যতদূর থাকো…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নেলসন অলগ্রেনে’র শিকাগো শহরে তখন সন্ধ্যা। একটু আগেও নেলসন নিজের জন্য রাতের খাবার তৈরি করছিলেন। কিন্তু তাকে বের হতে হয়েছে বাড়ি থেকে। তার লক্ষ্য মনরো স্টেশন পার হয়ে আরেকটু হেঁটে পামার হাউজ হোটেল। তাকে এই হোটেলে টেনে এনেছে একটা টেলিফোন কল।

হোটেলের লবির মেঝে পুরু কার্পেটে মোড়া। দেয়ালগুলোয় মার্বেল লাগানো। ছাদে নানান নকশা। নেলসন গিয়ে বসেন হেটেলের লা পেটিট লাউঞ্জের একটা খালি টেবিলে। সেখানেই ভদ্রমহিলার আসার কথা। অন্তত টেলিফোনে সেরকমই জানিয়েছেন। অপেক্ষার পালা খুব প্রলম্বিত হয় না। একটু পরেই লাউঞ্জে এসে দাঁড়ান টেলিফোনে কথা বলা সেই অজ্ঞাত মহিলা। পাতলা সাদা কোট পরা, গলায় জড়ানো হালকা সবুজ রঙের স্কার্ফ। তার মাথার চুল একটু উঁচু করে বাঁধা। নেলসনের মনে হলো একটু হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ছে সেই আলো আঁধারির সেই লাউঞ্জে। মহিলা কয়েক পা হেঁটে এসে নেলসনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলেন-আমি সিমোন, সিমন দ্য বোভোয়ার। আপনি নিশ্চয়ই নেলসন? পামার হাউজ নামে সেই হোটেলের লাউঞ্জ থেকেই হয়তো সেদিন শুরু হয়েছিলো এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প। জাঁ পল সার্ত্রের এক জীবনের সঙ্গিনী সিমোন দ্য বোভোয়ার আর আমেরিকান ঔপন্যাসিক নেলসন আলগ্রেনের সেই প্রেমের গল্পই পড়তে বসেছি আমরা। সময়টা ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাস।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই ভালোবাসার গল্প ‘যতদূর থাকো’

শিকাগো শহরে দ্রুত নেমে আসা সেই সন্ধ্যায় নেলসন যখন রান্নায় মগ্ন তখন ফোনটা বেজে উঠেছিলো। কাজের মাঝখান থেকে বেশ ঝাঁঝালো গলায়ই রিসিভার তুলে হ্যালো বলেছিলেন নেলসন। তারপর রং নম্বর বলে রিসিভার নামিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন কাজে। কিন্তু ফোন আবারও বেজেছিলো। অপরপ্রান্ত থেকে অপারেটর জানিয়েছিলো, একজন ভদ্রমহিলা কথা বলতে চাইছেন।ফরাসী টানে ভদ্রমহিলার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন নেলসন সেদিন। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে মহিলা বলেছিলেন, তিনি শিকাগো শহরে প্রথমবার এসেছেন। তেমন পরিচিত কেউ নেই এই শহরে, তাই নেলসনের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।

আরও দু’একটা প্রশ্ন করে নেলসন সেই সন্ধ্যায় জেনে নিয়েছিলেন ভেদ্রমহিলার হোটেলের ঠিকানা। জানতে পেরেছিলেন তারই এক বন্ধু ফোন নম্বরটা ফরাসী টানে ইংরেজি বলা মহিলাকে দিয়েছে। তারপর হোটেলের লবিতে নাটকীয় ভাবে দু’জনের দেখা। সেই সন্ধ্যায় সিমনের পরিচয় জানতে পেরে বেশ অবাক হন নেলসন! কারণ তখন লেখালেখি এবং জাঁ পল সার্ত্রের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে সুপরিচিত সিমন দ্য বোভোয়ার।এই হঠাৎ দেখার গল্পটা সেই সন্ধ্যার পরেই অতীত হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তা ঘটেনি। আর সেখান থেকেই দুই সাহিত্যিকের প্রেমে পড়ার গল্পের শুরু।

সেই প্রথম পরিচয়ে দুজনের মাঝে খানিকটা সমস্যার দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ভাষা। নেলসন ফরাসী ভাষা জানতেন না। তার খটমটে ইংরেজি বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো সিমনের। আবার সিমনের ফরাসী টানে ইংরেজি বোঝাটাও একটু কঠিন হচ্ছিলো নেলসনের জন্য। কিন্তু তারপরেও তারা দু’জন কথা চালিয়ে গিয়েছিলেন। সিমন দ্য বোভোয়ার সরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন। ফরাসী দেশের বুর্জুয়া সংস্কৃতির ঘেরাটোপে বেড়ে ওঠা সিমন তখন সার্বক্ষণিক লেখক। সার্ত্রের মতো মানুষ তার প্রেমে মগ্ন। ফেরাসী সরকারের টাকায় আমেরিকা ভ্রমণে আসা সিমন দ্য বোভোয়ারের সঙ্গে শিকাগোর একটি সাধারণ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করা নেলসন আলগ্রেনের এক ধরণের মানসিক দূরত্ব থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তারপরেও দু’জনের অনেক কথার মাঝে সরে গিয়েছিলো দেয়াল। তাঁরা হাঁটতে শুরু করেছিলেন নতুন এক পথে।

সার্ত্রের সঙ্গে সিমন

সিমনের কাছে সেই রাত কথায় কথায় বাড়ে অন্য ধরণের সম্ভাবনা নিয়ে। নেলসন তাকে প্রস্তাব দেন শিকাগো শহরের অন্য জীবন দেখার। হোটেলের লাউঞ্জে অথবা কোনো জ্যাজ মিউজিকের বারে যে জীবন খুঁজে পাওয়া যাবে না। সিমন আনন্দে রাজি হয়ে যান সেই প্রস্তাবে। হোটেল থেকে বের হয়ে দু’জন হাঁটতে শুরু করেন। রাত নেমেছে তখন শিকাগো শহরে। হাঁটতে হাঁটতে ঝরে যেতে থাকে দুজনের কথার বকুল, পাশ কাটিয়ে যেতে থাকে নগরীর পানশালা, ভবন, নিয়নের আলো। নেলসনকে হয়তো কথার ভূতে পেয়েছিলো। শিকাগো শহরের অলিগলির ইতিহাস, বিখ্যাত হে মার্কেটের কাহিনি, সিরিয়াল কিলার প্রসঙ্গ কত কিছু উঠে এসেছিলো সেই ভ্রমণ যাত্রায়। সেই রাতে নেলসন সিমনকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক সস্তা পানশালায়, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ বাজিয়েরা সুর তোলে স্যাক্সোফোনে, নিঃসঙ্গ নারী বসে থাকে একা সময়ের মুখোমুখি কোনো টেবিলে, কেউ নেশায় অস্থির হয়ে নাচতে শুরু করে। নেলসনের পরিচিত সেই পানশালা সেই রাতে সিমনকে জীবনের অন্য ছবি দেখিয়েছিলো। তাকিয়ে দেখতে দেখতে অস্ফুট স্বরে সিমন শুধু বলেছিলেন,‘সুন্দর।’

সিমনের ভালোলাগা দেখে নেলসন তাকে নিয়ে যান আরেকটি পানশালায়। সেখানে শহরের দরিদ্র্র মানুষের ভিড়। সেই পানশালা থেকে সিমন আর হোটেলে ফিরে যাননি। চলে যান নেলসনের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে। সেই রাতেই সিমনের শরীর মিশে যায় বেপরোয়া নেলসনের সঙ্গে।

নেলসনের সঙ্গে সেই রাতের অভিজ্ঞতার পরের দিন সকালটা সিমনের জন্য ছিলো ফ্যাকাশে। সংক্ষিপ্ত বৈঠক, বক্তৃতা আর সামাজিকতায় ডুবে যেতে যেতে সিমন অনুভব করেন শিকাগো শহরে গত রাতটা ছিলো  জন্য এক আশ্চয্য অভিজ্ঞতা। সে রাতের পর তার কাছে দিনের আলোয় উদ্ভাষিত শিকাগো শহরকে মনে হয়েছিলো নকল আর মেকি। সেদিন অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে নেলসনের কাছে যেতে চেয়েছিলেন সিমন। তাই মিথ্যা কথা বলে সব অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছিলেন। উদ্যোক্তাদের জানিয়েছিলেন, তার এক বন্ধু খুব অসুস্থ, তাকে দেখতে যেতে হবে।

