যদি নির্বাসন দাও

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো…

নির্বাসন কাকে বলে? যখন কেউ মন থেকে, স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চায় কাউকে? নির্বাসন মানে আর কোথাও ছায়া পড়বে না, আর দেখতে পাওয়া যাবে না প্রিয় মুখ, শোনা যাবে না প্রিয় গান, যাওয়া যাবে না প্রিয় মানচিত্রে?কারা নির্বাসিত করে মানুষকে? কেন করে?পৃথিবীতে নির্বাসনের রায় নতুন কিছু নয়। বিপ্লবীকে নির্বাসনে পাঠিয়ে মাটি চাপা দিতে চাওয়া হয়েছে বিপ্লবকে। সাহিত্যিকদের নির্বাসনে পাঠিয়ে কন্ঠরুদ্ধ করতে চাওয়া হয়েছে সত্যি কথার। মেরে ফেলতে চাওয়া হয়েছে কিছু স্বপ্নকে চিরকালের জন্য। কিন্তু তারপর? দূরে গিয়ে মৃত্যু ঘটেছিলো তাদের সব স্বপ্নের, সব লেখার, সব আশার? দান্তে, অস্কার ওয়াইল্ড, পাবলো নেরুদা, আলেকজান্ডার সোলঝানেৎসিন, ভিক্টর হিউগো, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, মাথায় নিয়েছিলেন নির্বাসনের দন্ড। বিতাড়িত হয়েছিলেন নিজবাসভূম থেকে। এই বাংলাদেশ থেকেও নির্বাসিত আজও কবি দাউদ হায়দার আর তসলিমা নাসরীন। নির্বাসন তাদের কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ভিন্ন জলবায়ু, ভিন্ন মানচিত্রে দাঁড়িয়েও তারা লিখেছেন, মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন।ধর্ম আর রাজনীতির কাঁধে ভর করে স্বৈরাচারী শাসক, ধর্মীয় নেতা আর সমাজ অভিযোগের আঙুল তুলেছে লেখকের দিকে। তাদের আক্রমণ করেছে, বিতাড়িত করেছে তারই স্বদেশ থেকে।  

প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেইসব নির্বাসিত লেখকদের নিয়ে ‘যদি নির্বাসন দাও…’।

রোমান সাম্রাজ্যের সমর্থক হিসেবে দান্তেকে ফ্লোরেন্স ছাড়তে হয়েছিলো। পরবর্তী ২০ বছর তিনি ছিলেন গৃহচ্যুত। আর তখনই তিনি লিখেছিলেন তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত দাঁর অমূল্য কাব্য, ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’। কবি দান্তে তাঁর জীবদ্দশায় আর কখনোই ফ্লোরেন্সে ফিরে আসতে পারেননি।

সম্রাট নেপোলিয়ানের বিরোধিতা করাই ছিলো ফরাসী সাহিত্যিক ভিক্টর হুগোর অপরাধ। তাই তাকে দেশ থেকে নির্বাসন দেয়া হয়। হুগো চলে যান বেলজিয়ামে। সেখান থেকে এক বন্ধুকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘‘নির্বাসন দিয়ে আমাকে শুধু ফ্রান্স থেকেই বিচ্ছিন্ন করা হয়নি, পৃথিবী থেকেই যেন পৃথক করে দেয়া হয়েছে’’। নির্বাসিত হুগো সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘লে মিজারেবল’ এবং টয়লার্স অফ দ্য সি’ উপন্যাসের লেখা অংশ। উপন্যাস দুটি নির্বাসনে থেকেই শেষ করেন তিনি।

পাবলো নেরুদার নির্বাসিত জীবনের গল্পে মেক্সিকো একটি বড় অংশ হয়ে আছে। তিনি চিলি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন মার্কসবাদ সমর্থন করেন বলে। বলা যায়, এক ধরণের স্বেচ্ছা নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন কবি মেক্সিকোতে। সেখানে বসবাসের সময় তিনি একটি কবিতার বই এবং ১৫,০০০ লাইনে ‘হিস্ট্রি অব হিস্পানিক আমেরিকা’ বইটি রচনা করেন।১৯৭১ সালে দেশে ফিরে আসেন নেরুদা। নোবেল পুরস্কার তখন তার গলায় ঝুলছে। তখন চিলির ক্ষমতায় বসেছে মার্কসবাদী সরকার। প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের খুব কাছের মানুষ ছিলেন পাবলো নেরুদা। কিন্তু এই নৈকট্টই তাঁকে দ্বিতীয়বার দেশছাড়া করলো। ১৯৭৩ সালে মার্কিন ষড়যন্ত্রে রক্তাক্ত সেনা অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে খুন হলেন আলেন্দে। ক্ষমতায় বসলো স্বৈরাচারী পিনোশেট সরকার।চিলিতে মেক্সিকো এবং সুইডেনের রাষ্ট্রদূতরা নেরুদা ও তাঁর স্ত্রীকে তাদের দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানান।ওই টালমাটাল সময়ে নেরুদার বাড়ি তল্লাশী করতে আসা সেনাদের নেরুদা বলেছিলেন, ‘‘খুঁজে দেখ, এখানে কবিতা ছাড়া তোমাদের ভয় পাওয়ার মতো আর কিছু নেই’’।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড নির্বাসিত হয়েছিলেন ভিয়েনা থেকে। ঠিক নির্বাসন নয়, বলা যায়, হিটলারের নাজি বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি পালিয়ে চলে গিয়েছিলেন লন্ডনে। সময়টা ১৯৩৮ সাল। ৮২ বছর বয়ষ্ক ফ্রয়েড লন্ডনে বসে অসমাপ্ত ‘অ্যান আউটলাইন অফ সাইকো-অ্যানালাইসিস’-এর কাজ গোছানো শুরু করেন। ভিয়েনায় থাকার সময় তিনি বইটি লিখতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বইটির প্রায় তিন চতুর্থাংশ কাজ গুছিয়ে ফেলেন। কিন্তু শেষ দৃশ্যে এসে তাঁকে আটকে দেয় ক্যান্সার। এই প্রাণঘাতী রোগে ভুগছিলেন ফ্রয়েড। কাজ শেষ হলো না। সব ফেলে চলে গেলেন পরপারে। তার মৃত্যুর এক বছর পর ১৯৩৯ সালে বইটি ওই অবস্থায়ই প্রকাশিত হয়।

