর অন্যায় করবে না। আর দুই নম্বরিতে নামবে না। সোজা হয়ে যাবে, তেমন সোজা যেমন সাপ গর্তে ঢুকার আগে হয়। হলো কই? উল্টো, এটাইতো দেখতে হচ্ছে আমাদের; যে সেই অদৃশ্য, মহাশক্তিধরকে নিয়েও বাণিজ্য করা যায়! করলো অনেকে, ধরা গেলো। এখনো অনেকে করে চলেছে। ধরা খাচ্ছে না। ‘বিবেক’ এখন কেবলি আভিধানিক শব্দ! আমাদের মন থেকে ভয়, শঙ্কা, নীতি-নৈতিকতা নির্বাসনে গেছে। দেশের সব মানুষের জন্য এখনো টিকার নিশ্চয়তা হয়নি। ভারত-রাশিয়া-চীন, বাংলাদেশ এখন টিকাকূটনীতিতে। এতো কিছু করেও কি শেষ রক্ষা হবে? আমরা জানি না। কেউ জানি না। এমন আগামীকালহীন জীবন, এমন পৃথিবী আমাদের আর কতো দিন বয়ে বেড়াতে হবে; কেউ কিছু বলতে পারছে না। তবে যারা একটু বোধসম্পন্ন মানুষ তারা জানে, বার বার বুঝে গেছে এসব টাকার পাহাড়, এসব ক্ষমতার চেয়ে একটু মুক্ত বাতাস, একটু মুক্তজীবন অনেক অনেক দামি মূল্যবান। জেলবাসে না গেলে কেউ বুঝতেই পারবে না মুক্তজীবন, অবারিত ছন্দ কাকে বলে! আর ওই যে তোমার কাছে যেতে চাওয়া, যেতে চাওয়ার ইচ্ছেটা জাগা সব সময়, অথচ যেতে না পারা, এরচেয়ে কষ্টকর, দম আটকে যাওয়া সময় আর কী হতে পারে!

আমার দু’চোখের ঘুম নির্বাসনে গিয়েছে…

মেহেরুন্নেসা
(অধ্যাপক, লেখক)

