যে পথ দিয়ে এসেছিনু সে পথ আমার একার

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

সাতাশি সালের কথা। ফরিদপুর থেকে একটা প্রোগ্রাম এসেছে। হানিফ সংকেত ভাই, শুভ্র দেব, নিগার সুলতানা আপা সহ কয়েকজন নাচের শিল্পী, তাদের সঙ্গে আমিও আছি।বড় একটা বাসে রওনা হলাম।আয়োজক রওনা দিতেই দেরী করে ফেলেছেন। যেতে যেতে ফরিদপুর পৌঁছাতে রাত হয়ে গেলো। পৌঁছেই আমরা মেকআপ নেয়া শুরু করলাম। রাত প্রায় নয়টায় ভেন্যুতে পৌঁছাবো, হঠাৎ দেখি ধর ধর করে শত শত মানুষ ধাওয়া করছে।সবার হাতে ইট পাটকেল। বড় একটা ইটের খন্ড গাড়ির কাঁচ ভেংগে শুভ্রদেবের মাথায় লেগে গলগল করে রক্ত পড়তে লাগলো। আমরা মাথা নীচু করে বাঁচার চেষ্টা করছি।বাস ড্রাইভার খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ক্ষিপ্র গতিতে গাড়ি পুলিশ ব্যারাকে ঢুকিয়ে দিলেন।পাবলিক ধাওয়া করে ব্যারাক পর্যন্ত এসেছে। আমরা আমাদের কি দোষ তখনও জানিনা। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো অনুষ্ঠানের ভেন্যু ছিলো সিনেমা হল।সেখানে টিকিট এর বিনিময়ে বিকেল পাঁচটা থেকে মানুষ বসা।শিল্পীরা এসেছে রাত নয়টায়।এই এতো সময় বসে তারা গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে অস্থির হয়ে গেছে ।আমাদের অগ্রিম যা সম্মানী দিয়েছিলো, তারপর কথা ছিল বাকী সম্মানী অনুষ্ঠান স্থলে যাওয়ার আগেই দিয়ে দেবেন।আমরা রেডি হয়ে মঞ্চে যাওয়ার আগে সেই পাওনা চাওয়াটাই যেন দোষ হয়ে গেছে।আসলে বাকি পাওনা মেরে খাওয়ার বুদ্ধি ছিলো আয়োজকের।পাওনা চাইতেই দিতে অপারগতা জানিয়েছেন আয়োজক।আমরাও বাকী পারিশ্রমিক এর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।সময় পার হচ্ছে। আয়োজক তখন মঞ্চে ঘোষণা দিয়েছেন যে শিল্পীরা সব বেশী পয়সা চাচ্ছেন এবং মঞ্চে আসছেন না! আসলে ঢাকা থেকে আসার পথে টের পেয়েছিলাম আয়োজক আসলে বাটপার।সেখানে বাস ভাড়াসহ শিল্পীদের টাকা প্রায় লক্ষাধিক টাকা বাকী ছিল। সেই রিস্ক আমরা নিতে চাইনি।আমরা আমরা বলছি কিন্তু আসলে আমি এখানে শুধুই নবীন একজন শিল্পী। তো পাবলিক যে ক্ষেপে গেলেন তাতে তাঁদের তেমন দোষ ছিলোনা। তবে গান শুনিয়ে প্রাণ জুড়ানো কাজ যাদের তাদের ইট পাটকেল দিয়ে জানে মেরে ফেলা বা হতাহত করার ব্যাপারটা প্রতিশোধ হিসেবে বেশী হয়ে গেলো না? পুলিশ ব্যারাকে শুভ্রদেবের কিছু চিকিৎসা করে পুলিশ কর্তৃপক্ষ আমাদের দুই গাড়ি পুলিশ দিলো এসকর্ট দিলো একদম দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।পুলিশ প্রহরায় আমরা ঘাটে আসলাম । তারপর সব শিল্পীরা ঢাকার দিকে চলে গেলো। আমার হাজবেন্ড বললেন উনি বগুড়া যাবেন। আমরা দৌলতদিয়া ঘাট থেকে নগরবাড়ি হয়ে বগুড়া গেলাম। শরীর ভালো লাগছিলো না, তারপর ও গেলাম বগুড়া বড় খালার বাড়ি।ফুপু শাশুড়ির বাড়ি।কি যেন এক নতুন অনুভূতি, শুধু কান্না পাচ্ছিলো, মন উদাসীন হয়ে যাচ্ছিলো, কিছুই খেতে পারছিলাম না, এবং বমি পাচ্ছিলো।বুঝলাম মা হবো! কি এক অজানা ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরলো, খুব অসহায় হয়ে পড়লাম। নিজেদের ঠাই ঠিকানা নাই, চালচুলা নাই, নাই কোনও সাহায্যের হাত! সেখানে একটা বাচ্চা হওয়া কি সোজা কথা? আমার বয়সই বা কতো? আর আমাদের চেয়ে আমাদের নিয়ে আত্মীয় স্বজনদেরই (!) চিন্তা বেশী। সাহায্য করুক না করুক আমাদের সংসার টিকবে কি না টিকবে, আমার গান রসাতলে যাবে কিনা, আমরা সংসারের চাল ডাল কিভাবে কিনবো, বাচ্চা লালন করবো কি ভাবে এগুলো চিন্তায় তাদের মন উচাটন হয়ে যাওয়ার জোগাড় হলো আর কি। আর আমি? সব বুঝেও না বোঝার ভান করে দিন পার এবং জীবন পার করা রপ্ত করলাম খুব কঠিন ভাবে। আমার জীবন তো আমারই।পার হলে হবো না হলে মুখ থুবড়ে বসে থাকবো, তাতে কার কি! যে পথে এসেছি, যে পথে যাবো তা যদি একার হয় তো মাঝের অংশ ও একার হোক।কি আর করা!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক