যাবোই যাবো সেন্টমার্টিন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাজনীন হাসান চুমকি

চার.

তৃতীয় বারের সেন্ট মার্টিন যাত্রা এ যাবৎকাল যত জায়গা ঘুরেছি তার মধ্যে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সেই স্মরণীয় অভিজ্ঞতা কি..? লিখতে লিখতে বলি। এবারও আমরা তিন কাপল ও এক ব্যাচেলর এবং নো শিশু সেন্ট মার্টিন রওনা করলাম। তৃতীয় বার ঘুরতে যাবার আগে আমার বর আমাকে ছাড়াই একা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে এসেছে এবং তারা নেভাল রেস্ট হাউসে ছিলো, সারা রাত নাকি ছাদেই কাটিয়েছে সকলে। তাই আমাদের এবারের প্ল্যান “নেভাল রেস্ট হাউস-এ” থাকা। নেভীতে জব করা এক বন্ধুর সুবাদে আমার বর দু’রাত থাকার পারমিশান বের করলো। প্রথম রাত আমরা সেই পুরোনো হোটেল-টাতেই বুকিং করে রাখলাম। এবং এবার আমরা কক্সবাজার নেমে আগে থেকে বুক করে রাখা মাইক্রো নিয়ে সোজা টেকনাফ পর্যটন রেস্ট হাউস উঠলাম।

আহ নাফ নদী। কী যে অপরূপ। নাফ নদীর নীল স্থির পানির দিকে যার তাকিয়ে থাকার সুযোগ হয়েছে তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন আমার এই “আহ” বলার কারণ। পর্যটন রেস্ট হাউস-টাও থাকার জন্যে দারুণ (এখন অবশ্য জানিনা অবস্থা কি) আমার পূর্ব এবং ঐ যাত্রার অভিজ্ঞতা থেকেই লিখছি।

পরদিন সেন্ট মার্টিন যাত্রা। ওহ বাবা, এ তো সেন্ট মার্টিন নয়, রীতিমতো কোন গ্রামের হাট। কী ভিড়..!! কত দোকান..!! কত মানুষ..!! সত্যি ভয় পেয়েছিলাম। কোথায় এলাম..!! নীরবতা দূরে থাক এ তো মানুষের বাজার। তার উপর কেউ ডানে বায়ে তাকাচ্ছে না, নিজের মতো মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সবাই।

দ্রুত পায়ে হেঁটে হোটেলে চেক ইন করে খাবারের অর্ডার করলাম, বাইরের হোটেলে গিয়ে খাওয়ার ইচ্ছেটাও ছিলো না আমাদের কারো। বিকেল পর্যন্ত রুমে থেকে সন্ধ্যার পর বের হলাম আমরা। আবারও শান্ত। কিন্তু দোকান বেশী হওয়ায় জেনারেটর আওয়াজ রীতিমতো পরিবেশ দূষণ করে তুললো। আমাদের হোটেল-টাতেও জেনারেটর চালু হয়েছে। এই বিষয়টা আমি বুঝিনা একদম সাগরের পাড়ে দোকান, হোটেলগুলোতেও কেন জেনারেটর..!! আর আমরা পর্যটক হিসেবেই বা কেমন..?? যদি ইলেকট্রিসিটি ছাড়া থাকতে কষ্ট হয় তবে সে জায়গায় রাতে থাকার দরকার কি আমাদের..!! ফিরতি জাহাজে ফিরে আসলেই তো হয়.. আর সরকারই বা কেন অনুমতি দেয় বুঝি না..

যাকগে, ভাল লাগছিলো না। জেনারেটরের শব্দ শুধু না, হোটেলটাতে একটা বড় সংখ্যক গেস্ট একসঙ্গে এসেছিলেন। তারা সামুদ্রিক মাছ গ্রীল করার উৎসবের পাশাপাশি শিশু-বৃদ্ধ পর্যন্ত সাইন্ড বক্স এবং মাইক্রোফোন নিয়ে বেসুরো সঙ্গীত গাইতে লাগলো। এক পর্যায়ে আমরা হতবাক এবং নির্বাক দর্শক হয়ে তাদের উল্লাস দেখতে লাগলাম। আর মনে মনে প্রার্থনা করলাম “রাত পার হলে বাঁচি”

সাধের সকাল হতেই দুঃসংবাদ। নেভীর কোন এক বিগ বস আসবেন সুতরাং আমাদের পারমিশান ক্যান্সেল। এদিকে হোটেলেও ছাড়তে হবে কারণ অন্যরা অগ্রীম বুকিং দিয়ে রেখেছে। অগত্যা শুরু হলো “হোটেল অভিযান” । অনেক সময় পার করে দ্রুত পায়ে তিন পুরুষ এসে আমাদের তিন নারীকে নিয়ে চললো নতুন হোটেলে, টিনের ঘরের হোটেল সমুদ্র পাড় ঘেঁষা না। কিন্তু রুমে ঢুকতেই ক্লাইমেক্স শুরু হয়ে গেলো। রুমে বিছানা, চাদরের যা তা অবস্থা, সঙ্গের টয়লেট ভয়ঙ্কর, পরিস্কার না করলে জীবনেও আর ঢুকতে পারবো না। যখন কান্নাকাটি করার অবস্থা হলো বাকি দুই নারীর তখন জানতে পারলাম “ইহা একটি স্কুল”(যার কোন নাম বা হোল্ডিং কিছুই দেখতে পায়নি আমরা) যে স্কুলটা সেন্টমার্টিনে টুরিস্ট আসার সময় হলে বন্ধ হয়ে যায় এবং এভাবে হোটেল হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়।

কিচ্ছু করার নাই, থাকতে হবে। কোথাও না গিয়ে এবং কোন সহকারী মানে ঐ হোটেল নামক স্কুলের কাউকে না পেয়ে আমরা তিন বউ তিন রুম এবং তিন বাথরুম পরিস্কারে দিন পার করলাম। বিকেলের দিকে রুম থেকে বের হতেই দেখি, আমাদের পাশের রুমে ব্যাকপ্যাকসহ তিন ফরেনার নারী উঠলো। তা দেখে আমরা যারপর নাই অবাক, যে ময়লা থাকবে কিভাবে..!! আমাদের আলোচনার শেষ বক্তব্য ছিল “ওরা পারে, আমরা পারি না..” কিছুক্ষণ পর ঐ তিন নারীর সঙ্গে দেখা করতে আসলো দুই ইয়াং ছেলে এবং মেয়েগুলো বেশী না একটু হাই হ্যালো করে তাদেরকে বিদায় দিলো। আমরা ছিলাম, চরম ক্ষুধার্ত। বের হয়ে  কয়েকটা ক্লিন করা মাছ, কিছু মশলা, প্লাস্টিকের গামলা, গোটা কতক প্লেট আর ব্রেড কিনে হোটেল মানে স্কুলের ঘরের পাশেই আগুন ধরিয়ে (সমুদ্র থেকে বেশ দূরে আমাদের অবস্থান থাকার কারণে) বনভোজন স্টাইলে ফিশ গ্রীল করে ব্রেড দিতে খেয়ে এটা ওটা বলে হো হো করে হাসতে না হাসতেই আমার শুরু হলো ভয়াবহ মাইগ্রেন পেইন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই চুপ। যে যার রুমে ঢুকে গেলাম।

এই মাথাগোঁজা ঠাঁইয়ে জেনারেটর ছিলো না। ছিলো হারিকেন বাত্তি। এবং টিনের ঘর হওয়াতে রাতে যথেষ্ট ঠাণ্ডাও লাগে। ঠাণ্ডা রাত, নীরবতার কারণে দূর থেকে লোকাল বাদ্যযন্ত্রের শব্দসহ বাউল গান ভেসে আসছিলো। অস্থির হয়ে আমার বর মাইগ্রেন পেইনের বউকে ঘুমাতে বলে আর কাউকে সাথী হিসেবে না পেয়ে ব্যাচলর বন্ধুকে নিয়ে রওনা করে, উদ্দেশ্যে, বাউল গানের আসর খুঁজে বের করা।

হায় হায় আমার আর ঘুম আসে না। আচমকা খসখস শব্দ, শরীর অবশ হতে শুরু করে, কারণ, কেউ বা কারা রুমের দরজা কেটে ভিতরে ঢুকে পড়বে যে কোন সময়। মরিয়া হয়ে কল করতে শুরু করলাম আমার বরকে, ভয়ে কণ্ঠ দিয়ে চিৎকার বের হয় না। নীরবতাকে তছনছ করে দেয় আমাদের এক ভাবী আর ভাইয়ের চিৎকার। ওদের চিৎকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমিও চিৎকার করতে থাকি। মনে হয় তিন মিনিট মতো আমরা চিৎকার করার পর আরেক বন্ধু ছুটে আসে “কি হয়েছে..??” “টিনের চাল থেকে ইঁদুর লাফ দিয়ে পড়েছে ওদের গায়ের উপর” এবার নিশ্চয়ই বুঝলেন পাঠক “খস খস” শব্দের আসল রহস্য। আসলে পরিবেশ এবং দুর্বল মুহূর্তে মানুষের মনে সুন্দরের থেকে ভয়াবহ চিন্তাই বেশী আসে, যেমনটা আমার ব্রেইনে কাজ করছিলো।

আমরা এমন হাসি হাসতে পারি..!! একটু আগে চিৎকার করলাম তারপরই হাসি। মাইগ্রেনের কারণে আমি হেসেও শান্তি পাই না। ফলে, আবার সব রুমের দরজা বন্ধ, নীরবতা।

শুরু হয় আরেক ক্লাইমেক্স। এবার কোন গায়েবী আওয়াজ টাওয়াজ না ডাইরেক্ট দরজায় নক। লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসি। ভয়ে গো গো আওয়াজ শুরু হয় কণ্ঠে। আবারও নক তবে ভদ্রস্থ নয়, রীতিমতো থাবড়া দেয়া গুম গুম শব্দ। অনেক কষ্টে “কে” বলতে যাব সেই সময় শুনি পুরুষ কণ্ঠ এবং সে ডাকছে আমাকে নয় পাশের রুমের ফরেনার মেয়েদের একজনের নাম ধরে। বুঝলাম, পাশের দরজায় নক করার শব্দে ভুল ভেবেছি আমার দরজায় নক করছে। যাহোক, ওদের দরজায় ননস্টপ বাড়ি দিতে থাকলো ছেলেগুলো (পরে বুঝলাম দুইজন ছেলে এসেছে) এবং মেয়েগুলোকে প্রথমে ভদ্রস্থ ভাবে পরে উগ্রভাবে ডাকতে শুরু করলো। মেয়েগুলো “লীভ আস প্লিজ” “ডোন্ট ডিস্টার্ব প্লিজ” “উই উইল টক টুমোরো” এমন ছোট ছোট উত্তর দিতে থাকলো তবু শয়তানদের শয়তানি থামে না, তারা এক পর্যায়ে দরজা ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়।

আমার মাইগ্রেনের ব্যথার থেকে তখন ভয়ে আতঙ্কে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার উপক্রম। ননস্টপ আমি আমার বর আর তার বন্ধুকে কল করা শুরু করেছি। এর মধ্যে টের পেলাম, আমাদের বাকি দুই ভাই রুম থেকে বের হয়ে ছেলেগুলোর সঙ্গে খুবই স্বাভাবিক স্বরে কথা বলা শুরু করেছে “বাদ দেন ভাই ওরা আর বের হবে না” ছেলেগুলো ক্ষেপে গিয়ে বলে “বের হবে না মানে বিকেলে তো দাঁত কেঁলিয়ে কথা বললো” “ওহ আপনাদের ফ্রেণ্ডশিপ ছিলো..?” “না, এই তো বিকেলে পরিচয়” “বোঝেন না ফরেনার তো এদের কাছে এইটা কোন বিষয় আর এখন দরজা খোলে না” আচমকা আবার দরজা ধ্বাক্কায় “ঐ খোল” মেয়েগুলো এবার চুপ, কেননা, বাইরে অন্য পুরুষদের কণ্ঠস্বরে সহায় ভেবেছিলো সম্ভবত। সেই সময়ে আমার বরের কণ্ঠস্বর “আরে ভাই আপনারাও এখানে থাকেন নাকি..?” “না, ঢাকা থেকে আসছি (কোথায় বাড়ি সেটাও বলে)” “কি খেয়েছেন..?? হুইস্কি নাকি ভদকা..? কি পড়ছেন..? কোথায় পড়ছেন..? বাবা কি করে..? কজন বন্ধু আসছেন..? ক’দিন থাকবেন..?” এমন খেজুরা আলাপ করতে করতে ভোরের আযান। আমাদের তরফের এক ভাই বলে “যান ভাই, এবার রুমে গিয়ে ঘুমান” “ওরা দরজা খুললো নাতো” “কাল বুঝিয়ে বলেন দেখেন কী বলে” এই কথা শুনে আমি রীতিমতো কাঁপতে থাকি রাগে। ছেলেগুলো চলে যেতেই, দরজা খুলে বের হয়ে বকা দিই সবাইকে “মাইর না দিয়ে এসব কী ফিচেল আলাপ করলেন রাতভর আপনারা” তারা হাসতে হাসতে আমাদের নারী সমাজকে উত্তর দেয় “ওদেরকে তো আর ডিস্টার্ব করতে দিই নাই আমরা উল্টো কতটা ধৈর্য নিয়ে ওদেরকে সহ্য করেছি তোমাদের নারী সমাজের জন্যে, আর মাইর দিলে তো ওদেরকে মেরে ফেলতে পারতাম না উল্টো ওরা যদি আমাদের নামে কেইস করতো..?!! Stupid-দের Stupidity সহ্য করতে আমাদের কম কষ্ট হয়নি” এই হলো অভিজ্ঞতা। তিক্ত এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এই তিক্ততার কারণে আজ পর্যন্ত আমার বর আমাকে কোন নারী টিমের সঙ্গে বা একা কোথাও যাবার পারমিশান দেয় না।