অস্কার ওয়াইল্ডের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানান কাহিনি। হোমোসেক্সুয়্যালিটি আর উশৃংখলতার অভিযোগ মাথায় নিয়ে আয়ারল্যান্ড ছাড়তে বাধ্য হন ওয়াইল্ড। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন ‘পিকচার অফ দ্য ডরিয়ান গ্রে’ উপন্যাসের লেখক। ছদ্মনাম নিয়ে বেশ অনেকদিন বাঁচতে হয়েছিলো এই নাট্যকার ও ঔপন্যাসিককে। তখন সাহিত্য নিয়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে অস্কার ওয়াইল্ডের মন। শুধু কতোটা বিরক্তি মনের মধ্যে জমা হয়েছে তা বোঝার জন্য আরও কয়েক বছর লেখালেখি চালিয়ে যান তিনি। নির্বাসিত হবার পাঁচ বছর পর ওয়াইল্ডের মৃত্যু হয়।

লেখালেখির জন্যেই ইংল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হয়েছিলেন ডি. এইচ লরেন্স।যতদিন বেঁচে ছিলেন আর দেশে ফিরে আসতে পারেননি এই লেখক। বাকি জীবন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন আর নিরন্তর লিখে গেছেন। নির্বাসিত জীবনে ‘লেডী চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাসটি লিখে অশ্লীলতার অভিযোগে ব্যাপক ভাবে সমালোচিত হয়েছিলেন লরেন্স।

টমাস মান দণ্ড পেয়েছিলেন জাতীয় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে খোলামেলা কথা বলে এবং হিটলারের নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে লিখে প্রতিবাদ করায়। ওই সময়ে সুইজারল্যান্ডে অবকাশ ভ্রমণে যান টমাস মান। সেখানে বসেই পান ছেলের টেলিগ্রাম। ছেলে জানায়, স্বদেশ ভূমি জার্মানী আর তাঁর জন্য নিরাপদ নয়। ওই সময়ে তিনি জার্মানীর নাগরিকত্বও হারান। অবশ্য ১৯৩৬ সালে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।

আমেরিকার নিউ ইংল্যান্ডের ছোট্ট একশহর অথবা গ্রাম ভেরমন্ট। আর এখানেই নির্বাসিত জীবনের কুড়ি বছর কাটিয়েছেন তৎকালীন সোভিয়েত রুশ ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার সোলঝানেৎসিন। বলশেভিক বিপ্লবের এক বছর পর ১৯১৮ সালে সোলঝানেৎসিনের জন্ম। স্তালিনের শাসনামলে লেখায় কমিউনিস্ট সরকারের নীতির সমালোচনা করে গ্রেপ্তার হন তিনি। তাঁকে আট বছরের নির্বাসন দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় কাজাকিস্তানে। স্তালিন যুগের অবসান হলে আবার দেশে ফেরেন সোলঝেনেৎসিন। তখন তাকে লেখা প্রকাশের অনুমতিও দেন তৎকালীন সোভিয়েত সরকার। ওই সময়ে সোলঝেনেৎসিনের লেখা পৃথিবীখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ান ডে ইন দ্য লাইফ অফ ইভান দোনিসোভিচ’ প্রকাশিত হয়। সেই উপন্যাসটি ছিলো রুশ সরকারের বন্দী শিবিরের নির্মম জীবন নিয়ে লেখা।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সোভিয়েত সরকারের সমালোচনা করার কারণে সোলঝেনেৎসিনের জীবন আবারও শাসকদের রক্তচক্ষু দেখে। ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও এই সাহিত্যিক পুরস্কার আনতে যেতে পারেননি। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন একবার দেশ ছেড়ে গেলে সরকার তাকে আর ফিরে আসতে দেবে না। ১৯৭১ সালে রুশ গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা তাঁকে খুন করার জন্য হামলাও চালায়। কোনোক্রমে বেঁচে যান সোলঝেনেৎসিন। শেষে সোলঝেনেৎসিনের জন্য অপেক্ষা করছিলো নির্বাসন। ১৯৭৪ সালে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। অনেক দেশ ঘুরে শেষে জীবনের শেষ পর্বে এই সাহিত্যিক পরবাসী হন ভেরমন্টে। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যাবার পর তিনি আবার দেশে ফেরার অনুমতি পান। ২০০৮ সালে মস্কোতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ বুকস টেল ইউ হোয়াই, মেন্টাল ফ্লস, হিউম্যানিটিজ
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box