যুদ্ধের মাঠে ফুটেছিলো ভালোবাসা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘জানুয়ারী মাসের একেবারে প্রথম দিন। শীতের গায়ে ভর দিয়ে সন্ধ্যা নামছে। ১৯৫৯ সালের সন্ধ্যা। জীপটা থেমেছে তেল নেয়ার জন্য। জায়গাটা সম্ভবত লস আরাবস অথবা কলিসিও। বিপ্লবের আগুন সামাল দেয়া দিনগুলোতে আমি জায়গাটা অতিক্রম করেছি কয়েকবার। কিন্তু কখনো ভাবিনি সেই ছোট্ট শহরটার প্রান্তে এসে আমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটে যাবে। অথচ কী আশ্চর্য সেই শীত জড়িয়ে থাকা সন্ধ্যায় চে গুয়েভারা আমাকে জানিয়েছিলেন তিনি আমাকে ভালোবাসেন’।

চে গুয়েভারার সুইসাইড ট্রুপস তখন দখল করে নিয়েছে সান্তা ক্লারা নামে গুরুত্বপূর্ণ শহর। চে রওনা হয়েছেন রাজধানী হাভানার উদ্দেশ্যে। তাঁর গাড়িতে সঙ্গী নারী গেরিলা এলিয়েদা মার্চ। যুদ্ধের একরোখা দিন পার হয়ে ক্লান্তিতে জড়িয়ে আসছে শরীর, চোখে চেপে বসছে ঘুমের আগ্রাসন।  গাড়িতে বসেছিলেন এলিয়েদা, পাশে চে গুয়েভারা। ঠিক তখনই চে মৃদুকন্ঠে এলিয়েদাকে বলেছিলেন তার ভালোবাসার কথা। তখন কি বন্দুক হাতে নেয়া এলিয়েদা ভেবেছিলেন এই অগ্নিপুরুষের সঙ্গে ঘর বাঁধবেন তিনি?

হিল্ডা গেদিয়া অ্যাকোস্টা ছিলেন পেরুর বাসিন্দা। পেশায় অর্থনীতিবিদ। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে তার সংযোগ ছিলো অনেক আগে থেকেই। পেরুতে রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে তাকে দেশছাড়াও হতে হয়েছিলো। হিল্ডা ছিলেন চে গুয়েভারার প্রথম স্ত্রী। ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেই ‘সম্পূর্ণ বিপ্লবী’র সঙ্গে ঘর বাঁধেন হিল্ডা। তারপর ১৯৫৯ সালেই আবার ঘরভাঙা। ওই সময়ে হাভানায় এসেছিলেন হিল্ডা। চে গুয়েভারার কাছে ডিভোর্স চেয়েছিলেন। সেই বিচ্ছেদের পর ১৫ বছর বেঁচে ছিলেন হিল্ডা। মৃত্যুর আগে বই লিখে গিয়েছেন ‘মাই লাইফ উইথ চেঃ মেকিং অফ এ রেভোলিউশনারী’।

কবে প্রথম দেখা হয়েছিলো চে গুয়েভারা আর এলিয়েদা মার্চের? তখন কিউবাকে বাতিস্তার সামরিক স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্ত করার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ফিদেল কাস্ত্রো। তাঁর গেরিলা বাহিনীর ৮ম কলামের কমান্ডার চে গুয়েভারা। এসকেমবারি পাহাড়ে বাহিনী নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। এলিয়েদার অবস্থান তখন কমান্ডার চে‘র চাইতে অনেক দূরে। গেরিলা বাহিনীর শহুরে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের খবর আদানপ্রদানকারী হিসেবে কাজ করেন এলিয়েদা। তার উপর দায়িত্ব পড়লো এসকেমবারি পাহাড়ে চে গুয়েভারার বাহিনীর কাছে কিছু টাকা আর কাগজপত্র পৌঁছে দেয়ার। সেটাই ছিলো এলিয়েদার প্রথম একটা বড় দায়িত্ব। সুন্দরী তরুণী এলিয়েদা তাঁর প্যাকেট নিয়ে ঠিকঠাক চলে গেলেন সেই পাহাড়ে। কিন্তু সেবার দূর থেকে চে গুয়েভারাকে দেখেছিলেন এলিয়েদা। কথা হয়নি। সেটাই ছিলো প্রথম দেখা।

