রবীন্দ্রনাথের পাত্রী দেখার গল্প

‘‘এমন সময়ে ঘরে এসে বসলেন দুজন অল্পবয়সী মেয়ে। একটি নেহাৎ সাদাসিদে, জড়ভরতের মতো এক কোণে বসে বসে রইলো; আর একটি যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে।চমৎকার স্মার্টনেস। একটু জড়তা নেই, বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজায় ভালো-তারপর মিউজিক সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো। আমি ভাবলুম এর আর কথা কি? এখন পেলে হয়।-এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের সঙ্গে। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, হিয়ার ইজ মাই ওয়াইফ আর জড়ভরতটিকে দেখিয়ে ‘হিয়ার ইজ মাই ডটার’…আমরা আর করবো কি, পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করে রইলুম; আরে তাই যদি হবে, ভদ্রলোকদের ডেকে এনে নাকাল করা কেন?’’

কথাগুলো বলেছেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর গল্পটা তাঁর নিজের জন্য বিয়ের পাত্রী দেখতে যাওয়ার। অননুকরণীয় রসবোধে এই গল্প বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একবার ভাবাই যেতে পারে সেদিনের সেই ভগ্নহৃদয়ের যুবক রবীন্দ্রনাথের কথা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন মংপুতে। মৈত্রেয়ী দেবী একদিন শুনতে চেয়েছিলেন কবির বিয়ের গল্প। আর তাতেই পর্দা উঠলো এমনি এক রসিকতাময় বাস্তব কাহিনির উপর থেকে। ভাবা যায়, সেদিন রবীন্দ্রনাথ প্রকৃত কন্যার বদলে পছন্দ করে ফেলেছিলেন হবু শাশুড়িকে!

রবীন্দ্রনাথের সেই কন্যাটি ছিলেন তখনকার মাদ্রাজবাসী।বাবা ছিলেন জমিদার। মেয়েটি তখনই সাত লক্ষ টাকার উত্তরাধিকারিণী ছিলেন।সেই ঘটনাটির সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী ছিলেন আরো কয়েকজন স্বজন।

নিজের এই নাকাল হওয়ার স্মৃতি বলতে গিয়ে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ‘এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়। যা হোক, হলে এমনই কি মন্দ হত! মেয়ে যেমনই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্য এ হাঙ্গামা করতে হতো না। তবে শুনেছি সে মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়। তাই ভাবি ভালোই হয়েছে, কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত।’

এই রসময় গল্পের ভেতরে বেশ কয়েকটি তথ্যও কিন্তু লুকিয়ে আছে। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, সেই বয়স্ক ধনাঢ্য মানুষটির স্ত্রী ও কন্যার বয়স ছিলো প্রায় এক। এই তথ্যটুকু বিশ্লেষণ করলেই বুদ্ধিমান পাঠক অনেক কিছুই বুঝে যাবেন। এখানে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী এবং অর্থনৈতিক সংকটের একটি চিত্রও পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ নিজেই জানাচ্ছেন সেই মেয়েটি তার বিয়ের দু’বছরের মাথায় বিধবা হয়েছিলো। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কোন কারণেই হোক তিনি সেই পাত্রীটিকে স্মতি থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। তার খবর কোনো সূত্রে কবির কাছে এসেছিলো অথবা তিনি নিজেই খবর নিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই ঘটনাটি নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েননি ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি রীতিমত পত্রিকায় লিখে স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি তখনকার ভারতী পত্রিকায় ‘যৌতুক কি কৌতুক’ নামে একটি কাহিনি কাব্য রচনা করেছিলেন। বলাই বাহুল্য সেই কাহিনি কাব্যের মূল বিষয় ছিলো রবীন্দ্রনাথের পাত্রী দেখতে যাওয়ার ঘটনাটি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, মৈত্রেয়ী দেবী
ছবিঃ বাংলা লাইভ ডটকম কলকাতা