রক্তের আঙুরলতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

লুতফুন নাহার লতা

বিটিভিতে একটা বিখ্যাত নাটক হয়েছিলো আমাদের ছোটবেলায়  ‘রক্তের আঙুরলতা।’ আঙুরের রঙ, স্বাদ, এবং বাংলাদেশে এর দুস্প্রাপ্যতা, অধরাকে ধরতে চাওয়ার মত। আঙুরের প্রতি আমার নেশা জাগানো ভালোবাসা জাগায়। কেমন একটা স্বপ্নের মত। নিউইয়র্কের বাড়ি গুলোর সামনে সামার এলেই বেড়ে উঠে আঙুরলতা! রক্তের আঙুরলতা নয়, সবুজ সতেজ হাতছানি দিয়ে ডাকা মাচন ভরা আঙুরলতা।

সুইজারল্যান্ড

আসা যাওয়ার পথের ধারে প্রতিদিন দেখি আর সেই নাটকের নামটি মনে পড়ে! আর কিছুদিন পরেই থোকা থোকা সবুজ আঙুরে ভরে যাবে এই অপূর্ব মাচান।

মার্কের কারনে প্রায় প্রতি সামারেই কিছুদিনের জন্যে সুইজারল্যান্ড যাওয়া হয়। জেনেভা এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেন। সেই ট্রেন এঁকে বেঁকে পাহাড়ের কোল বেয়ে চলে যায় দূরের শহরগুলোতে। যেতে যেতে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাদিকে পাহাড়ের কোল ভরা সারি সারি আঙুরের ক্ষেত। ডানদিকে লেক জেনেভা তার ওপাশে ধুসর দেখা যায় ফ্রান্স। সাদা মেঘেরা দল বেঁধে যায় লেক জেনেভা পেরিয়ে প্যারিসের সাঁজেলিজে’তে আলোর ফোয়ারার সঙ্গে নাচবে বলে। সেই পথ বেয়ে ট্রেনের জানালায় বসে করতলে রাখি মুখ। সুরমার মত চোখে এঁকে দেই সুন্দরের গায়ে পরানো ঝিলমিল বিস্ময়! যাই আল্পসের গায়ে লেগে থাকা মায়া পাহাড়ের কোলে আমার পলা মায়ের বাপের বাড়ি সোয়াইজিমেন শহরের ওবেরিয়েদ বা ওবারল্যান্ডে।

পলা মায়েরা চার বোন, হিলডা, পাউলা, মার্থা, হানি। হিলডা আর হানি মারা গেছেন তা বেশ কয়েক বছর হলো। পলা মা আর মার্থা খালা আছেন। মার্থা খালাকে ওরা ডাকে তান্তা মার্টি। খালাকে ওদের ভাষায় বলে তান্তা, আর মার্থা তাই আদরে হয়ে গেছে মারটি। তো সেই তান্তা মার্টি থাকেন জেনেভা থেকে ট্রেনে দু’ঘন্টার দুরত্বে এক অপূর্ব শহরে। এক রকম ভূস্বর্গের মতই সেই অপরূপ সুন্দর নগর ভেভ্যে , Vevey in Switzerland।

ভেভ্যে এক ঐতিহাসিক নগরী। চলচ্চিত্রের জনক বিশ্বখ্যাত চার্লিচ্যাপলিন যেখানে একদা কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়। ১৭৫৫র দিক থেকে বিভিন্ন সময়ে অসাধারণ সব গুনী শিল্পী, কবি, গল্পকার, সাহিত্যিক পৃথিবীর নানান দেশ থেকে এসেছিলেন এই শহরে, সুইজারল্যান্ড এর এই মুক্ত বাতাসে। কেউ কেউ এসেছিলেন উন্নত শিল্প সাহিত্য ও দর্শন শাস্ত্রের সূতিকা গৃহ হিসেবে এর সান্নিধ্য পেতে। এই শহরের স্বর্গীয় আলো হাওয়ায় স্বাস্থ্য উদ্ধারে আবার কেউ কেউ নিজ দেশ থেকে রাজনৈতিক ভাবে বিতাড়িত হয়ে। এই সব গুনী মানুষের মহামিলনে এই নগরী গড়ে উঠেছিল শিল্পে সাহিত্যে সুষমায়।

সুইজারল্যান্ডে পলা মায়ের সঙ্গে

ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আলেকজান্ডার পুশকিন, আন্তন চেকভ, ইভান তুর্গেনেভ, ভিক্টর হুগো, লিও টলস্টয়, নিকোলাই গোগোল এবং আরো অনেকে এসেছিলেন সে সময়ে। এখানে এই লেক জেনেভা বা স্থানীয় লোকেদের লেক লেমোর ( লেক লেমো- আমাদের লেক) কোল ঘেসে পাহাড় আর হ্রদের জলের কাছে ভ্যেভে শহরের আলো ছায়ায় তাই রয়েছে ওদের অম্লান সব স্মৃতি। চার্লি চ্যাপলিন জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়েছেন এখানে। এখানে রয়েছে নিকোলাই গোগলের নামে মিউজিয়াম এবং একটি সংগঠন। রয়েছে চার্লি চ্যাপলিন মেমোরিয়াল। এখানে যতবার এসেছি থমকে দাঁড়িয়েছি লেক লেমোর তীরে! লেকের জলে ডোবানো সিলভার কাঁটাচামচ বিঁধেছে বুকে। লেকের ঠিক উল্টো দিকে তীরের পাশের গার্ডেনে কালো হয়ে যাওয়া ব্রোঞ্জের চার্লিচ্যাপলিন মাথায় তার সিগনেচার কালো হ্যাট পরে হাতে লাল গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই চির পরিচিত ভঙ্গিমায়। এপাশে নিকোলাই গোগল দোয়াতে পালকের কলম সামনে নিয়ে লিখছেন বই! ওদের মূর্তির পাশে এসে সেই সব দিনের ইতিহাস স্বরন করে এক মধুর বেদনায়, ভাললাগায়, ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছি বার বার।

তো যখনি নিউইয়র্ক থেকে জেনেভা হয়ে ভ্যেভে শহরে আসি, দু’একদিন তান্তা মার্তির বাড়ীতে থেকে তারপরে যাই মার্কের নানার বাড়ি আলপ্সের গায়ে সোইজিমেন শহরে। যে বাড়ী আমাদের পলা মায়ের বাড়ী, যার নাম সুলিগার হুস অর্থাৎ সুলিগার ফ্যামিলি হাউস। ঝুলানো কাঠের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকি দূরের লিন্ডেরবার্গ পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে আলপ্সের অতিথীদেরকে তারে ঝুলানো গন্ডোলা ( কেবলকার) বয়ে নিয়ে যায় ধীরে ধীরে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সেখানেও শুধু আঙুরের মেলা দেখি চারিদিকে। সবুজ সবুজ, হলদেটে, জাম জাম, কালো কিম্বা লম্বা লম্বা লালচে আঙুর! উহ আঙুর আঙুর আমার আঙুরলতা! লতার দূর্বলতা! রক্তের আঙুরলতা!