নাহ! গভীর ঘুম আজকাল উধাও। কবরির চলে যাওয়া মৃত্যুকে যেন আরো কয়ধাপ কাছে নিয়ে এলো। রাতভর অজানা আশঙ্কায় ছটফট করলাম। ঘড়িতেএলার্ম বাজতেই দ্রুত সেহরির জন্য বিছানা ছাড়লাম। সেহরি খাওয়ার মাঝখানেই ঝড় শুরু হলো। খাওয়া শেষ করে বারান্দার দরজাটা খুলে দেওয়া মাত্র একঝলক ঠান্ডা বাতাস আমায় আলিঙ্গন করলো। মনটা ক্ষণিকের তরে ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হলো। বাহ! বেশ! কি অপূর্ব এই জগত! আসলেই জীবন প্রকৃতির এক অনবদ্য উপহার। ঘরে ঘরে এখনো আলো জ্বলছে। লোকজন সেহরি খাচ্ছে। সামনের বাসার ফ্যানটা বৃত্তাকার ব্যাসে অনবরত ঘুরছে। এমন সময় মসজিদ থেকে ভেসে এলো আরেকটি শোক সংবাদ। ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। মন খারাপেরা আরো ভয়ঙ্করভাবে জড়িয়ে ধরলো। আজ সন্ধ্যায় বাসার অদূরে জমকুলিটা শোকভরা আকুল কণ্ঠে ডেকে উঠলো। বিষন্নবদনে চলে এলাম চিরচেনা বারান্দায়। আম-কাঁঠালের ফাঁক-ফোকর গলে যে আলো-আঁধারির খেলা, তা যেন দূরলোকের রহস্যময় কোনো বার্তা দিতে চায় আমাকে। কি ভয়ানক ভার মনে হচ্ছে পৃথিবীকে! তবে কি পৃথিবীজুড়ে কোভিড-১৯ যে মৃত্যুর ডামাডোল বাজিয়ে চলেছে তারই রেশ অনুভব করছি এই অবেলায়! আমিতো মৃত্যু নিয়ে ভাবতে চাইনা। আমি কোভিড-১৯ কে হারিয়ে আরো বহুদিন জগতের ধূলোময়লার পরশ পেতে চাই। অথচ মৃত্যুর হিমশীতল ভাবনা প্রতিনিয়ত আমাকে ভেঙেচুরে পরপারের এক অচেনা গুমোট আঁধারে নিমজ্জিত করে। কোভিড-১৯ ভারতের যে ভয়ানক হাল করেছে তা দেখতে দেখতে আমার দু’চোখের ঘুম নির্বাসনে গিয়েছে। ঘুমহীন একেকটি রাত কি অসহ্য! ভারতে শতশত মানুষ করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। শ্মশানে চিতার পর চিতা জ্বলছে। দাহ করার জন্য অপেক্ষায় থাকছে অসংখ্য লাশবাহী অ্যাম্বুল্যান্স। স্বজন হারানোর বেদনায় অশ্রুসিক্ত চোখগুলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে জীবনের নিষ্ঠুর থাবার আখ্যান রচনা করে। মানবতার কি অসহায় আত্মসমর্পণ চলছে ধরার বুকে! মনে পড়ে চীনের উহানের কথা যেখান থেকে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিলো। জীববিজ্ঞানের ছাত্রী হয়েও সেদিন মনকে প্রবোধ দিয়েছিলাম এই বলে যে, যাক বাবা! প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের এই অগ্রসরতার বলয়ে সুদূর চীন থেকে অন্তত আমাদের দেশে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কে জানতো! এতো অল্পসময়ের মধ্যে এই দানবীয় ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে ছাড়বে! অবশেষে আমাদের দেশে এই ভাইরাস হানা দিতে খুব বেশি সময় নেয়নি কিন্তু! এই করোনা ভারতকে নাস্তানুবাদ বানিয়ে ছেড়েছে। এখন ভারতের প্রতিবেশি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে কতটা ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে তা ভবিতব্যই বলতে পারে! এতোসব এলোমেলো ভাবনার ডাল বেয়ে ভিনদেশী সেই মৃত মানুষগুলোর জন্য চোখের কোণে জল জমে ওঠে। কখনো কি ভাবতে পেরেছি এক জীবনে পৃথিবীর বুকে এই মহামারির তাণ্ডব দেখবো! তবুও আমি খোলা আকাশের তারা গুনি। বুক ভরে শ্বাস নেই। পৃথিবীর অতীত ও বর্তমানে ডুব দেই। ভালোবাসায় বুঁদ হই। প্রেম যাচি। এইতো জীবন! এটাইতো এখন যাপিত জীবনের নকশা! চারদিকে মৃত্যুর এতো প্রলয়ঙ্করী ঢেউ! তারপরেও আমি হাজার বছর বেঁচে থাকার স্বপ্নে বিভোর হই!

 

আজ আছি কাল নেই অভিযোগ রেখো না…

ওমর শরীফ
(সাংবাদিক)

এক পসলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। স্কুলের সামনের উঠানে কাদা-পানি জমে আছে জায়গায় জায়গায়। টিফিনের পর ক্লাস চলছে। কিন্তু আমার বন্ধুটার কি খেয়াল চাপলো, সে স্কুলের সাদা শার্ট খুলে ওই কাদা-পানিতে কাচতে শুরু করলো। এটা নাকি কাপড় ধোয়া খেলা। কেউ তাকে টেনেও ওঠাতে পারলো না। ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা, থাক একদিন ক্লাস না করলে কী আর হবে। সারাটা বেলা ওই ছেলে কাপড় ধোয়া খেলে গেলো। আর আমরা ক্লাসে বসে সেটা দেখেই আশ মেটালাম। পরদিন খবর আসলো মারা গেছে ছেলেটা। প্রচণ্ড জ্বর এসেছিলো বোধ হয়। সেই ক্লাস ওয়ানের ঘটনা। তারপরও মনে আছে। জীবনে প্রথম কারও পরিচিত মানুষের মৃত্যু সংবাদ, তাই হয়ত স্মৃতি ভুলতে দেয়নি। অনেক বছর পর ১৯৯৬ সালে ভোরের কাগজে লেখা শুরু করার পর, শামা নামের এক নায়িকার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ভাব জমে গেলো। তার বাসায় আড্ডা, ঘুরতে যাওয়া, তার মুক্তি পাওয়া ছবি একসঙ্গে দেখতে যাওয়া ….. তারপর একদিন খবর আসলো সড়ক দূর্ঘটনায় সেই শামা মারা গেছে। চোখের পানি মুছতে মুছতে সেদিন শামাকে নিয়ে রিপোর্ট করেছিলাম মনে আছে। এরপর প্রথম আলোতে কাজ শুরু। একদিন টুপ করে ছাদ থেকে পড়ে আমাদেরই সহকর্মী বন্ধু টুশি মরে গেল। কয়েকদিন আগে মাত্র আংটি বদল করেছিলো ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে। ২০০৭ সালের সিডর ঝড়। সেই ঝড়ের রাতে অসুস্থ হলেন সঞ্জীব চৌধুরী। বেশ কয়েকদিন অচেতন থেকে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। ২০০৯ সালে আব্বার করা বাড়িটা ডেভেলপারদের দিয়েছিলাম। অদ্ভূত বিষয় হলো যেদিন পুরান বাড়িটা ভাঙা শেষ হলো তার কদিন পরেই আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। যেন বড্ড অভিমান, তার বাড়িটা কেনো ভাঙলাম। আমার এখনও অনুশোচনা হয়, নিজের শেকড়টা উপড়ে ফেলার জন্য। হয়তো আমাদের বাড়ির কাজটা এখনও ঝুলে আছে তার অভিমানের কারণেই। অথবা অভিশাপ! অথচ ইচ্ছে ছিলো অন্তত লিফটওয়ালা বাসা হবে … আব্বা আম্মার উঠতে নামতে কষ্ট হবে না। ২০১৮ সালে অদ্ভুত ভাবে মরে গেল তাজিন আপা। তাজিন আহমেদ অভিনেত্রী। অথচ বড় বোন বলতে তাকে বুঝতাম অতি আপনভাবে। আইয়ুব বাচ্চুও চ‌লে গে‌লেন রুপা‌লি গিটার ফে‌লে। এই কা‌ছের মানু‌ষের মৃত্যুগুলো আমাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, এখন আর কোনো মৃত্যুই আমাকে বিচলিত করে না। মানুষ মরবেই, কেউ আগে কেউ পরে। মিতা হককে আমি কেনো জানি, কোনো দিন ভাবি ডাকি নাই। প্রথম দিকে মিতা আপা বলতাম, পরের দিকে মিতা আন্টি ডাকা শুরু করেছিলাম। এই পরিবারের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিলো তাজিন আপার কারণেই। পিচ্চি জয়িতা বড় হয়ে বিয়ে করে বসলো আমাদেরই স্কুলের এক ছোট ভাইকে। কি অদ্ভূত যোগাযোগ। আজ মিতা আন্টির মৃত্যুও আমাকে বিচলিত করলো না। এই মহামারীর সময়ে এবার আশপাশে বহু মৃত্যুর খবর শুনছি।তবে কেনো জানি প্রভাব ফেলছে না। অথচ শঙ্কা কাজ করে আশপাশের প্রিয় মানুষদের এরকম খবর শুনতে হবে নাতো। শুনলেও মনে হয় নির্বিকারই থাকবো। বাজে বিষয়গুলো গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। ইদানিং খুব রাগ ওঠে। নিয়ন্ত্রণহীন রাগ। আক্রোশে বালিশ পিটাই, ক্লান্ত হই। তাও ঘুম হয় না। মনে মনে এক কথাই বার বার ফিরে আসে মরেই যদি যাব তবে কেনো নিজের ইচ্ছেগুলো অন্য মানুষদের জন্যত্যাগ করেছিলাম। ভেবেছিলাম বাড়ির কাজটা শেষ হয়ে যাবে। ২০১৯ সালে তাই ইচ্ছে ছিলো দেশ বিদেশ ঘোরার। হয়নি নানান কারণে। কিংবা কারও অবহেলায়। তাই রাগ হয় কেনো নিজেরটা বুঝে নিয়ে পথ আগাই না। উপরের মানুষগুলোর মতো আমারও চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে উন্মাদ মনে হয়….. মনে হয় মানুষের মরণ আমার মধ্যে প্রভাব যে ফেলে না এটা কি মানসিক রোগ? স্কুল জীবনের বন্ধুরা আমাকে একটা গালি দিত, ‘তুই কি মানুষ, নাকি ওমর’! নিজেকে এখন ওমর বলেই গালি দেই। তারপরও প্রিয় কিছু মানুষ আছে, হ্যাপি আখন্দের সুরে তাদের বলতে ইচ্ছে হয় ‘আজ আছি কাল নেই অভিযোগ রেখো না, অধরের ওই হাসি মুছে ফেল না।’

