রহস্যময় রাসপুটিন

সাইবেরিয়ার এক চাষির ঘরের ছেলে। লেখাপড়াও তেমন শেখেননি। স্থানীয় কাগজপত্র থেকে জানা যায়, কিশোরবেলা থেকেই বেপরোয়া ছিলেন তিনি। মদ্যপান, ছোটখাটো চুরির সঙ্গেও নাম জড়িয়েছিলো। প্রায় নিরক্ষর, বিশৃঙ্খল যুবকটি ১৮৯০-এর দশকে হঠাৎই ধর্ম নিয়ে মেতে ওঠেন। বিভিন্ন মঠে, মন্দিরে ঘোরাঘুরি করতে করতে এক সময় সংসার ছাড়েন। নানান দেশ ঘুরে ১৯০৩ সাল নাগাদ এসে পৌঁছন রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। ততোদিনে নিজেকে ‘আধ্যাত্মিক গুরু’ ঘোষণা করেছেন। ভবিষ্যদ্বক্তা, মরণাপন্নকে সারিয়ে তোলার ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী তিনি এমনই পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। এই মানুষটি-ই ইতিহাসের এক খলনায়ক-রাসপুটিন।

গ্রিগরি রাসপুটিন

শোনা যায় রাসপুটিন তৎকালীন রাশিয়ার জ়ার দ্বিতীয় নিকোলাসের দরবারে পা রাখেন তার পুত্র জ়ারেভিচকে (রাশিয়ার সম্রাট বা জ়ারের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী) সুস্থ করে তোলার ঘটনার মধ্যে দিয়ে। আলেক্সেই হিমোফিলিয়ার শিকার। এ রোগে রক্তপাত বন্ধ হতে চায় না কিছুতেই। সামান্য কেটে যাওয়া অথবা আঘাত এ রোগে আক্রান্তদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এমন খবরে ভেঙে পড়েন নিকোলাসের স্ত্রী আলেকজ়ান্দ্রা। রোগের উপসর্গ তার পরিচিত। পরিণাম সম্পর্কেও তিনি জানেন। ইতিমধ্যেই পরিবারের কয়েকজন মানুষ বিদায়ও নিয়েছেন পৃথিবী থেকে।এমন রোগে আক্রান্তরা হয় বেশি দিন বাঁচে না। আর বেঁচে থাকলেও আর পাঁচটা শিশু-কিশোরের মতো তারা স্বাভাবিক হয় না। রাজপ্রাসাদে সেই শোকের দিনে আবির্ভূত হন গ্রিগরি রাসপুটিন।  সত্যিই কি জারের ছেলেকে সারিয়ে তুলেছিলেন রাসপুটিন?

এই রহস্যময় মানুষটির গোটা জীবনটাই গুজবে মোড়া থাকলেও এই একটি ব্যাপারে মোটামুটি সবাই একমত, সত্যিই সেরে উঠেছিল আলেক্সেই, এবং তা রাসপুটিনের প্রাসাদে আসার পর থেকেই। তার সম্মোহনী বিদ্যের কারণে, লাগাতার প্রার্থনা আর প্রাসাদজোড়া একটা শান্ত-পবিত্র পরিবেশ তৈরির জন্য, নাকি সাইবেরীয় চাষি পরিবার থেকে শিখে আসা জড়িবুটির কল্যাণে রোগমুক্তির ঘটনা ঘটেছিলো— তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে, চিকিৎসকেরা যে আয়ু বেঁধে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে কিছু বেশি বছর বেঁচেছিল জ়ারেভিচ, যার পুরো কৃতিত্বই রাসপুটিনের হাতে তুলে দেন অভিভূত নিকোলাস এবং আলেকজ়ান্দ্রা। তারা দুজনেই ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন রাসপুটিনের কথায়। তার ওপর ছেলেকে সারিয়ে তুলেছিলেন রাসপুটিন। তাই তাদের দরজা ছিলো রাসপুটিনের জন্য অবারিত। এই ভরসাকে কাজে লাগিয়েই রাসপুটিন নাকি ঘোষণা করেন, শিশু-সহ সমস্ত সাম্রাজ্যের ভাগ্য এখন থেকে তার সঙ্গে বাঁধা পড়লো।