এলিয়েদা তাঁর ‘রিমেমবারিং চেঃ মাই লাইফ উইথ চে গুয়েভারা’ বইতে  স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার কয়েক বছর পর কঙ্গো থেকে চে আমাকে চিঠি লিখেছিলো। সেই চিঠিতে চে আমাদের সেই প্রথম দেখার প্রতিক্রিয়ার কথা প্রকাশ করেছিলো। চিঠি আচ্ছন্ন করে ছিলো ছিলো দিনটার স্মৃতি, একজন বিপ্লবীর কঠিন জীবনের পাশাপাশি সাধারণ এক পুরুষের অনুভূতির গল্প।’ এলিয়েদাকে প্রথম দেখে চে গুয়েভারার মনে হয়েছিলো ‘সোনালী চুলের একটু গোলগাল এক স্কুল শিক্ষিকা’।

প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি পুরনো হওয়ার আগেই আরেকবার পাহাড়ে যাবার নির্দেশ পান এলিয়েদা। এবার আরো টাকা পৌঁছে দিতে হবে পাহাড়ে যোদ্ধাদের কাছে। চে তখন তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে কিউবার মধ্যাঞ্চল দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শহরে বসে গেরিলাদের রেডিওতে তার কর্মকাণ্ডের কথা নিয়মিত শুনতে পান এলিয়েদা।সান্তা ক্লারা শহরের রাস্তায় দেখেন চে গুয়েভারার ‘সন্ধান চাই’ লেখা ছবি। সেই রোমাঞ্চকর মানুষটির সঙ্গে দেখা করার তীব্র ইচ্ছা নিয়ে আবারো পাহাড়ের পথে রওনা হলেন এলিয়েদা।

গেরিলা ক্যাম্পে এলিয়েদার সঙ্গে ছিলেন পেশায় আইনজীবী মার্তা লুগিও। লুগিয়’র সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে সেদিন চে মুখোমুখি হয়েছিলেন এলিয়েদার। জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর সম্পর্কে এলিয়েদার ভাবনার কথা। উত্তরে কী বলবেন সেটা ভাবতে সময় নেননি এলিয়েদা। ঝট করেই বলে বসেন, ‘ভালোই তো, মন্দ কী?’ উত্তরটা শুনে একটু অবাক হয়েছিলেন কি কমান্ডার চে? হয়তো কিছুটা হয়েছিলেন। তার মনে এলিয়েদা যে সেদিন ছায়া ফেলেছিলেন সে তো পরে চে গুয়েভারার চিঠি থেকেই জানা যায়।

কিন্তু তখনও দু’জনের মাঝে অনুপস্থিত বসন্তকাল। যুদ্ধের আগুন আর বিপ্লবের স্বপ্ন আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো তাদের হৃদয়। এলিয়েদা সেই দফায় কিছুদিনের জন্য গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে পাহাড়েই থেকে গেলেন। এলিয়েদা ভাবছিলেন নিজের ভবিষ্যত নিয়ে, ভাবছিলেন কীভাবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়া যায়। এক সন্ধ্যায় চে’র সঙ্গে কথা বলতে বলতে গেরিলা দলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবটা দেয়ার আগেই চে হঠাৎ প্রস্তাব দিয়ে বসেন এলিয়েদাকে নার্স হিসেবে ক্যাম্পে কাজ করার জন্য। কিন্তু এলিয়েদাকে তখন হাতছানি দিয়ে ডাকছে যুদ্ধের মাঠ। তিনি রাজি হলেন না চে’র দেয়া প্রস্তাবে। কমান্ডার চে গুয়েভারাও সেদিন সায় দেননি এলিয়েদার ইচ্ছাতে। সোজা নাকোচ করে দিয়েছিলেন তাঁর প্রস্তাব। বেশ কয়েক বছর পর এলিয়েদাকে তিনি বলেছিলেন, কিউবা বিপ্লবে অংশ নেয়া ডানপন্থী একটি গ্রুপের চর বলে সন্দেহ করেছিলেন তিনি এলিয়েদাকে। তাই রাজি হননি সেই প্রস্তাবে।

