যে দ্বীপের বয়স চার’শো বছর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

রুজভেল্ট দ্বীপে আমাদের বসবাস ২৭ বছরের। ভাবতে অবাক লাগে এ ছোট্ট দ্বীপটির বয়স ৪০০ বছরেরও বেশী। ইতিহাস ধরে যতটুকু জানা যায়, ১৬০০ সালের দিকে দ্বীপটির মালিকানা ছিলো ব্ল্যাকওয়েল পরিবারের। এ পরিবারটি নেদারল্যান্ডস থেকে এসেছিলেন। বিশ্বাস করা কঠিন যে, ব্ল্যাকওয়েল পরিবারের সাদা কাঠের দোতালা আদি বাড়ীটি এখনও দ্বীপের মধ্যে আছে। বাড়ীর সামনে সুন্দর কামিনী ফুলের মতো ভারী সুগন্ধি দু’টো ফুলের গাছ আছে। ঐ বাড়ীর সামনে বাঁদিকে একটা বড় ‘ক্রিসমাস বৃক্ষ’ আছে – যেটা বড়দিনের সময়ে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়।

ব্ল্যাকওয়েল বাড়ীর পেছনে রেলিং দেয়া টানা বারান্দা। সে বারান্দা থেকে পাথরের পথ নেমে গেছে নদীর পাড় পর্যন্ত। হয়তো সেই পথের শেষে নদীতে এক পাটাতনে বাঁধা থাকতো একটা নৌকো। কল্পনায় দেখতে পাই ব্ল্যাকওয়েল পরিবারের সদস্যেরা সেই বারান্দায় সাদা বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছেন আর গল্প করছেন পড়ন্ত বিকেলে। তাঁদের পায়ের কা ছে বসে আছে তাঁদের খয়েরী কুকুরটি।বারান্দার সিঁড়িতে বসে খেলা করছে শিশুরা। তাদের কেউ দৌঁড়ে যাচ্ছে পাথরের পথ ধরে ঐ নৌকো পর্যন্ত।

ব্ল্যাকওয়েল পরিবারের নামানুসারে এ দ্বীপের নামকরণ করা হয় ‘ব্ল্যাকওয়েল দ্বীপ’। ব্ল্যাকওয়েলরা এ দ্বীপে পাথর কাটার কাজ গড়ে তোলেন। এ দ্বীপের বাতিঘর এবং তার উঠোন, উত্তর প্রান্তের ছোট গীর্জা, দক্ষিন প্রান্তের গুটিবসন্ত হাসপাতাল সব কিছুই সেই কাটা পাথরে তৈরী। এই গেলো বর্তমান রুজভেল্ট দ্বীপের আদি ইতিহাস।

এক সময়ে ব্ল্যাকওয়েল পরিবার দ্বীপটি নিউইয়র্ক নগরীর কাছে ২৫,০০০ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেয়। ১৮৮৮ সালের দিকে দ্বীপবাসীদের উপাসনার জন্যে রুজভেল্ট দ্বীপের মাঝখানে দ্বীপের প্রথম গীর্জাটি নির্মান করা হয়। The Chapel of Good Shepherd নামের এ গীর্জাটির নকশাটি করেছিলেন স্থপতিফ্রেড্রিক ক্লার্ক উইদার্স। শোনা যায় এটা নির্মানে সে সময়েই ৭৫,০০০ ডলার খরচ হয়েছিলো। এই গীর্জাতে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে দ্বীপকেন্দ্রের চত্বর। অনেকটা সব শহরের নগর-কেন্দ্রের মতোই। এই চত্বরে ফিলাডেলফিয়ার ফেটে যাওয়ার ঘন্টার মতো একটা ভাঙ্গা ঘন্টাও আছে।

প্রথম মহাযুদ্ধের পরে ১৯২১ সালের দিকে এ দ্বীপে সরকার একাধিক কর্মকান্ড গড়ে তুললেন। দীর্ঘকালীন অসুস্থ রোগীদের জন্যে গড়ে উঠলো দু’টো হাসপাতাল। গড়ে উঠলো গুটি বসন্তের হাসপাতাল, মানসিক রোগাগ্রস্থদের জন্য Octagon Institution এবং একটি ছোটখাটো কয়েদখানাও বটে। তিরিশ দশকের বিখ্যাত অভিনেত্রী মে ওয়েষ্টকে অভিনয়ে অশ্লীলতার দায়ে এখানে এক মাসের জন্যে এখানে অন্তরীন করা হয়েছিলো। অষ্টমাত্রিকতার সেই Octagon Institution এর মূল কাঠামো ঠিক রেখে আজ সেখানে এক আবাসন-ভবন গড়ে উঠেছে। সে যুগের এতো সব ‘সমাজকল্যানের’ কাজের জন্যে ১৯২১ সালে ব্ল্যাকওয়েল দ্বীপের নামান্তর হয় Welfare Island.

