রসময়গুপ্ত এবং আমরা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্বরূপ সোহান (লেখক)

– নতুন কিছু আছে? – নাই কিছু… – ক্যান? এই সপ্তাহে কিনো নাই কিছু… – আর কি কিনুম, যাই কিনতে যাই কমন পরে…তোমরা যেগুলা দাও, সেইগুলাও পুরান মাল, নীলক্ষেত তো চাষ করা শেষ… আসলেই তাই। পুরো এক স্যুটকেস ভর্তি কয়েক’শো চটির দিকে অসহায়ের মতো আমরা দুই বন্ধু তাকিয়ে আছি। মন খারাপ। নতুন কালেকশন নাই। রসময়গুপ্ত কি মারা গেলো নাকি পাহাড়তলী প্রকাশনী বন্ধ? আহা, সেই সব দিন! তিন দশক তো হবেই। সবে কৈশোর পার হচ্ছি। শরীরটা কেমন যেনো বদলাচ্ছে। বয়োসন্ধি ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে শরীরটাকে। তীব্র যৌনতার ডাক। কিন্তু সে তো নিষিদ্ধ ডাক। অঞ্জনের গান শুনি আর ভাবি, ‘বাড়ছে না বয়স, পনেরো’তে এসে গেছে আটকে’। সত্যজিৎ , সমরেশ বা তিন গোয়েন্দা দিয়ে আর হচ্ছে না। এমনকি মাসুদ রানা বা ওয়েস্টার্ন থেকে শুরু করে সুনীলের এক আধ লাইন। নাহ, মন ভরছে না। আরো কিছু চাই। সেই চাওয়াটাই নীলক্ষেতে ফুটপাতের বইয়ের দোকানের মামার কাছে। ‘মামা আছে?’ সেই একই কোড প্রতিবার, সপ্তাহে দুই দিন তো বটেই। কোডের কোনো উত্তর নেই।

নির্বিকার ভাবেই পুরোনো খবরের কাগজে মুড়িয়ে মামার এগিয়ে দেয়া। কৈশোরের ভয় কাটিয়ে ইতিউতি তাকিয়ে মোড়ানো খবরের কাগজটা হাতে নিয়েই জোর হাঁটা । রসময় গুপ্তের বাংলা চটি। পাতা ওল্টালেই কয়েকটি ছবি আর রগরগে গল্পে ঠাসা আমাদের কৈশোরের চটি সাহিত্য। কোনটাকে সাহিত্য বলছেন দাদা? যৌনতায় ঠাসা, নোংরা ভাষায় দুর্বল বাক্যে ভরা অথচ প্রবল নেশার চটিতে কি আদৌ কোনো সাহিত্যমান থাকতো? হয়তো , আবার হয়তো না। সাহিত্যমান বিচারেরে দায় তো আমার মতো উঠতি কিশোরদের না। তবে এটা হলপ করে বলাই যায়, সাহিত্যমান থাকুক আর নাই থাকুক, তখনকার সময়ে যারা মান নির্ধারণ করতেন তাদের অনেকাংশই রসময়ের রস আস্বাদন করা মিস করেননি। সে যাক। এখানে তো বড়দের চটির নেশা নিয়ে কথা পাড়তে বসিনি। বরং চটি কিনে পড়ার পর কি করতাম সেই গল্পটা বলি।

আমাদের পনেরোতে আটকে থাকার সময়টায় সবচাইতে বড় সমস্যা ছিলো নিষিদ্ধ কিছু লুকিয়ে রাখার জায়গার অভাব। বাসায় গোপন জায়গা বের করা খুব মুশকিল তখন। আমাদের বন্ধুদের নিজের শোবার ঘর তখন হাতে গোনা কয়েকজনের থাকতো। তাই বাসায় লুকিয়ে চটি পড়লেও কোথায় বস্তুটি লুকিয়ে রাখা যায় সেটা নিয়ে আমরা থাকতাম গভীর দুশ্চিন্তায়। আমি নিজে বাসায় ধরা না খেলেও, আমাদের অনেক বন্ধুই অসহায়ের মতো খেতো ধরা। ফলাফল, বেদম মার। কখনো বাবা, কখোনো মা। এই মুশকিলটা আসান করে দিলো আমার এক বন্ধু। রীতিমতো স্যুটকেস যোগাড় করে আমাদের কেনা সব চটি বই পড়ার পর তার স্যুটকেসে জমতে থাকলো। তার নিজের শোবার ঘর থাকার সুবাদে সেই স্যুটকেস আমরা চালান করে দিতাম তার খাটের নীচেই। আর এভাবেই আমাদের সব বন্ধুদের পড়া চটি বই জমতে জমতে সে এক বিশাল কালেকশনে পরিনত হলো। স্যুটকেস উপচে পড়ার মতো অবস্থা।

