রক্তের টান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

চেঙ্গিস খান

(নিউইয়র্ক থেকে): চেঙ্গিস, হালাকু, কুবলাই খানের নাম শুনলে যেমন মুসলমান-মুসলমান মনে হয়, তেমনটাই মনে হয়েছিলো সুমাইয়ার সঙ্গে প্রথম দূর আলাপনে। পুরো নাম সুমাইয়া মাসমারিজার। জন্মস্থান মঙ্গোলিয়ার উলান বাটোর। কথার একসেন্ট এবং নামটা শুনে মনে হয়েছিলো সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মেয়ে। সামনাসামনি পরিচয়ে হয়তো দেখব গোলগাল চেহারা, টানা চোখ, মাথায় রঙিন রেশমি হিজাব!

সুমাইয়া কাজ করে জাতিসঙ্ঘে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ বাঁধলে ‘ওয়ার এনালাইসিসের কাজ’ তার। যুদ্ধ কেনো বাঁধলো, যুদ্ধ এড়ানোর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের কাজ করে সে। কিন্তু গত তিন বছর সে কাজে প্রায় অনুপস্থিত মস্তিস্কে বড় ধরণের রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক) হওয়ার কারনে।

সুমাইয়া আমার চেয়ে অন্তত পনের বছরে ছোট। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। এই বয়সে তার স্ট্রোক এবং শারিরীক-মানসিক সক্ষমতা হারানোর বেদনায় আমিও দু:খ-ভারাক্রান্ত হই! সুমাইয়ার সমস্যা-একটুতেই ভেঙ্গে পড়ে মানসিকভাবে। এই ভয় দূর করে তাকে গাড়ি চালনায় মানসিকভাবে সবল করে তোলা একটু কস্টের কাজ বৈকি!

জাতিসংঘ থেকে ছুটি নিয়ে সুমাইয়া আমাদের পাশেই একটি গ্রামে নতুন জীবন শুরু করতে চাচ্ছে। নতুন জীবনের শুরুতে, তার ইচ্ছা পাশেই নিউপালজ ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে। কিন্তু এখানে যেহেতু পাবলিক পরিবহণ নেই, তাই নিজেই গাড়ি চালানো ছাড়া গতি নেই তার।

ম্যানহাটনে জাতিসংঘ সদর দফতর থেকে এই গ্রামটির দূরত্ব প্রায় ৯০ মাইলের কাছাকাছি। শান্ত, সুনিবিড় গ্রাম। এর নাম হাইল্যান্ড। ক্যাটসক্কিল মাউন্টেন উপত্যকা নানা জাতের আপেল বাগান আর আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াইনারীগুলো (মদ প্রস্তুতের কারখানা) এই গ্রামেরই আশেপাশে।

২০০২ সালে আমি এ এলাকায় হাডসন নদীর ওপারে যখন প্রথম পা রাখি, তখনই জেনেছিলাম- এক সময় এই আপেল বাগানগুলোতে বেশকিছু বাঙালীও কাজ করতেন। সেটা নব্বই দশকের কথা। যখন কৃষি খামারে কাজের সুবাদে অভিবাসন বৈধ করার সুযোগ ছিলো।

যা-ই হউক, এই গ্রামে এসে ৪০ হাজার ডলারে একটি মার্সিডিজ গাড়ি কিনে প্রথম দিনেই বিপত্তি ঘটায় সুমাইয়া। পাহাড় থেকে ঢালুতে নামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারায়, গার্ড রেলে লেগে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাঙ্ঘাতিক রকমে। তবে গাড়ির ভেতরে চারদিক থেকে বায়ূ ব্যাগ বের হলে, সুমাইয়া রক্ষা পায়।

এখন বীমা কোম্পানি বলে দিয়েছে- নিরাপদ গাড়ি চালনার গ্যারান্টি তাকে দিতে হবে। তা’না হলে তার গাড়ি বীমা বাতিল হয়ে যাবে। এদেশে বীমা কোম্পানি আইনে আছে- গাড়ি বীমা কেনার ৬০ দিনের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কোম্পানি চাইলে বীমা বাতিল করে দিতে পারে একতরফাভাবে।

গত পাঁচদিন সকালে, আইবিএমে আমার নিয়মিত কাজের আগে তাকে এক ঘন্টা করে সে প্রশিক্ষণই দিলাম। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তার মন থেকে ভয় দূর করা। একই সঙ্গে নিরাপদ গাড়ি চালনার কৌশল সঠিক সময়ে সঠিকভাবে প্রয়োগ করার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া।

১৯ বছর আগে সুমাইয়া এদেশে এসেছিলো পড়াশুনার নাম করে। যখন তার বয়সও ছিল ১৯। কলেজের পডাশুনা শেষ করে প্রথমে জাতিসংঘে কাজ নিয়েছিল দোভাষীর। পরে এই পদ, সেই পদ ডিঙ্গিয়ে এনালিস্টের কাজ। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে বৈধ হয়েছে।

তিন বছর ঝড়ো প্রেমের পর তার একটি বয় ফ্রেন্ডও জুটেছিলো, ককেশিয়ান। কিন্তু স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গেও ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আপাতত একটি বয়ফ্রেন্ড জুটেছে কম্পিউটার প্রফেশনাল। তাকে নিয়েই দিন কাটছে সুমাইয়ার। এটিও ককেশিয়ান।