আমাদের দেশের সোনার সন্তানদের অমানবিক, অভদ্রতা, অ-শিক্ষা এবং অপবুদ্ধির কারণে ঐদিন রাতে তিনজন ফরেনার নারীর সঙ্গে অঘটন ঘটতে পারতো। এবং যারা আমাদেরকে হোটেল বলে স্কুল ঘর ভাড়া দিয়েছিলো তাদের একজন প্রাণীও রাতে ওখানে ছিলো না- এটা আমাদের দেশের টুরিজ্যম এবং সিকিউরিটি। কান্না পায় ভাবলে।

সেবার অনেক ভয় এবং কষ্ট নিয়ে ঢাকা ফিরেছিলাম, ভালো লাগছিলো না কিছুই। ছেঁড়া দ্বীপে যাবার সময় আমরা সবাই চুপ, নীল পানির দিকে তাকিয়ে কেবলই মনে হচ্ছিল “হরেক রকমের অত্যাচার সহ্য করতে হয় বলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নীল পানি বেদনায় যেন আরও গাঢ় নীল”

#চতুর্থ দফা গিয়েছিলাম অনেক বছর পর (তৃতীয় দফার প্রায় তিন বছর পর) সেবার গিয়েছিলাম কোরবানি ঈদে, ভিড় ছিলোই না বলতে গেলে। সেই প্রথম থেকে আস্থা অর্জন করা একই হোটেলে থেকেছি, তারা কোরবানির গরুর মাংশ দিয়ে আমাদেরকে অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করেছে। আড্ডা দিয়েছে, ফাঁকা কোলাহলমুক্ত সেন্টমার্টিন কচ্ছপে গতিতে আয়েশ করে হেঁটে বেড়িয়েছি। পূর্ণিমা ছিলো, হোটেলের ছাদে চেয়ার টেবিল বিছিয়ে দিয়েছিলো চাঁদের আলোয় আমরা কার্ড খেলেছি। গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলিয়ে দিতে সেবার যেন আবহাওয়া, প্রকৃতি, মানুষ আমাদের প্রতি প্রাণভরে ভালবাসা ঢেলে দিয়েছিলো।

স্কুবা যাবার খুব ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু তাদের জনোবল মাত্র দুই-তিনজন ছিলো, তারা আবার সবাই ঈদের ছুটিতে তাই আর আশাপূরণ হয়নি। এটা সত্যিই অনেক বড় আফসোস। সেন্ট মার্টিনে স্কুবা নিশ্চয়ই দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হতো।

খুব ভালো মন নিয়ে ফিরে এসেছিলাম শেষ বার সেন্ট মার্টিন থেকে।

আর যাওয়া হয়নি, জানিও না কবে যাব। পৃথিবীর যা অবস্থা, কোথায় যাবো..!! হয়তো যাবো, আবার, কোন একদিন। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]