এতে আবার সুবিধাও হলো আমাদের বন্ধুদের। যাদের হাতে দশ টাকা নেই নতুন চটি কেনার , তারা হামলা চালাতো ঐ স্যুটকেসে। এক ধাক্কায় স্যুটকেস কিছুটা খালি হয়ে যেতো। আবার কয়দিন পরে ভরে উঠতো। এভাবেই চলেছে আমাদের নিষিদ্ধ নেশা। নীলক্ষেত থেকে একবার একটা চটি কেনা হয়ে গেলে সেটা ‘মামা’ কে ফেরত দেয়া মুশকিল ছিলো। কোনো কারনে যদি গল্পটা রিপিট থাকতো অথবা মনের মতো না হতো তাহলে ধরা। কারন আমাদের বয়স কম হওয়ায় নীলক্ষেতের মামা খবরের কাগজে মুড়িয়ে যা দিতো তাই নিয়ে আমরা সটকে পড়তাম। কারন কয়েকদিন পর পরই পুলিশ রেইড দিতো। তাই ভরা দিনের বেলায় দেখে বুঝে কেনার কোনো উপায় ছিলো না আমাদের। এই প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমার এক বন্ধু ‘মামা’ কে ফরমায়েশ দিলো, ‘মামা ভালো পিকচার যেনো থাকে’। যথারীতি মামাও খবরের কাগজে মুড়ে ধরিয়ে দিলো আমার বন্ধুকে। বিপত্তিটা হলো বাসায় ফেরার পর। মহাউৎসাহ নিয়ে যখন আমার বন্ধুটি চটিটা খুললো, তখন সে হতাশ। ভালো ছবি তো দুরের কথা, একটা ছবিও নেই। পুরা ধরা খাওয়া যাকে বলে। দশটা টাকাই লস। ফেরত দেওয়ারও উপায় নেই। মন খারাপের মাঝেই তার চোখ আটকে গেলো এক জায়গায় হঠাৎ করেই। যে খবরের কাগজ দিয়ে মামা চটিটা মুড়িয়ে দিয়েছিলো, সেই দুমরানো কাগজেই আমাদের ঢাকাই ছবির বিশালবক্ষা এক হট নায়িকার অর্ধনগ্ন ছবি। সূক্ষ হাসি ফুটে উঠলো আমার বন্ধুর ঠোঁটে। যাক লসের আফসোসটা আর নেই।

