যোজনগন্ধা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শর্মিষ্ঠা চৌধুরী

কিরে পদ্ম তোর হলো!!

হাঁক ডাকে সম্বিত ফিরলো পদ্মর।

— হ্যাঁ দিদিমনি, এক্ষুনি শেষ করে ফেলছি।

তারপর রান্নাঘরের সমস্ত কাজ ঝটপট শেষ করে দিদিমনিকে বলে রওনা দিলো আরেকটা ফ্লাটের উদ্দেশ্যে। এই করেই তার দিন থেকে রাত হয়। ঝড় বৃষ্টি তুফান কোন কিছুই তাকে দমাতে পারেনা। টাকা চাই তার আরো টাকা। একটা ছেলে আছে যে ঘরে। সেটাকে মানুষ করতে হবে। বাঁশিওলা যে ওই ছেলেটাকে পেটে ধরিয়ে দিয়েছিলো বাড়ি থেকে বের করে দেবার সময়ে।

হ্যাঁ তিন মাসের পোয়াতি ছিলো সে যখন স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে এসেছিলো চিরকালের জন্য বাপের বাড়ি।এখানেও অভাবের সংসার। ছেলেটাকে মা বাবার কাছে রেখে বেরিয়ে পরে ভোর ফুটতে না ফুটতেই বাসা বাড়ি কাজের জন্য। এ ফ্লাট থেকে ওই ফ্লাট। কামাই না করার জন্য বেশ পছন্দ সব দিদিমনিদের।

মাথার চুল বেশ উঁচু করে বাঁধা থাকে। শ্যামলা কালো রঙ। মুখের আদল ঢলঢলে। মাঝারি উচ্চতার পদ্ম যদি আর কোন মেয়েদের মতো সাজ গোজ করে থাকতো তাহলে হয়তো চোখ ফেরান যেতোনা।

নাহ সাজপোশাক কোন দিকেই নজর নেই মেয়েটার।স্বামী ছেড়ে দেওয়া সত্বেও সাদা চুড়ি আর লাল পলা দু’জোড়া আর কপালে বড় করে সিঁদুর পরে আসে। গায়ে থাকে খেঁটে খাওয়া শ্রমিকের ঘামের উৎকট গন্ধ।

এই এক যন্ত্রণা। সবদিকে মেয়েটা ভালোই ছিলো। কিন্তু গায়ে থাকতো ঐ ঘামের উৎকট গন্ধ। নয়তো অল্প বয়সে টিকলো নাকে যখন বাজারী পাথরের নাক ফুল হাসির সঙ্গে ঝলকে উঠতো তখন কত যুবক যে বুকে হাত দিতো।

মাছের আড়তদারের ব্যবসা করতো তখন পদ্মর বাপ ভাইরা। একটাই মেয়ে ছিল পদ্ম তাদের। যখন ব্যবসা পত্তর করে কিছু টাকা হাতে আসতো তখন কির্তনের আসর বসতো ওদের বাড়িতে। ওই কির্তনের দলেই বাঁশি বাজাতো শ্যামল। পদ্ম নাম দিয়েছিল বাঁশিওলা। নিমাই সন্ন্যাসে যখন সুর তুলতো বাঁশিওলা পদ্ম বিভোর হয়ে যেতো।

বেশি দিন লাগেনি দু’জনের পিড়িত জমে উঠতে। পদ্মর মা বাবার তাড়া ছিলো মেয়ে বিয়ে দেওয়ার। তাই তারাও ছাড় দিয়ে রেখেছিল। মনে করেছিলো বেশ ভালো পাত্তর ই জোটানো গেছে একখান।

ঘন ঘন আসা যাওয়া তখন শ্যামলের পদ্মদের গ্রামে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসলে ধান ক্ষেতের আড়ালে ঘনিষ্ঠ হতো দুজনে।

একদিন কি যেন সেন্ট না কি নিয়ে এসে পদ্মর গায়ে ছিটিয়ে দিল শ্যামল। বলওেলা শোন এই গন্ধটা গায়ে মাখবি দেখবি কেমন পদ্ম গন্ধার থেকে যোজনগন্ধা হয়ে উঠছিস রে–

যোজনগন্ধা কি জানতে চাইলো পদ্ম। শ্যামল শোনালো পরাশর মুনি আর সত্যবতীর কাহিনী। কিভাবে মুনি পরাশর মন্ত্রবলে সত্যবতীকে মৎসগন্ধ্যা থেকে সুন্দর আকর্ষনীয় গন্ধ সম্পন্ন যোজনগন্ধা করে তুলেছিলো।

পদ্ম খুব খুশি হয়েছিলো সেদিন। ঢেলে দিয়েছিলো তার যৌবন শ্যামলের পায়ে তখন।

এর কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করে শ্যামলের ঘরে  চলে যায় পদ্ম। কিছুদিন সুখেই কেটেছিলো। কিন্তু কপালে তার সুখ যে লেখাই নেই।শাশুড়ি  স্বামী পরিত্যাক্তা ননদ আর বিধবা জায়ের যন্ত্রণায় অসহ্য হয়ে উঠছিলো জীবন। তার পর তাদের কথায় যখন শ্যামল ও হাত তুলতে শুরু করলো পদ্মর উপর তখন আর সহ্য করতে পারেনি। তিনদিনের উপোসী পেটে তিনমাসের ছেলেটাকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলো পদ্ম শ্যামলের।

