রমজান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): রোজার কোন সময়টা ক্রিটিক্যাল? অন্যদের ব্যাপার জানি না। আমার কাছে সেই ছোটবেলা থেকেই বিকাল ‘সাড়ে তিনটা’।

ঠিক এই সময় আম্মা ইফতার বানানো শুরু করতেন। আম্মার স্পেশাল ছিলো অনেক কিছুই। কিন্তু ‘ঘি সেমাই’টা ছিলো পুরাই ‘মাইরা ফালা’ টাইপ।

না খেয়ে আমি এমনিই থাকতে পারি না। ঝাল-টাল না খেয়ে থাকতে পারলেও মিষ্টি না খেয়ে থাকা আমার জন্য চুড়ান্তভাবেই অসম্ভব। সেই আমি অনেক কষ্টে রোজা রেখেছি। স্কুলে-টুলে পড়ি তখন। দুইটার পর থেকে অবস্থা বেশ মাজুল। চোখে ঘোলা ঘোলা দেখছি। গায়ে বল নাই। মনে শক্তি নাই।

ঠিক সেই সময়…সেই সময়….!!!

রান্না ঘর থেকে হাওয়ায় উড়তে উড়তে সরাসরি আমার নাকে!! আম্মা হয়তো আমার কথা মনে করেই বানাচ্ছেন। দেশি খাটি ঘি দিয়ে জান পাগল করা আম্মার হাতের ঘি সেমাই! আলতু-ফালতু দুধ সেমাই না। মাখো মাথো ঘিয়ের মধ্যে চকচকে ভেজা ভেজা ঘিয়ের আদরে জড়িয়ে থাকা লোভনীয় লম্বা লম্বা সেমাই!

আল্লাহ্..তুমি আমার আর কতো পরীক্ষা নিবা?

আজ এতো দিন পরে স্বীকার করতে দোষ নাই। আমার চুড়ান্ত পরাজয় আর রোজা হানি এই বেলা সাড়ে তিনটায়ই হয়েছিলো। আম্মা কিছু বোঝার আগেই…বাটি থেকে তুলে….মুখে চালান। আম্মা অবাক! ‘আর মাত্র ঘন্টা দুয়েক….কি করলি…’। আমি পারি নাই।

‘শয়তান’ সেদিন সেমাইরূপেই আমার ঘাড়ে ভর করেছিলো সন্দেহ নাই।

একটু বড় হওয়ার পরে বন্ধু-বান্ধব মিলে ইফতার চালু হলো। আমার জন্য হলো তা বিরাট পেইন। আমি আস্তে ধীরে খাই। খবরের কাগজে বুট-পিয়াজু-মুড়ি মাখানো নিয়া বসেছি খোলা মাঠে। সবই পর্যাপ্ত আছে বলেই মনে হলো। যেই আজান পড়েছে…মাত্র মিনিট পাঁচেক। আমি এক কি দুই বার তুলেছি। প্রথমে পিয়াজু নাই! তারপর বুট পুরাই গায়েব!!…ওদানো..বিবর্ণ এক গাদা বাদামী মুড়ি শুধু পড়ে আছে। খা..এইবার এইটাই খা।

সন্ধ্যায় বিটিভিতে ‘রমজান ইন দ্য ওয়র্ল্ড’ নামে একটা অনুষ্ঠান হতো। একেক দিন একেক দেশের রোজা..সেহরী..ইফতার…এ্ইসব দেখাতো। ডকুমেন্টারী। আমার এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে প্রিয় সিরিজগুলোর তালিকায় এটা থাকবেই থাকবে। কতো কিছু শিখেছি।

একবার মরক্কো দেখাচ্ছিলো। তারা ইফতারে একটা বিশেষ পেস্ট্রি জাতীয় খাবার খায়। ময়দার সঙ্গে কাঠ বাদাম…বাদাম…মধু মিশিয়ে এই খাবার বানানো হয়। এটা ইফতারে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার।

মিশরে সেই খেলাফত আমল থেকে রমজান মাসে লন্ঠন জ্বালিয়ে রাখে মানুষ। ঘরে, মসজিদে, দোকানে..রাস্তায়। তুরস্কে..আরব আমীরাতে দেখেছি বাচ্চারা হ্যালোইনের মতো দল বেঁধে গান করে ঘরে ঘরে যায়। মিষ্টি….চকলেট সংগ্রহ করে।

ইন্দোনেশিয়ায় কোথাও কোথাও মানুষ রমজানের আগের দিন ঝর্নার জলে বিশেষ গোসল করে। নিজেকে পবিত্র করে। ইরাকে ইফতারের পরে অনেক মানুষ জড়ো হয়। রিং লুকিয়ে রাখার বিশেষ ধরনের এক খেলা খেলে। মজা করে তেতুলের শরবত আর মিষ্টি খায়।

আলবেনিয়ায় রোমা মুসলিমরা তাদের ঐতিহ্যবাহী গান গেয়ে রোজা শুরু আর শেষ করে।

ধর্মকে যারা কৌষ্ঠকাঠিন্যসম জ্ঞান করেন তারা সম্ভবত ছোটবেলায় ‘রমজান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ দেখেন নাই। কিংবা মানুষই দেখেন নাই। দেখেছেন শুধু প্রানহীন কিছু অক্ষর। সময় কিন্তু শেষ হয় নাই। চেষ্টা এখনো করা যায়।

কানাডায় আছি নয় বছর। এখানকার প্রতিটি মসজিদে ইফতারতো থাকেই সঙ্গে থাকে রাতের ফুল ডিনার। আমি আর আমার পুত্র সুযোগ পেলেই কোন একটা মসজিদে ঢুকে যাই। একেক মসজিদ একেক দেশের মানুষ চালায়। টরন্টোতে দুইশ’র বেশি জাতীর মানুষ আছে। আমার বৈচিত্রের তাই অভাব হয় না। ছেলের নেশার মতো হয়ে গেছে। রমজান শেষ হলেই বলবে…‘আবার অপেক্ষা এগার মাস!’

ছন্দ রোজা রেখে কোথাও যেতে চায় না। বাসায়ই থাকে। তাকে প্রলুব্ধ করার জন্য উচ্ছসিত গলায় আমার ইফতার অভিযানের গল্প বলি। সে শোনে। কিছু বলে না।

আজকে হঠাৎ আমার কাছে এসে বললো….

‘বাংলাদেশ ছাড়া রোজার মাস হয় না। সেই সন্ধ্যার আজান..আজানের অপেক্ষা..কল্যানপুরের ডাইনিং টেবিল ঘিরে সবাই…তুমি অফিস থেকে ফিরলে…হালিম বা জিলাপী…সেহরীর সময়…আশেপাশের বাসার আলো..মানুষের শব্দ…..হয় না।…’

আমি বুঝলাম এই ‘নাই রোগের’ চিকিৎসা আমার জানা নাই!

ছবি:গুগল