আমি আম, জাম, কুল, কাঁঠালের দেশের মেয়ে। আঙুরলতা আমার কাছে সত্যিই কেবলই স্বপনে কুড়িয়ে পাওয়ার মত এক রোমান্টিকতা আর তাই চারিদিকে এত সারি সারি আঙুর মাচান দেখে দেখে আনন্দে, প্রেমে, রোমান্টিকতায় আমার মাথা খারাপ হবার যোগাড়।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি সোয়াইজিমেন শহরের সুলিগার হুসের ব্যালকোনিতে। দূরের আল্পস পর্বত মিলিয়ে যায় কুয়াশায়। চোখের ভেতর পাহাড়ের গায়ে মেঘের ভেলা সরে গিয়ে ভেসে ওঠে দূরে আমার দেশ। সবুজ ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলে যায় প্রাণ জুড়ানো বাতাস। সেই সবুজের কুয়াশা পেরিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসে আমার আঙুর খালা। আমার মামীর ছোট বোন আঙুর। আঙুরের মত টসটসে এক মিষ্টি মেয়ে। এক এক্সটিক আলোর বিচ্ছুরন। ধানের ক্ষেতে সকালের সূর্যের মত তার হাসির দ্যুতি। থুতনিতে একটা কালো তিল ছিল তার, হাসলে সেই তিল ঝিলমিলিয়ে উঠত। ফাগুন বাতাসের মত দুই বেনী চঞ্চলা মেয়েটি কোনদিন ভালোবেসেছিল কিনা কাউকে, জানিনা আমরা, জানিনি কোনদিন। তবে দেশ স্বাধীন হবার কিছু আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তার। খুব সাধারন পরিবারের সাদামাটা এক পাত্রের সঙ্গে দূরের এক গ্রামে। সে বাড়ীতে নিকনো উঠোন জুড়ে খেজুর পাতার পাটিতে আলাদা আলাদা করে শুকাতো তিল আর তিসি। বাড়ীর পাশের মস্ত খোলেনে চলত ধান মাড়াই, কুলোয় করে বাতাসে উড়ান হত সোনার ধান। রাত গভীর হলে ধুসর চাঁদের আলোয় শীতের শিশির ঝরে পড়ত পাকা ধানের শীষের পরে। গ্রামের বিয়ে বাড়ীতে চান্নি পশর রাতে বৌ ঝি’ রা গলা খুলে গাইত গীত – কাঁটা বন দিয়ে যাইওরে দামান ফুলো বন দিয়ে আইসো, একেলা একেলা যাইওরে দামান দোকেলা হইয়ে আইসো রে’ —

সে গান মিলিয়ে গেলে দূর বনে, তিনটি তক্ষক ডেকে ওঠে। দূরে আরো দূরে কেঁদে ওঠে একটি শিয়াল। রাত কেমন হুম হুম করে ভয় জাগানিয়া নিঃশ্বাস ফেলে পাতার আড়ালে। তখন ধানকাটা খোলা মাঠ তাকে ডেকেছিলো, ডেকেছিলো নিশির শিশির, পাশে শিশুটিকে রেখে উঠে গিয়েছিলো বিছানা ছেড়ে। ধানের গায়ে মাজরা পোকা মারার বিষ ছিলো গোলা ঘরে। কেউ জানেনা কোন বেদনায় শিশিরের মত অভিমান জমেছিলো তার বুকে। কি এক বিপন্ন বিস্ময় তাকে ঘুমুতে দেয়নি, আকন্ঠ তৃষ্ণায় ঢক ঢক পান করেছিল সেই বিষ! আহারে সোনার কইন্যা। বিষে নীল হয়ে যায় আমাদের আঙুরলতা! আমাদের আদরের আঙুর খালা! চাঁদের সঙ্গে ঢলে পড়ে তার খোপায় তারার ফুল! এলিয়ে পড়ে উঠোনের তিল তিশি মিসামিশি থুপের পাশে খেজুর পাতার পাটির পরে। আর কোনদিন জাগবেনা জেনে অন্তহীন ঘুমের আঁধারে হারিয়ে গেল সে।

দাস পাড়ার নলিন দাসের বৌ নদির ঘাটে সিন্দুর মাখা ঘটে ফুল বেলপাতা নিয়ে পূজো দিতে এসে তাকে দেখেছিলো কিছুদিন পরে। বেনী দুলিয়ে নদীর ওপারে হলুদ শর্ষে ক্ষেতের আইল দিয়ে হাসতে হাসতে সে চলেছে পশ্চিমের অস্তরাগের আভায়।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]