আমি দেখতে না পেলেও তিনি আছেন

অলি সেন
(লেখক, পশ্চিমবঙ্গ)

বৈশাখের মাঝামাঝি সময়। চন্দ্র ‘বিশাখ’নক্ষত্র থেকে ‘অনুরাধায়’ প্রবেশ করেছেন মাত্র। মধ্যাহ্নের মন্থর বাতাস এখন আর অতটা উষ্ণ নয়।সেই না- উষ্ণ, মন্থর বাতাসের পথ ধরে তিনি হেঁটে আসছেন আমার দিকে। খুব ইচ্ছে করে বারবার এই দৃশ্যটার কাছে ফিরে যেতে।

এখন এক অদ্ভুত সময় কালে প্রবেশ করেছি আমরা। যখন সর্বনাশা অতিমারী কে নিয়ে খেলায় মেতেছেন রাজা- রানী- শ্রেষ্ঠী- মন্ত্রী- পাত্র- মিত্র সবাই, সব্বাই। শেষপর্যন্ত কে জিতবেন? অতিমারী না প্রজাহীন শাসককুল !

ভয় হয়। কত শতাব্দী কাল বসে আছি আপনার প্রতীক্ষায়-

সেই যে আমার ধুলো মাটির টিপ, সেই যে আমার নদীর পারের মেঘস্বাক্ষী করা মন্ত্র,সেই যে অতিধীর স্বরে তাঁর উচ্চারণ ‘দেহি পদপল্লব মূদারম্’- সবই তো অপার্থিব, অলৌকিক ।এ জগতের নয়। সত্যি বলবো?একটা মানুষের এক জীবনের থেকে এর বেশি আর কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না- থাকতে নেই- কিন্তু আমার আছে।আমার শূন্য দোওয়াত,খাগের কলম।ওই দোওয়াতে কালি ঢেলে সময় লেখার বড়ো সাধ হয় আমার,যা হওয়ার নয়।

সেই যে চলে আসার আগে আমার মাথায় একবার হাত রাখলেন ,ব্যস, তারপর কতো বছরের না দেখা। তবু মনে হতো তিনি তো আছেন। আমি দেখতে না পেলেও তিনি আছেন। কিন্তু এখন এই সর্বনাশা সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে এমন যদি হয় যেদিন আমি থাকবো কিন্তু জানবো তিনি কোথথাও নেই- তা যদি হয় তাহলে,,,কাউকে কাউকে বোধহয় এক-বেনীবন্ধাই থেকে যেতে হয় আজীবন কাল। না?

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box