রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঃ বাঙালির প্রেরণার প্রধানতম উৎস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

‘‘আমি হিন্দু’ ‘আমি মুসলমান’
একথা শুনতে শুনতে কান ঝালা-পালা হয়ে গেলো। কিন্তু আমি মানুষ একথা কাহাকেও বলতে শুনি না। যারা মানুষ নয়, তারা হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক, তাদের দিয়ে জগতের কোন লাভ নেই।’’

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রতিধ্বনি চৈত্র ১৩৭৭)

জীবনের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনের দিকে ঝুকে উপুড় হয়ে লিখতেন।একদিন তাঁকে ওভাবে উপুড় হয়ে লিখতে দেখে তার এক শুভাকাঙ্ক্ষী বললেন; আপনার নিশ্চয় ওভাবে বসে লিখতে কষ্ট হচ্ছে।বাজারে এখন অনেক চেয়ার আছে সেগুলোতে আপনি হেলান দিয়ে বসে আয়েশের সাথে লিখতে পারবেন, ও রকম চেয়ার আনিয়ে নিতে পারেন। লোকটার দিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকিয়া রবীন্দ্রনাথ জবাব দিলেন,‘তাত পারি তবে কি জান এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি লেখা বেরোয় ?পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় করতেই হয়।’ রসিক চিরকালের তিনি।

১৮৯০ সালে পূর্ববঙ্গে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরপর টানা প্রায় ১০ বছর (১৮৯০-১৯০০) রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে জীবন অতিবাহিত করেছেন, গ্রহণ করেছেন নানা কর্মোদ্যোগ, প্রতিষ্ঠা করেছেন অনেক প্রতিষ্ঠান। জমিদারির কাজেই তিনি প্রথম শাহজাদপুরে আসেন, ১৮৯০ সালে। শাহজাদপুর (রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ব্যবহার করেছেন সাজাদপুর বানান) তখন পাবনা জেলার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ মহকুমার একটি থানা—একেবারে নিভৃত পল্লি। চারদিকে নদ-নদী—করতোয়া, বড়াল, গোহালা, হুড়োসাগর—অদূরেই বিশাল চলনবিল। নিভৃত এই উদার প্রকৃতিতে এসে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল প্রতিভা যেন পেয়ে গেল নতুন রসদ।

শাহজাদপুরের জনপদ ও ভূপ্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতায় রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। শাহজাদপুর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এখানকার দুপুর বেলাকার মধ্যে বড়ো একটি নিবিড় মোহ আছে। রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের বিশেষত কাকের ডাক, এবং সুদীর্ঘ সুন্দর অবসর—সবসুদ্ধ জড়িয়ে আমাকে ভারি উদাস ও আকুল করে।’ (ছিন্নপত্র)। এই উদাস ও আকুল করা ভূপ্রকৃতিই শাহজাদপুর পর্বে রচিত রবীন্দ্র-সৃষ্টিশীলতায় নিয়ে এসেছে দার্শনিকতার ঋদ্ধি। শাহজাদপুর মানুষের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করেছে কবি রবীন্দ্রনাথকে। সোনার তরী কাব্যের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

‘এইখানে নির্জন-সজনের নিত্যসংগম চলেছিল আমার জীবনে। অহরহ সুখদুঃখের বাণী নিয়ে মানুষের জীবনধারার বিচিত্র কলরব এসে পৌঁচচ্ছিল আমার হৃদয়ে। মানুষের পরিচয় খুব কাছে এসে আমার মনকে জাগিয়ে রেখেছিল। তাদের জন্য চিন্তা করেছি, কাজ করেছি, কর্তব্যের নাগ সংকল্প বেঁধে তুলেছি, সেই সংকল্পের সূত্র আজও বিচ্ছিন্ন হয়নি আমার চিন্তায়।’

জীবনের শেষ দিনগুলোয় একাধিক অসুখ ভর করেছিলো কবিগুরুকে। নানা রকম ওষুধেও কাজ হচ্ছিলো না। সে সময় তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন। রোগ উপশমে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কবিগুরুর তাতে মোটেও মত ছিলো না। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষকে তো মরতেই হবে এক দিন। একভাবে না একভাবে এই শরীরের শেষ হতে হবে তো, তা এমনি করেই হোক না শেষ। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছেঁড়ি করার কী প্রয়োজন?’

কিন্তু তিনি যে অসহনীয় যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছেন। তার উপশমের জন্য দেহে অস্ত্রোপচার করতেই হবে বলে মত ছিলো চিকিৎসকদের। সব শেষে কবিকে রাজি করিয়ে আনা হয় কলকাতায়। আর সেটাই ছিলো রবীন্দ্রনাথের শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে আসা।

১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আনা হয় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। হাঁটার মতো অবস্থা না থাকায় স্ট্রেচারে করে তাকে দোতলায় নিতে হয়েছিলো। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপন লোক পেয়ে বেশ প্রফুল্ল ছিলেন। পরদিন ৮০ বছরের রবীন্দ্রনাথ ৭০ বছর বয়সী ভাইপো অবনীন্দ্রনাথের মাঝে অতীত দিনের নানা গল্প হয়। ২৭ জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে বলে চললেন, ‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্ত্বার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি, মেলেনি উত্তর। ’ তা টুকে রেখেছিলেন তারই এক ছাত্রের স্ত্রী রানী চন্দ। ৩০ জুলাই দুপুরের দিকে সম্পন্ন হয় কবির অস্ত্রোপচার। নিজের অসুস্থতার জন্য সৃষ্ট ভারি আবহাওয়া উড়িয়ে দিতে কবি তখনো রসিকতা করলেন, ‘খুব মজা, না?’ শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিলো অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কাউকে। সেদিন ঘুমিয়েছিলেন।

পরদিন ৩১ জুলাই যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। গায়ের তাপ বাড়ছে। ১ আগস্ট আর কথা বলেননি তিনি। অল্প পানি আর ফলের রস খেতে পেরেছিলেন। ২ আগস্ট কিছুই খেতে চাইলেন না, কিন্তু বললেন, ‘আহ! আমাকে জ্বালাসনে তোরা। ’ তাতেই সবাই খুশি। ৩ আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। ৪ আগস্ট সকালে সামান্য কফি খান। জ্বর আরও বাড়ে। ৫ আগস্ট ডা. নীলরতন বিধান রায় এসে স্যালাইন দিলেন কবিকে। অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র আনিয়ে রাখা হলো। ৬ আগস্ট বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড়। কিন্তু খিঁচুনি ছিলো, রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের অবস্থা।

২২ শ্রাবণ। কবিকে সকাল ৯টার দিকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে। দুপুর ১২টার দিকে একেবারে থেমে গেল। সেদিন জনারণ্যে পরিণত হয়েছিলো ঠাকুরবাড়ি। শোকের মিছিলে জমায়েত হয়েছিলো সবাই। সেদিন শরীরের বিদায় হলেও আনন্দে, বেদনায়, দ্রোহে এখনো বাঙালির শ্রেষ্ঠ প্রেমিক পুরুষ , রক্তমাংসের বিধাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির প্রেরণার প্রধানতম উৎস।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]