মানুষের বিশ্বাসের দখল নেয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিলো রাসপুটিনের। জ্বলজ্বলে দুই চোখে, ব্যক্তিত্বে এমন কিছু মিশে ছিলো, যা তাঁকে অন্য সমস্ত সাধু-সন্তদের চেয়ে আলাদা করে দেয়। এই আশ্চর্য ক্ষমতাতেই মজেছিলেন আলেকজ়ান্দ্রা। তার সেই বিশ্বাস, ভরসা কখনও চিড় খায়নি। প্রাসাদের ভিতরে রাসপুটিনের জীবনযাত্রায় তাকে পুরোপুরি রাশিয়ার কৃষকসমাজের প্রতিনিধি মনে হলেও, প্রাসাদের বাইরে পানাসক্তি, মারামারি, ভাঙচুর, নারীসঙ্গ এবং মহিলাদের কুপ্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু বহু অভিযোগ জমা পড়লেও জ়ার রাসপুটিনের ব্যাপারে অবিচল থাকেন— সম্ভবত আলেকজ়ান্দ্রা ক্ষুব্ধ হবেন ভেবেই। রাসপুটিনের কেচ্ছার রঙিন খবর তখন উড়ছে মানুষে মুখে মুখে। শোনা যায়, ১৯১০-১১ সালে রাজপরিবারের মেয়েদের গভর্নেস আলেকজ়ান্দ্রার কাছে গিয়েছিলেন মেয়েদের শোওয়ার ঘরে রাসপুটিনের ঢোকা বন্ধ করার আদেশ চেয়ে। কারণ, ততোদিনে রাসপুটিন প্রাসাদের এক নার্সকে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন। রাজপ্রাসাদে মেয়েদের ঘরে রাসপুটিনের অবাধ প্রবেশাধিকার। তাই আলেকজ়ান্দ্রাকে নাকি সতর্ক করতে গিয়েছিলেন গভর্নেস। সম্রাজ্ঞী কানও দেননি। উলটে বরখাস্ত হন সেই গভর্নেস এবং নার্স। আরও শোনা যায়, কে বা কারা একবার মহিলাদের সঙ্গে রাসপুটিনের কিছু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি তুলে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে। কিন্তু রাসপুটিন তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বরং নিজেই সেই ছবি তুলে দেন স্বয়ং জ়ারের হাতে।

আলেকজ়ান্দ্রা ও ছেলে

এবং ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।  তাকে ক্ষমা করেছিলেন নিকোলাস। তিনি বন্ধুদের হিতোপদেশ, পুলিশি রিপোর্ট-সহ যাবতীয় প্রমাণও অগ্রাহ্য করেন আলেকজ়ান্দ্রার কথা ভেবেই। স্বাভাবিক ভাবেই প্রাসাদের বাইরে গুঞ্জন ওঠে, আলেকজ়ান্দ্রার সঙ্গে তাঁর ‘হোলি ম্যান’ রাসপুটিনের সম্পর্ক কি নিছকই আধ্যাত্মিক আদানপ্রদান, না তার চেয়েও বেশি কিছু?

রাসপুটিনকে ঘিরে এমন গুঞ্জন হয়তো আরও কিছু বছর চলতো, কিন্তু বাদ সাধলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আর তার সঙ্গেই যেন গ্রহণ লাগল জ়ার-শাসিত রাশিয়ার রাজনীতিতে। ইতিমধ্যেই জ়ারের অসীম ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য টাল খেয়েছে। তাতে শেষ পেরেক পুঁতলো এই যুদ্ধ। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিজের হাতে নিলেন স্বয়ং জ়ার। প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। কেউ বলেন, এই প্রস্তাব রাসপুটিনের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। আবার কেউ বলেন,  রাসপুটিন সাবধানই করেছিলেন জ়ারকে। বলেছিলেন, এই লড়াইয়ে জড়ালে রাশিয়ার সর্বনাশ কেউ ঠেকাতে পারবে না। প্রস্তাব যারই হোক, নিকোলাস প্রাসাদ ছাড়ার পরই অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর দায়িত্ব হাতে তুলে নেন আলেকজ়ান্দ্রা আর তাঁর পরামর্শদাতা, রাসপুটিন। দ্বিতীয় জনেরই অঙ্গুলিহেলনে যোগ্য মন্ত্রীরা পদচ্যুত হন, ক্ষমতায় আসেন কিছু অপদার্থ মানুষ।