প্রথম দিন খানিকটা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই সুমাইয়ার লেসন শুরু হয়। একটু আগে বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে ঝগড়া সেরে এসেছে সে। তার রেশ এখনো ঠোঁটে মুখে! আমাকে পেয়ে মনে হলো রক্তের কোনো আত্মীয়। শুরুতে আমাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলো কোন দেশ থেকে এসেছি আমি। সুমাইয়া তৃপ্তির সঙ্গে বলে- ভালোই হলো, তুমিও মঙ্গোলিয়ান রক্তের! তোমাকে বলা যায়।

সুমাইয়া বলে- দ্যাখো, আমার বয়ফ্রেন্ডটি বলছে, আমিও নাকি চেঙ্গিস কিংবা হালাকু খানের মতই দজ্জাল এবং হিংস্র! আমি তাকে পাল্টা বলে দিয়েছি- তোমরাই আসলে হিংস্র! পৃথিবীর সর্বত্র তোমরা মারপিট করে প্রভুত্ব করো। এই আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানরা আমাদেরই অর্থাৎ মঙ্গোলিয়ান বংশোদ্ভুত। তোমরা এদের কচুকাটা করে নির্বংশ করেছো!

নৃতাত্ত্বিক বিশ্লষণে পৃথিবীর প্রধান তিনটি জাতিসত্ত্বা। মঙ্গোলিয়ান, ককেশিয়ান এবং নিগ্রো অর্থাৎ আফ্রিকান। মঙ্গোল রক্ত মঙ্গোলিয়া থেকে শুরু হয়ে জাপান, চায়না, ইন্দোনেশিয়া, মালয়, থাই, বার্মা হয়ে ভারত থেকে চলে গেছে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত।

এমনকি উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার অধিবাসীরাও মঙ্গোল রক্তের। এই প্রথম জানলাম সুমাইয়ার কাছেই। রেড ইন্ডিয়ানদের রক্তে ককেশিয়ান অস্তিত্ব না থাকলেও মঙ্গোল অস্তিত্ব বেশিরভাগ মাত্রায়। এমন কি মেরু অঞ্চলের এসকিমোরাও মঙ্গোল রক্তের! সুমাইয়া আমার কিছু জানা, কিছু অজানা এ তথ্যগুলো এক নিশ্বাসে বলে যায়।

মধ্যযুগ অর্থাৎ কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার, গত কয়েক শতাব্দি স্পেইন এবং ইউরোপের সাঁডাশি আক্রমণ সত্ত্বেও উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় মঙ্গোলিয়ান আদিবাসীর সংখ্যা সাত কোটির বেশি। কবে, কখন এই জনগোষ্ঠীর আগমণ ঘটেছিল? আজ থেকে ৫০ হাজার বছর আগে!

১২২১ সালে ভারতবর্ষে চেঙ্গিস খানের আক্রমণ ছিলো কেবল আনুষ্ঠানিক। এরও কয়েক হাজার বছর আগে থেকে মোঙ্গলরা এই অঞ্চলে ঘোড়া হাঁকিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রাখতো। সর্বশেষ মোঙ্গল আক্রমণ ঘটে ১৩২০ সালে।

এই মধ্যবর্তী সময়ে চেঙ্গিস খান স্থাপন করেন বিশাল সাম্রাজ্য। তাকে বলা হতো খানেদের খান! হালাকু খান চীনে, কুবলাই খান ইরানে দাপটে শাসনকাজ পরিচালনা করেন। তৈমুর লং শাসন করেন ভারত থেকে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত। তিনিও ছিলেন চেঙ্গিসের উত্তরসূরি। সিল্ক রোডের উপর বাণিজ্যিক আধিপত্য স্থাপন করে ইউরোপ ও এশিয়ার যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন।

খান বংশের মানুষ এখনো আমাদের আশেপাশে। এদের রক্তে নিশ্চয়ই চেঙ্গিস খানের ডিএনএর প্রভাব বেশি। সুমাইয়াকে বললাম- আমার স্ত্রীও ‘খান’। চেঙ্গিস, হালাকু, কুবলাইয়ের রক্তের উত্তাপ আমিও টের পাই।

সর্বশেষ সুমাইয়ার প্রশ্ন ছিলো- তুমি কি কখনো মঙ্গোলিয়া গেছো? তাকে বললাম- না, আমি যাইনি। তবে ১৯৯৯ সালে চায়না ভ্রমণের সময় মহাপ্রাচীরের উপর দাড়িয়ে অপলক নয়নে চেয়ে থেকেছি ওপারে মঙ্গোলিয়ার দিকে। আর মনে মনে ভেবেছি- মাত্র ৩২ লাখ লোকের, ঘাস আচ্ছাদিত বিরানভূমির একটি দেশ কী করে প্রায় অর্ধেক পৃথিবীকে শাসন করলো?

সুমাইয়া আমার মুখের উপর আঙ্গুল নেড়ে বলে- পৃথিবীতে শাসন করতে বেশি মানুষের দরকার নেই, সেটা বুঝো? সাহস লাগে, সাহস! আমিও বলি- তোমাদের কারনেই চীনা শাসকরা ২১ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছিলো সেই সপ্তম শতাব্দি থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দি পর্যন্ত! সুমাইয়ার কোনো ধর্ম নেই, যেমন নেই মঙ্গোলিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের! কিন্তু সুমাইয়ার কথাগুলো হয়তো আমার কানে বাজবে অনেকদিন।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]