পাহাড়ে থাকার দিন ফুরিয়ে এলিয়েদা আবার ফিরে গেলেন সমতলে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে পল্লবিত হয়ে ওঠা ভালোবাসা সেই সাময়িক বিচ্ছেদ টপকে আবার কাছে ডেকে এনেছিলো তাদের। কিছুদিন পরের ঘটনা। ডিসেম্বরের শেষ। কিউবা মুক্ত করার লড়াই পৌঁছে গেছে চূড়ান্ত পর্বে। পেডেরিও নামে এক শহরে রাস্তার ধারে বসে আছেন এলিয়েদা, হাতে ধরা নিজের ব্যাগ।আচমকা একটা জীপ এসে থামে তাঁর পাশে। জীপে বসে থাকা কমান্ডার চে গুয়েভারা তাকে ডেকে তুলে নেন গাড়িতে। প্রস্তাব দেন তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে যাবার। প্রস্তাবটা পেয়ে লাফিয়ে ওঠের এলিয়েদা। সেই গাড়ি থেকে আর কখনো নামেননি এলিয়েদা। সেই সময়টাই ছিলো দুজন মানুষের হৃদয়ে বসন্তকালের সূচনা।

লড়াইয়ের মাঠে চে গুয়েভারার সাহস, বুদ্ধি আর গেরিলা সদস্যদের প্রতি গভীর ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এলিয়েদা। তাঁর ভালোবাসার অনুভূতি আরো তীব্র হয়ে ফুটে উঠতে থাকে সেই মানুষটির জন্য। নিজের বইতে সেই যুদ্ধের স্মৃতি লিখতে গিয়ে এলিয়েদা লিখেছেন, ‘কাবিগুয়ান নামে একটা শহর দখল করতে অগ্রসর হচ্ছিলাম আমরা। মাঝপথে একটা তামাকের কারখানায় সাময়িকভাবে হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয়। সেখানে আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম পেছন থেকে কবিতা আবৃত্তি করছেন চে গুয়েভারা। সেদিন বুঝেছিলাম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই কবিতার লাইন বলছিলেন তিনি। সেই দৃষ্টি আকর্ষণের মধ্যে দলনেতা চে ছিলেন না, ছিলেন একজন মানুষ চে গুয়েভারা’।

সেই ডিসেম্বর মাসের স্মৃতি এলিয়েদা ভুলতে পারেননি এক জীবনেও। সান্তা ক্লারার পতনের আগে থেকেই তিনি কমান্ডার চে গুয়েভারার ব্যক্তিগত সহকারীর পদ পেয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিটি যুদ্ধে চে‘র পাশে দাঁড়িয়ে বন্দুক হাতে লড়াই করেছিলেন তিনি। আর সেই যুদ্ধের মাঠে আগুনের মাঝে, বারুদের ঘ্রাণ নিতে নিতে ফুটেছিলো ভালোবাসার ফুল। একটু একটু করে চে গুয়েভারার হৃদয়ের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন এলিয়েদা। জেনেছিলেন বিপ্লবের এক অকম্পিত শিখার মতো সেই মানুষটি বিশ্বাস করেন, একজন প্রকৃত বিপ্লবী কখনোই গভীর ভালোবাসা ছাড়া বিপ্লবের আগুন জ্বালতে পারে না।

আরাবাস অথবা কলিসিও নামের সেই ছোট্ট শহরের প্রান্তে সন্ধ্যার ভিতরে মিশে ছিলো চে গুয়েভারার ভালোবাসার গল্পও। কী উত্তর দিয়েছিলেন সেদিন এলিয়েদা মার্চ? ক্লান্ত শরীরে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো তাঁর।ভালো করে বুঝতে পারছিলেন না চে কী বলতে চাচ্ছেন। চে হয়তো কিছু একটা উত্তর আশা করেছিলেন। কিন্তু সেদিন নীরবই থেকেছিলেন এলিয়েদা।

১৯৫৯ সালের ২ জুন মুক্ত কিউবায় দাঁড়িয়ে চে বিয়ে করেন এলিয়েদাকে। ফোর্ট কাবানায় খুব সাদামাটা আয়োজনে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।কাবানা সেনা দূর্গের কাছে তারারা নামক একটি জায়গায় তারা উদযাপন করেন মধুচন্দ্রিমা। চে গুয়েভারা যখন নিহত হন তখন এলিয়েদা ৪ সন্তানের জননী। চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর এক জীবনের স্মৃতি নিয়ে তাঁর লেখা বইটি প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এলিয়েদা সেই ডিসেম্বরের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন আজো।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ রিমেমবারিং চেঃ মাই লাইফ উইথ চে গুয়েভারা
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]