তরকারি কুটতে কুটতে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিলো পদ্মর। আজ হঠাৎই বাঁশিওলার কথা মনে পড়লো। এই নতুন দিদিমনির বাড়িতে আজ মহোৎসব। ওদের ছেলে আসবে বম্বে থেকে। ছেলে নাকি কিসব বাঁশি বাজায় বম্বেতে একটা গানের ব্যান্ডে।

               ###

সুর তুলে তুলে একমনে চেষ্টা করে যাচ্ছে সাত্যকি। ডিসুজার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। নেক্সট ফিল্মে ওদের ব্যান্ডই কাজ পাবে। পদ্ম খালি লুকিয়ে চুরিয়ে দেখে সাত্যকীকে। একমাথা ঝাঁকরা ঝাঁকড়া চুল। কি ফর্সা। একমনে যখন বাঁশি বাজায় তখন যেন ঠিক ফর্সা কেষ্ট ঠাকুর। কিন্তু ওই বাঁশিগুলো ঠিক শ্যামলের বাঁশির মতো না। একটু অন্যরকম। ধাতব। আর কত্তরকমের বাঁশি। বাবু কত বাক্স প্যাটরা নিয়ে এসেছে।

হঠাৎ করেই পদ্মর দিকে চোখ গেল সাত্যকীর। — কে কে ওখানে!!

পদ্ম চমকে উঠল।

— আমি বাবু–

— তুমি কে!!

— এ বাড়িতে নুতন কাজে এসেছি–

—- ওহ তাই-!! ঠিক আছে যাও আমার জন্য একগ্লাস জল নিয়ে আসো। আর হ্যাঁ এক কাপ চা-ও —।

পদ্ম পরম উৎসাহে জল নিয়ে এলো। এর কিছু পরে চা। সে এবারে গেলনা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। এসব সে কোন দিন ও দেখেনি।

হঠাৎ–

হঠাৎ সাত্যকী নাক কুঁচকে উঠলো। এই কি একটা বিশ্রী গন্ধ। কোথ্থেকে আসছে!!

হ্যাঁ ওইতো ওই মেয়েছেলেটার গায়ের থেকেইতো তাইনা!!

সাত্যকী রেগে উঠলো ভীষণ। ছুড়ে ফেলে দিল চায়ের কাপ জলের গ্লাস।

হুঙ্কার দিয়ে উঠলো—

বেরিয়ে যাও বেরিয়ে যাও বলছি আমার ঘরথেকে।

বলেই মা মা করে চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

কিংকর্তব্যবিমুঢ় পদ্ম হতচকিত হয়ে কি করবে ভেবে উঠতে না পেরে কাঁচের টুকরো গুলো জড়ো করতে লাগলো।

সাত্যকীর মা ছুটে এলো ঘরে। পদ্মকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো–ওরে পদ্ম তোকে কতবার না করেছি ছেলের ঘরে তুই আসবিনা। ছেলে আমার গন্ধ নিয়ে একটু বেশি পরিমাণে সেন্সেটিভ। আর তোর গায়ে যা উৎকট গন্ধ বেরোয় না—।

পদ্ম আরো হতভম্ব হয়ে গেলো। এক ছুটে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে ফ্লাটের দরজা খুলে। পেছন থেকে গিন্নি মা চিৎকার করছিলেন— আরে কোথায় যাচ্ছিস । দাঁড়া শোন শোন–

কিন্তু পদ্ম থামেনি প্রায় দৌড়াতে লাগলো রাস্তা দিয়ে। অন্ধকার নেমে এসেছিলো। আকাশেও বর্ষার মেঘ। এক্ষুনি নামবে বোধহয়। পদ্ম ছুটছে– বড় রাস্তা পেরিয়ে বাঁক নিলো গাঁয়ের রাস্তার দিকে। একটু নির্জন এই জায়গাটা। একপাশে ঢেঁড়সের ক্ষেত। তুমুল বেগে বৃষ্টি নামলো।

পদ্ম হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল ক্ষেতের পাশে। ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো। আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলো একরাশ আক্ষেপ। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো— বাঁশিওলাআআআ, ও বাঁশিওলা কোথায় তুমি। দাও আবার এনে দাও ওই গন্ধ। এট্টু এনে দাওনা গো। আমি যে যোজনগন্ধা হব গোওওও—

যোজনগন্ধাআআআআআ—

বৃষ্টির জল ততক্ষণে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছিল পদ্মর শরীরের সমস্ত আঁশটে কটু গন্ধ। সোঁদা মাটির পবিত্র গন্ধে তার শরীর তখন সত্যিই যোজনগন্ধা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]