যতদূর থাকো ফের দেখা হবে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড. সেলিম জাহান

কবি আবুল হাসানের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি! আবাসিক হলের লন্ড্রি থেকে পাওয়া নিউজপ্রিন্টের ওপর কবিতা লিখতে পছন্দ করতেন আবুল হাসান, গোসলের সময় প্রায়্শই তোয়ালে নিতে ভুলে যেতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদা বিখ্যাত শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে আড্ডা দিতেন তুমুল। ছাত্র জীবনে আবুল হাসানের সান্নিধ্যে আসা এবং তার কিছু অদ্ভুত স্মৃতি ড. সেলিম জাহান তার নিজস্ব ফেইসবুক ওয়ালে লিখেছেন। প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আরেকটু বিশদ লেখা ছাপার আগ্রহ প্রকাশ করলে সেলিম জাহান তার লেখাটি আরেকটু পরিবর্ধন করে আমাদের পাঠিয়ে দেন। তবে এরই মাঝে একটি জাতীয় দৈনিক  তার ফেইসবুক ওয়াল থেকে  আগের লেখাটি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছে  ।

প্রাণের বাংলার  প্রচ্ছদ আয়োজনে এবার রইলো আবুল হাসানকে নিয়ে ড:সেলিম জাহানের লেখা ‘যতদূর থাকো ফের দেখা হবে’।

না, তাঁর সঙ্গে আমার সখ্য ছিলো না – হবার কথাও নয়। বয়সের তেমন তারতম্য খুব একটা অবশ্য ছিলো না।বছর পাঁচেকের বড় তিনি। দু’জনেই ছাত্র ছিলাম বরিশাল বি.এম. কলেজের।দু’জনেই ঢাকায় সলিমুল্লাহ হলে থাকতাম। বেশ কিছু বন্ধু ছিলো তাঁর, যাঁদের সঙ্গে সখ্য ছিলো আমারও। এতসব বিষয় অভিন্ন হলে সখ্য হবার একটা সম্ভাবনা থেকে যায় বই কী।কিন্তু তা হয় নি আমাদের দু’জনের মধ্যে, কারন দূরত্ব ছিলো মূল জায়গায় – তাঁর আর আমার জগত আলাদা। তবু হৃদ্যতা ছিলো কবি আবুল হাসান আর আমার মধ্যে। ৪ঠা আগষ্ট হাসান ভাইয়ের জন্মদিন গেলো। জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালে। বেঁচে থাকলে তিনি সত্তুর পেরিয়ে যেতেন। ভাবা যায়? আমার মনে তাঁর তরুণ অবয়বটিই স্হির হয়ে আছে। আমরা সময়ের রেখা ধরে বয়সী হয়েছি, কিন্তু হাসান ভাই সেই ২৯ বছরের যুবকই রয়ে গেলেন।

পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন ফরিদপুরের বর্ণি গ্রামে মাতুলালয়ে। ডাকনাম ছিল ‘টুকু’। পিতৃদত্ত নাম ‘আবুল হোসেন মিয়া’। শোনা যায় প্রয়াত কবি রফিক আজাদের পরামর্শে পোশাকী নাম ঝেড়ে ফেলে তিনি হয়ে গেলেন ‘আবুল হাসান’, যেমনি তাঁর ‘উন্মুল যৌবনের’ কবি বন্ধু ‘নির্মলেন্দু গুণ চৌধুরী’ হয়ে গেলেন ‘নির্মলেন্দু গুণ’।

কত ছোট খাটো কথা মনে পড়ে। যদ্দূর মনে পড়ে সলিমুল্লাহ হলে তাঁর কক্ষ নম্বর ছিল ১২৫। হলের একেবারে সামনের দিকের অংশে। সেখান থেকে স্নান করার জন্যে দীর্ঘ বারান্দা ধরে হেঁটে হলের মাঝামাঝি জায়গায় আমার ৩৩ নম্বর কক্ষের সামনে দিয়ে স্নানাগারে যেতে হতো। প্রায়শই হাসান ভাই তোয়ালে নিতে ভুলে যেতেন। আমার ঘর থেকে তোয়ালে নিয়ে স্নান সেরে তাঁর কোঁকড়া চুল মুছতে মুছতে আমার ঘরে আসতেন। হাত বাড়িয়ে বলতেন ‘দিন’। বিনা বাক্যব্যয়ে তুলে দিতাম তাঁর হাতে। না, তেমন কোন মহার্ঘ বস্তু নয় – সেরেফ ক’টি নিউজ প্রিন্টের পাতা। ধোবীখানা থেকে আমাদের জামা-প্যান্ট ধুয়ে এসে তার ভাঁজে ভাঁজে দস্তরখানের মতো নিউজপ্রিন্টের পরত পুরে দে’য়া হতো। সে’গুলোতে ডট্ কলম দিয়ে কবিতা লিখতে বেশ মজা পেতেন হাসান ভাই। হয়তো তাঁর অনেক নামী-দামী কবিতা আমার কাগজের নামাবলী পরেই জন্মলাভ করেছে…কে জানে?

আর একবার তিনি খাবার ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন।আমিও সেখানে যাবার জন্যে কক্ষে তালা লাগাচ্ছিলাম। বসন্ত কালের দুপুর সেটা, ভারী সুন্দর একটা মৃদুমন্দ বাতাস। আমাকে দেখেই তাঁর একগাল হাসি। দাঁড়ালেন এক লহমা – এক সঙ্গে যাওয়া যাবে। আর তখনই তাঁর চোখ গেল সলিমুল্লাহ হলের মনোমুগ্ধকর লনের দিকে।কার্পেটের মতো নরম ঘাস, সুন্দর করে ছাঁটা গন্ধরাজ আর কামিনী গাছের ঝাড়। নানান স্তম্ভের গা বেয়ে ওঠা মালতী আর জুঁই লতা।

একাগ্র দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনি ঘোর লাগা এক মানুষের মতো উচ্চারণ করলেন ‘সবুজ বাতাস’। তারপর সেই ঘোর লাগা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখলেন, কি সুন্দর সবুজ বাতাস’? আমি তাকালাম লনের দিকে, ঝাড়ের দিকে, লতার দিকে। বাতাস বইছে, বুঝতে পারছি, কিন্তু সবুজের কিছু দেখলাম না। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বললাম, ‘কোথায়’? হাসান ভাইয়ের ঘোর কেটে গেলো। তিনি হেসে বললেন, ‘আপনি কবি হতে পারবেন না। চলেন, খেতে চলেন’। আমরা পা বাড়ালাম। আমার সম্পর্কে হাসান ভাইয়ের ভবিষ্যতবানী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে – কবিরা তো ভবিষ্যতদ্রষ্টা-ই হয়।

এক হলে থাকলেও হলে নয়, হাসান ভাইয়ের সঙ্গে বেশীর ভাগ সময়েই দেখা হতো আমাদের তীর্থস্হান – শরীফ মিয়ার ক্যন্টিনে। আমাদের হৃদ্যতার ঘনীভবনও সেখানেই। একদিন খাঁ খাঁ গরমের মধ্যে সেথায় গেছি। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। এক গেলাশ জল চাইলাম রমজান ভাইয়ের কাছে। দেখি এক টেবিলে হাসান ভাই শরীফ মিয়ার সেই বিখ্যাত এক টাকা দামের পুরো-প্লেট বিরিয়ানী খাচ্ছেন। কোনার এক টেবিলে শাহনূর খান, সাজ্জাদ কাদির, রফিক নওশাদ এবং আরো ক’জ্ন মিলে জোর আড্ডা দিচ্ছে। আমাকে দেখে হাসান ভাই বললেন, ‘কি, খাবেন না?’ ঠোঁট উল্টে বললাম , ‘পয়সা নেই’। আমাদের কথাবার্তা শরীফ মিয়ার কানে গেছে। ‘আমনে খামাখাই খালি প্যাঁচাল পারেন।পয়সার কতা ক্যাডা জিগাইছে আমনেরে?’ ধমকে উঠলেন শরীফ ভাই। ‘বিরতর্ক ( শরীফ মিয়া বিতর্ক বলতে পারতেন না) কইরা কইরা প্যাঁচাল পারেনের অইভ্যাস হইছে আমনের’ – ভারী বিরক্ত তিনি আমার ওপর।’এই রমজাইন্না, একডা ফুল পেলেট বিরিয়ানী লামাইয়া দে ছলিম সা’বের ছামনে’- আমার নামটাও শরীফ ভাই ঠিকমতো উচ্চারন করতে পারতেন না। তাকিয়ে দেখি, হাতে জলের গেলাশ তুলতে তুলতে মুচকি মুচকি হাসছেন তিনি। ভাবখানা -‘বেশ হয়েছে’। এতো বছর বাদেও গোঁফের তলায় হাসান ভাইয়ের সে দুষ্টু হাসিটি এখনো দেখতে পাই।

সেই সঙ্গে এখনো শুনতে পাই ঐ কথা ক’টি – ভালো লাগছে একটু এখন?, বহুদূর থেকে কথা ক’টি যেন ভেসে এসেছিলো। আস্তে করে চোখ মেলতে যেন কুয়াশার ভেতর থেকে আবছা একটা মুখ দেখতে পেয়েছিলাম। ঐ এক মুহূর্তে তিনটে জিনিষ ঠাহর করতে পেরেছিলাম – জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, একটা ঘোরের মধ্যে আছি এবং ঐ মুখটি হাসান ভাইয়ের। কত কাল আগের কথা – প্রায় ৫০ বছর, তবু এখনও মনে আছে স্বচ্ছ।

খুব সম্ভবত: ১৯৭০ সালের কথা – কোন এক ঈদে মা-বাবার কাছে যাচ্ছি বরিশালে। সকাল থেকেই গায়ে গায়ে জ্বর ছিলো – কিন্তু মনে হলো কিছু হবে না, সেরে যাবে। বিকেলে সদর ঘাটে গিয়ে যা দেখলাম তাতে মনে হলো, ঐ অবস্হায় সুস্হ লোকেরও জ্বর চলে আসবে। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ, ঠেলাঠেলি, হাতাহাতি – লঞ্চ, স্টিমারে ওঠার জন্যে মরণপণ লড়াই। তার মধ্যেই দেখি হাসান ভাই – আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন। বহুদিন পরে বরিশাল যাচ্ছেন – ছোট বোনটিকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, লাজুক চোখে জানালেন তিনি। হাসান ভাইয়ের লাজুক চোখ ও রাগী মুখ – দুটোর সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিলো আমার। ততক্ষনে আমার জ্বর চড়চড় করে বেড়ে যাচ্ছে। এবং এক পর্যায়ে আমি সংজ্ঞা হারালাম।

তারপরই প্রথম যে কথাটি শুনতে পেলাম, তা হচ্ছে ‘ভালো লাগছে একটু এখন?’ পাতলা-দুবলা হৃদরোগী হাসান ভাই কেমন করে সেই উন্মত্ত জনতার ব্যূহ পেরিয়ে আমাকে স্টিমারে তুলেছিলেন, কেমন করে প্রথম শ্রেনীর খাবার ঘরের একটি বেঞ্চিতে শুইয়ে দিয়েছিলে, কেমন করে সারারাত জেগে থেকে আমার মাথায় জলপট্টি দিয়েছিলেন – তা এখনও আমার কাছে এক রহস্য। শুধু চেতনার কোনো কোণ থেকে নিরন্তর শুনতে পাই ‘ভালো লাগছে একটু এখন?’ ‘যে তুমি হরণ করো’ র কবি আবুল হাসান সে রাতে আমার হৃদয় জয় করেছিলেন, কোন কিছুই তাঁকে হরণ করতে হয়নি।

তাঁর সঙ্গে শেষ দেখার কথাও মনে আছে আমার। অসুস্হ তিনি তখন। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝির একটু পরের কথা। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছি। উচ্চশিক্ষার্থে আমার তখন ক্যানাডা আসার কথাবার্তা হচ্ছে। কথা-বার্তার কোন এক ফাঁকে হাসান ভাই খুব উদাস চোখে বাইরে তাকালেন জানালার শার্সি গলিয়ে। তারপর খুব নরম গলায় বললেন, ‘ওখানকার তুষার কি পূর্ব জার্মানীর মতো?’ আমি একটু হেসে বললম, ‘আমি তো বলতে পারবো না। আমি তো বরফ পড়া দেখি নি’। অনেকক্ষন চুপ করে থাকলেন তিনি। তারপর প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘শুভ্র তুষার বড় সুন্দর, বড় পবিত্র’।

তারপর কতবার তুষারপাত দেখেছি পৃথিবীর কত জয়গায়। কত ভোরে উঠে বাইরে চেয়ে দেখেছি, বরফে বরফে ছেয়ে গেছে চারিদিক। শ্বেতশুভ্র সে বরফ দেখে আমি সেই বরফের মধ্যে হাঁটতে বেরিয়েছি। পায়ের বুটের নীচে বরফ ভাঙ্গার মচমচ শব্দ – কনকনে ঠান্ডা এড়াতে গরম কোটের কলারটা আমি তুলে দিয়েছি, গলার মাফলারটা আরো ভালো করে পেঁচিয়ে নিয়েছি, মাথার টুপিটা নামিয়েছি বেশ কিছুটা। তখনই আমার ঘাড়ের কাছে যেন ফিসফিসানি স্বরে শুনতে পেয়েছি , ‘শুভ্র তুষার বড় সুন্দর, বড় পবিত্র’

মাঝে মাঝেই হাসান ভাইয়ের কবিতার লাইন মনে পডে যায়। ‘ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!’ কিংবা ‘আমি আমার আলো হবার স্বীকৃতি চাই, অন্ধকারের স্বীকৃতি চাই’। কিন্তু সবচেয়ে বেশী মনহয়, ‘যতদূরে থাকো, ফের দেখা হবে, কারণ মানুষ মূলত: বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক’।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]