মার্কিন সরকারের দেয়া গাড়িতে চড়ে সিমন চলে গিয়েছিলেন নেলসনের ফ্ল্যাটে। নেলসনের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়ি থামতেই লাফিয়ে নেমে সিঁড়ি বেয়ে সোজা উঠে গিয়েছিলেন সিমন। বেল বাজিয়েছিলেন ফ্ল্যাটের দরজায়। নেলসন আশা করেননি সিমন চলে আসবেন। তাই দরজায় সিমনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার সময়ও থমকে গিয়েছিলো সেই ঘরে। তারা প্রেমে পড়েছিলেন একে-অপরের।

সেই সুন্দর আলোমাখা দিনে তাদের দু’জনের সামনে ফুটে উঠেছিলো শিকাগো শহরের পুরনো স্কুল, পানশালা, পুরনো পোলিশ বেকারি যেখানে কেউ কোনোদিন ইংরেজি ভাষায় কথা বলেনি। সন্ধ্যাবেলা নেলসনকে বিদায় বলে সিমন ফিরে গিয়েছিলেন তার হোটেলে। অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থীর ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলো সিমনের সময়। পরদিন তিনি ছেড়ে চলে যাবেন শিকাগো। ট্রেনের কামরায় উঠে তিনি খুলে বসেছিলেন নেলসনের লেখা উপন্যাস ‘দ্য নুন ওয়াইল্ডারনেস’। সে রাতেই সিমন চিঠি লিখেছিলেন নেলসনকে, ‘ঘুমাতে যাওয়ার আগে লিখছি তোমাকে। লিখছি একটি কথা জানানোর জন্য-তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। আমরা কম কথা বলেছি, অনেক ঘুরেছি। তোমার সঙ্গে কাটানো সময়টা আমার মনে থাকবে’।

সিমনের চিঠি যখন খুঁজে পায় নেলসনের ঠিকানা তখন তার বুকের মধ্যে সিমনের জন্য তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতার অনুবাদ ছিলো বুঝি ভালোবাসা। নেলসন দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের প্রেমিকাকেও। মনের মধ্যে তখন ফুটে ওঠা একটিই মুখ-সিমন দ্য বোভোয়ার।

এরপর কয়েক মাস পর দু’জনের দেখা হয়েছিলো আবার নিউইয়র্ক শহরে। কয়েকটা দিন সেখানে তারা কাটিয়েছিলেন ঘনিষ্ট হয়ে। জাঁ পল সার্ত্রে মুছে গিয়েছিলেন সেই দৃশ্য থেকে, সিমনের মন থেকেও হয়তো। নিউইয়র্কেই নেলসন সিমনকে একটা আংটি উপহার দিয়েছিলেন। সেই ফরাসী নারীর বাম হাতের অনামিকায় আংটিটি পরা ছিলো মৃত্যুর সময়ও।

সিমন দ্য বোভোয়ার

নিউইয়র্ক শহর থেকে সিমনের বিমান যখন আকাশে উড়াল দিলো তখন তার হাতে নেলসনের বই, ‘নেভার কাম মর্নিং’। প্রথম পাতায় লেখা ছিলো,

সিমন,

আমি তোমার সঙ্গে এই বইটাকে পাঠালাম

তুমি যেখানে যাবে

বইটাও হয়তো যাবে

প্যারিসের পথে সান্ধ্য আলোয়।

সিমন, আমি এই কবিতাটি সেখানেও পাঠিয়ে দিলাম

আমার একটি অংশ এই কবিতা

তোমার সাথে সাথে পথ চলবে।

প্লেনের ভেতরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সিমন। শেষ চিঠিতে নেলসনকে লিখেছিলেন, ‘আমার ভেতরে তোমাকে আমি অনুভব করি। আমি তোমাকে ভালোবাসি’।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ লিটারেরি হাব
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box