যখন ছবি কোনও দলিল নয়,তখন সেটা হয় স্বপ্ন-ইঙ্গমার বার্গম্যান

বাল্টিক সাগরের নির্জন তীরে কাটানো শেষ বয়সে ইঙ্গমার বার্গম্যান  শৈশবের মুহূর্তগুলো ভুলতে পারেননি। দেওয়ালে বিচ্ছুরিত রঙিন আলোর বিভাজন, ম্যাজিক লণ্ঠনে প্রতিফলিত শুধুই রঙের মেলা। তাঁর নাকে আসতো গরমে পোড়া ধাতব পাতের গন্ধ! শুটিংয়ের সময়েও তিনি যেন এক শিশু, যেন ঠাকুমার বাড়ির দোতলার ঘরে খেলনা থিয়েটার নিয়ে ‘স্ট্রিন্ডবার্গ’ নাটকের মহড়ায় মগ্ন। ‘ফ্যানি অ্যান্ড আলেকজ়ান্ডার’ ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে তাঁর ফেলে আসা ছোটবেলার নানান বাঁক, বৈপরীত্য।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সিনেমার জগতের এই অসামান্য মানুষটির দেখা হয়েছিলো। আলোচনায় বলেছিলেন, ‘‘যখন ছবি কোনও দলিল নয়, তখন সেটা হয় স্বপ্ন। সে জন্যই তারকোভস্কি সবার মাঝে শ্রেষ্ঠ।’’ আন্দ্রেই তারকোভস্কি সম্পর্কে বার্গম্যান এমনই মত দিয়েছিলেন। আর তারকোভস্কিও বলেছেন দু’জন মানুষের কথা, যাঁদের দর্শন তাঁকে ভাবিত করে— ব্রেসোঁ এবং বার্গম্যান।

মজার ব্যাপার হচ্ছে তারকোভস্কির সঙ্গে বার্গম্যানের দেখা হয়নি। স্টকহল্‌মে যেখানে বার্গম্যানের পুরনো অফিস ছিল, অনেক পরে, সেখানে তারকোভস্কিরও একটি অফিস হয়। আসলে বার্গম্যান নির্জনতাপ্রিয় পরিচালক। প্রতি বছর, ফারো দ্বীপে তাঁর জন্মদিনে মিলিত হতো পুরো বার্গম্যানের সিনেমা, নাটক, গল্প, চিত্রনাট্য, দর্শন, জীবনবোধ— সব কিছু নিয়ে আদ্যোপান্ত চর্চা করার পরেও ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক মিচিকো কাকুতানি এই চলচ্চিত্র পরিচালকের সঙ্গে স্বশরীরে দেখা করার ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৮৩ সাল, তখন বার্গম্যানের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীতে। নির্জনতাপ্রিয় সেই মানুষটি  চট করে কাউকে বাড়ির অন্দরমহলে ডেকে নিতেন না। কিন্তু মিচিকোকে তাঁর এতটাই পছন্দ হয়েছিল, হাসতে হাসতে তাঁর কলেজ জীবনের অদ্ভুত এক প্রেমের কথাও বলে ফেলেছিলেন। কলেজ জীবনের এক সুইডিশ তরুণীকে বন্ধুমহলের সবাই পছন্দ করে ফেলেছিলো।

তাকে প্রেম নিবেদনও করেছিল বন্ধুরা। বার্গম্যানও। কিন্তু সবার মতো তিনিও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তরুণী জানিয়েছিলেন, তাঁর স্বপ্নের পুরুষ ছিলো কোনও এক মিশরীয় রাজপুত্র। বার্গম্যানের সঙ্গে আর দেখা হয়নি সেই তরুণীর। কিন্তু মিশরীয় রাজপুত্র যে একটা অলীক প্রতীক মাত্র সেটা বার্গম্যানের বুঝতে দেরী হয়নি। এই ধরনের প্রতীকের ব্যবহার তিনি ছবিগুলোতে বারবার এনেছেন। সেখানে বাদ যায়নি প্রেমের বিভিন্নতা, ধর্মীয় সংশয় ও সঙ্কট, জীবন, মৃত্যুও। ‘দ্য সেভেন্‌থ সিল’ ছবিতে প্লেগ আক্রান্ত শহরের পটভূমিতে তিনিই পেরেছিলেন জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর দাবা খেলার দৃশ্য তৈরি করতে। এই ধরনের দৃশ্য মহাকাব্যিক—সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে অপু-দুর্গার কাশফুলের সারি ডিঙিয়ে রেলগাড়ি দেখার দৃশ্যের মতো।

গত ১৪ জুলাই সারা পৃথিবী জুড়ে হয়েছে বার্গম্যান শতবর্ষ উদ্‌যাপন উৎসব। ‘বার্গম্যান ফাউন্ডেশন’ এক অভিনব কাজ করেছে এই সময়ে। তারা বার্গম্যানের হাতের লেখার ফন্ট উদ্ভাবন করেছে।  সেই ফন্টে যে কেউ লিখতে পারে গান-গল্প-কবিতা। বার্গম্যান শতবর্ষ উদ্‌যাপিত হচ্ছে বেশ কিছু জায়গায়— সুরে, ছন্দে। যেখানে বাখ, মোৎজ়ার্ট বা শপ্যাঁর সিম্ফনি মনে করিয়ে দেবে শতবর্ষের বার্গম্যানকে। সঙ্গে ছবি তো আছেই। গোটা বছর ধরে চলবে এই উৎসব। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ছবি-উৎসব, অসলো থেকে বার্লিন, প্যারিস থেকে আমস্টারডাম— সব জায়গাতেই অনুষ্ঠিত হবে বার্গম্যান রেট্রোস্পেকটিভ, সেমিনার, চলচ্চিত্র-চর্চা।

১৯৩৪-এর নাৎসি জার্মানিতে তিনি বেশ কিছু দিন এক পাদ্রির সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ষোল। এক পাদ্রির সঙ্গে নাৎসিদের কয়েকটি সভাতেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বহু পরে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ছবি দেখার পর বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনৈতিক নরক কতটা ভয়ঙ্কর। দীর্ঘ দিন রাজনীতি সংক্রান্ত বইপত্র থেকে দূরে কাটিয়েছেন। এই ধরনের টুকরো বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল যেন ম্যাজিক লণ্ঠনের মতোই— অন্ধকার ঘরে দেওয়ালে বিচ্ছুরিত সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ, দেখা না-দেখা কল্পলোকের কোলাজ, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিসত্তার সিনেম্যাটিক বহিঃপ্রকাশ। নিজের সিনেমার ভেতর দিয়ে তাই এই পরিচালক যেন সুন্দরকেই ভালোবাসতে বলেছেন বারবার। ‘দ্য সাইলেন্স’, ‘অটাম সোনাটা’, ‘দ্য সেভেন্‌থ সিল’, ‘দ্য ভার্জিন স্প্রিং’, ‘ফ্যানি অ্যান্ড আলেকজ়ান্ডার’, ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ়’— তাঁর মহামূল্যবান ছবিগুলি সুন্দরেরই উদ্‌যাপন।

বার্গম্যান একবার বলেছিলেন, ‘‘আমাকে যদি অন্ধত্ব আর বধিরতার মধ্যে কোনও একটিকে পছন্দ করতে হয়, আমি শ্রবণ মাধ্যমটাই পছন্দ করবো। সঙ্গীত ছাড়া আমি কিছু ভাববো— এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা যেন আমার জীবনে না আসে!’’

১৯৯৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের সম্মান-প্রদান মঞ্চে বার্গম্যান উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাঁর মেয়ে লিন উলম্যান বাবার পাঠানো বার্তা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন—‘‘বছরের পর বছর ধরে জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে ইমেজ নিয়ে খেলা করার পর জীবন আমার কাছে ধরা দিয়েছে—আমাকে সঙ্কুচিত করেছে, নীরব করেছে। সম্মান দিয়েছে। নম্রতা শিখিয়েছে। আপনাদের ধন্যবাদ।’’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ পোস্ট

ছবিঃ গুগল