১৯৬৯ সালে এ দ্বীপটিকে নিউইয়র্ক নগর থেকে নিয়ে নিউইয়র্ক প্রদেশের কাছ হস্তান্তর করা হয় এবং প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের সম্মানে দ্বীপটির নতুন নামকরণ করা হয় Roosevelt Island. তাই যদিও রুজভেল্ট দ্বীপটি ম্যানহ্যাটন ও কুইন্সের মাঝখানে, তবু এটি নিউইয়র্ক নগরীর অংশ নয়, এটি নিউইয়র্ক প্রদেশের অংশ। ফলে নিউইয়র্ক নগরীর নগরপালের দপ্তর এ দ্বীপটির পরিচালনা করেন না, নিউইয়র্ক প্রদেশের প্রদেশপালের ওপরে এ দ্বীপটির পরিচালনার ভার ন্যস্ত। প্রদেশপাল মনোনীত একটি পর্ষদ এ দ্বীপের দৈনন্দিন পরিচালনা করে থাকেন।

১৯৫৭ সালের আগে এ দ্বীপে প্রবেশের একটাই উপায় ছিলো। ম্যানহ্যাটেন ও কুইন্সকে যুক্ত করে ১৯০৬ সালে যে Queensborough Bridge তৈরী করা হয়েছে, তার যে স্তম্ভটি দ্বীপের মধ্যে গাঁড়া তার পাশ দিয়ে একটি বড় ওপর-নীচ বাক্সের মাধ্যমে দ্বীপে আসা-যাওয়া করা যেতো। ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ঝুলন্ত সেতু হিসেবে নির্মিত লাল সেতুটি দ্বীপটিকে কুইন্সের সঙ্গে যুক্ত করে। London Bridge এর মতো এ সেতুর মাঝখানটিও ওপরে উঠে যেতে পারে জাহাজ পারাপারের জন্যে।

সুতরাং কুইন্সের দিকের লাল সেতু ধরে গাড়ীতে, বাসে, সাইকেলে বা পায়ে হেঁটে এ দ্বীপে প্রবেশ করা যায়। মজার ব্যাপার হলো ম্যানহ্যাটন থেকে গাড়ীতে সরাসরি রুজভেল্ট দ্বীপে প্রবেশ করা যায় না, তা করতে হলে প্রথম কুইন্সে যেতে হবে। লাল সেতুটি ভিন্নও এ দ্বীপে প্রবেশের আরো দু’টো উপায় আছে – পাতাল রেলে ও আকাশপথের দুলুনী বাহনে।

রুজভেল্ট দ্বীপে তিন রকমের আবাসন আছে – এক, স্বল্প-আয়ের পরিবার, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্যে ন্যূনতম ভাড়ার সরকারী আবাসন, ভাড়ার জন্যে বাণিজ্যিক আবাসন এবং নদীর ওপারের Sloan-Kettering Cancer Hospital এর চিকিৎসক ও সেবিকাদের জন্যে সংরক্ষিত আবাসন। বাণিজ্যিক আবাসন ভবন নির্মানের অনুমতি প্রদানের শর্ত হচ্ছে যে, প্রতি তিনটি বাণিজ্যিক আবাসিক ভবনের জন্যে স্বল্প আয়ের পরিবারদের জন্যে একটি ভবন নির্মান করতে হবে।

পুরো দ্বীপ জুড়ে সুবিন্যস্ত, অবিন্যস্ত নানান গাছপালা, উদ্যান এখানে সেখানে। শুনেছি, ১১০ রকমের প্রজাতির গাছ আছে। পাখীদের কলরব শোনা যায় নানাদিকে – সে নানান রকমের পাখী। নদীতে দেখা যায় পানকৌড়ি আর নদীপাড়ে সী-গাল। পরিযায়ী পাখীরা এ দ্বীপে আসে প্রতিবছর।

যাঁরা এ দ্বীপে বাস করেন, তাঁদের জন্যে শখের বাগান করার  যৌথ জমি আছে। শিশুদের খেলার জায়গাও দেদার। বড়দেরও নানান খেলার সুবিধে আছে – ফুটবল, বাস্কেটবল, বেসবল, সাঁতার।

চূড়ান্ত বিচারে এ দ্বীপটির ইতিহাস, ঐতিহ্য, কাঠামো মিলিয়ে এটি শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি একটি জীবনধারা, একটি শান্তির জায়গা, একটি স্বস্তির আবাস। প্রায় তিন দশক ধরে এর অংশ ছিলাম – সে তো এক ভাগ্য বটে।

লেখকঃ
ভূতপূর্ব পরিচালক
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 
দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box