রাশিয়ার অর্থনীতির তখন ভয়ঙ্কর অবস্থা। এক দিকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, অন্য দিকে বড় বড় শহরগুলোতেও মানুষের হাতে খাবার নেই, প্রচণ্ড ঠান্ডায় গায়ে দেওয়ার কম্বল নেই, আগুন জ্বালানোরও কিছু নেই। রাজপরিবারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তুঙ্গে। একে তো যুদ্ধে রাশিয়ার শত্রুপক্ষ জার্মানি দেশটার সঙ্গে জন্মসূত্রে যোগ রয়েছে আলেকজ়ান্দ্রার, তার ওপর এই ভয়াবহ যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তার উৎসাহ ছিলো সবচেয়ে বেশি। ফলে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে অভিজাতদের একাংশও ক্ষিপ্ত হলেন আলেকজান্দ্রার উপর। তবে, রাগের তিরটা ছিল রাসপুটিনের দিকে। রাজপরিবারের ওপর রাসপুটিনের প্রভাব কখনও সমর্থন করেননি অভিজাতরা। শুরু হল ষড়যন্ত্র।

কিন্তু রাসপুটিন ছিলেন অপরাজেয় এক মানুষ। এর আগেও এক পতিতা তাকে ভয়ঙ্কর ভাবে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিল। তাতেও সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তারপর  এলো ১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাস। ওই রাতেও ঠিক কী হয়েছিল, পুরো স্পষ্ট নয়। বলা হয়, রাসপুটিনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অভিজাতরা তাকে ওই দিন নিয়ে যান এক প্রাসাদে। সেখানে তাঁকে বিষ-মেশানো খাবার আর মদ পরিবেশন করা হয়।  কিন্তু খাওয়ার বহুক্ষণ পরও দেখা যায়, বেঁচে আছেন রাসপুটিন। শরীরে বিষক্রিয়ার চিহ্নমাত্র নেই। তখন সরাসরি তাকে গুলি করা হয়। কিন্তু তার পরও নাকি তিনি বেঁচে ছিলেন। এমনকী, ওই অবস্থাতেও পালানোর চেষ্টা করেন। তারপর তাকে আবার গুলি করা হয়।  কোনও ঝুঁকি না নিয়ে দেহটি কম্বলে মুড়ে ফেলে দেওয়া হয় নদীতে।

মৃত রাসপুটিন

দু’দিন পর রাসপুটিনের দেহ উদ্ধার হয় নদীর ধারে। যে অবস্থায় নাকি দেহটি পাওয়া গিয়েছিল, তাতে মনে হয়, জলে পড়ার পরও বহু ক্ষণ বেঁচেছিলেন ‘ম্যাড মঙ্ক’। এমনকী হাতের বাঁধনও খানিকটা খুলতে পেরেছিলেন।ময়নাতদন্তে বলা হয়, রাসপুটিনের মৃত্যু হয়েছে বরফঠান্ডা পানিতে ডুবেই, যদিও শরীরে গুলির ক্ষতও ছিলো।

তবে, সারা জীবন হরেক লোককাহিনি, উদ্ভট গল্প আর অতিনাটকীয়তাকে সঙ্গী করে চলা ‘সাধু’ রাসপুটিনের একটি ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন, আলেক্সেই-সহ সমস্ত সাম্রাজ্যের ভাগ্য তার সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়লো! সত্যিই রাসপুটিনের মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে জ়ারের সাম্রাজ্য। আর বছর দেড়েকের মধ্যেই বলশেভিকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন জ়ার দ্বিতীয় নিকোলাস।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা।
ছবিঃ গুগল