রসময় গুপ্ত মোটামুটি একাই রাজত্ব করেছেন চটি সাহিত্যে। তাই তার নামের জয় জয়কার এখনো আমাদের প্রজন্মে। কিন্তু আর কি কেউ ছিলেন না? ছিলেন। আরো কয়েকজনের লেখা চটি নীলক্ষেত, ফার্মগেট, পল্টন, মিরপুর আর বাংলাবাজারের ফুটপাতে পাওয়া যেতো বৈকি। সবার নাম মনে না পরলেও একজনের লেখা খুবই জনপ্রিয় ছিলো তখন। নাম দই মহাশয়। রসময় গুপ্ত আর দই মহাশয়ই ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তারা কে, কোথায় থাকেন, আসল নাম নাকি ছদ্ম নাম এসব নিয়ে চলেছে বিস্তর গবেষনা। শুধু তাই নয়, চটি ছাপা হতো কোথায়, পাহাড়তলী প্রকাশনী কি ঢাকায়, চট্টগ্রামে নাকি কলকাতায় এগুলো আজো আমাদের প্রজন্মের কাছে রহস্যই থেকে গেছে। আমার দুই বন্ধুর বদ্ধমূল ধারনা ছিলো, পাহাড়তলী প্রকাশনীর অবস্থান কলকাতায়। রহস্য মীমাংসায় বাজী ধরে তারা কলকাতা পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলো। কোলকাতায় চটির ডিপো বাগুইআটি গিয়ে ঘটেছে আরেক চমকপ্রদ ঘটনা। ঘটনাটা এরকম, এক বন্ধু চটি দেখছে, আরেক বন্ধু দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বেশ কিছুক্ষন পর অপেক্ষারত বন্ধুটি বিরক্ত হয়ে ঝাড়ি দিয়েছে। ‘ একটা চটি দেখে কিনতে তোর এতক্ষণ লাগে?’ বন্ধুটির জবাব, কি করবো, পুজা সংখ্যা তো। চটি বই মোটা আকারে বের হয়েছে। দেখতে তো সময় লাগে।’ এই গল্প শুনে তো আমরা অবাক। কোলকাতায় দেশ, আনন্দবাজারের মতো চটিরও পুজা সংখ্যা বের হয়। আহা! আমাদের ঢাকায় যদি ঐসব পুজাসংখ্যার সঙ্গে চটিরও মোটা পুজাসংখ্যা আসতো। কি আফসোসই না হয়েছিলো তখন আমাদের। আর ঐ পুজাসংখ্যাও বেরিয়েছিলো সেই পাহাড়তলী প্রকাশনী থেকে, যার অবস্থান আমাদের প্রজন্মে এখনো অজানাই থেকে গেলো।

আজ তিন দশক পর এই পরিনত বয়সের বাস্তবতা, চারদিকে অন্তর্জালে মোড়া বিভিন্ন সাইটের চলমান দৃশ্যে হারিয়ে গেছে আমাদের কৈশোরের খবরের কাগজে মোড়া চটি সাহিত্য। আজকের পনেরো বছরের কৈশোর, বয়স কেনো, কোনো কিছুতেই আটকে নেই। তাদের আছে মুঠোফোন। সেখানে আছে ফেসবুক, ইন্সটা, ইনবক্স আর পর্নোগ্রাফি। স্বীকার করছি পর্নোগ্রাফী ছিলো সেই সময়টাতেও। তবে তা ছিলো ভিডিও ক্যাসেটে । সহজলভ্য ছিলো না সেটা আমাদের মতো কিশোরদের জন্যে। আর তাই হয়তো পনেরো থেকে বিশ মাত্র এই পাঁচটি বছরই আমাদের প্রজন্মে যৌনতা, যৌনচিন্তা একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে। আমাদের প্রজন্মে বিশ বছর বয়সের পরে তা জীবন থেকে সরে গিয়ে জীবনের অন্য সব কঠিন বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে আমাদের প্রজন্মে অন্তত আমরা বন্ধুরা চটি সাহিত্যই হোক অথবা অন্য কিছু, নিজেদের মধ্যে সেটা আলোচনা বা শেয়ার করতাম।কিন্তু এই সময়টায় মুঠোফোনে পর্নোগ্রাফি একেবারেই নিজস্ব। এই নিজস্বতাই এই প্রজন্মের ক্ষতটা হয়তো বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেজন্যই কি এই প্রজন্ম এতোটা অস্থির? ভিজ্যুয়াল মাধ্যম কি অস্থিরতা এনে দিচ্ছে, যৌনতার ভুল বার্তা দিচ্ছে? সঠিক যৌনশিক্ষা আমাদের দেশে আগেও ছিলো না, এখনো নেই। কৈশোর আর তারুণ্যে যৌনতা আসবে সেটা চিরন্তন। এর কোনো স্থান, কাল অথবা প্রজন্ম নেই। তবে ত্রিশ বছর আগের বিলুপ্তপ্রায় চটি সাহিত্য, নাকি আজকের একান্তে দেখা পর্নোগ্রাফি কোনটি ক্ষতি করছে আমাদের চারপাশকে তা হয়তো ভবিষ্যতই বলে দেবে।

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box