রাই কিশোরীর সুরের যাদুতে…

শিলা চৌধুরী: কীর্তন পদাবলী লোকজন একটা সময় প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।তা আবার শুনতে আর গুনগুন করে গাইতে শুরু করেছে তার নিজস্ব গায়কীর কারণে ।শুধু তাই নয় আজকাল নুতন প্রজন্ম ও গান শোনার ভোল বদলে ফেলেছে যার জন্যে তিনি আর কেউ নন গুরু কালিকাপ্রসাদের ছাত্রী অদিতি মুন্সী ।হরি নাম সংকীর্তনের নতুন নক্ষত্র। জনপথে এককালে শ্রীচৈতন্য যা করতেন তিনিও এখন তাই করেন তাঁর গানের রকবাজিতে টিনএজ গিটার ধরার মত অঙ্গ ভঙ্গির সঙ্গেই হাত তুলে হরি বল, হরি বল করেন। ৫০০ বছরেরও প্রাচীন ট্র্যাডিশনকে একেবারে ভেঙে চুরে নতুন রূপ দিয়ে দিলেন অদিতি। আর এখানেই তাঁর মুন্সীয়ানা।  কৃষ্ণ প্রেম অদিতির কাছে সুরের বন্দনা। একেবারে ঘরোয়া আমেজ , মাটির সৌরভ আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছেন অদিতি। মঞ্চে যখন অদিতি ‘লাজে মরেন, তখন তাঁর প্রেমেই উন্মাদ হয় আট থেকে আশি।অদিতি এখন রীতিমত স্টার ।যদিও অদিতির কথায়- যদি স্টার হতাম তাহলে আমি পায়ে হেটে ঘুরে বেড়াতাম না। যদি আমি স্টার হতাম তাহলে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা একটা ব্যারিকেটের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতাম। কিছুই তো আমি করি না, তাহলে স্টার কীসের? আমি সাধারণ মানুষ ।পরিবর্তন যদি বলেনই, তাহলে বলবো আমাকে যদি আগে ১০টা মানুষ ভালোবেসে থাকতো, এখন ১০ হাজার মানুষ আমাকে ভালোবাসেন। মঞ্চ আমাকে অনেকটা পরিচিতি দিয়েছে।একজন শিল্পী, সৃষ্টিশীল মানুষ ও  সাধারণ হন? অদিতির কথায় আমার মনে হয় যে মানুষ শিল্পী, সৃষ্টিশীল সে শিল্প মাসিকতা নিয়েই জন্মান। সেই জন্যই তাঁরা ওমন শিল্পী হতে পারেন, শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন। তবে নতুন অদিতিকে খুব এনজয় করছি। আমি কিন্তু সাধারণ।গান আমার নেশা।

সঙ্গীতম, আমার ড্রিম প্রজেক্ট। আমি ওকে নিয়েই স্বপ্ন দেখি। জানি না কতটা কী করে উঠতে পারব, তবে সঙ্গীতমকে নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখি। সঙ্গীতমের স্বপ্নপূরণের জন্য আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দেব।

অদিতি তো ইতিমধ্যেই উজাড় করে দিয়েছেন তার সংগীত ভান্ডার । আর এটা এপারেই শুধু নয়, অদিতি তো এখন ওপারের বাংলা তেও তার সুরের যাদুতে মোহিত করেছেন আট থেকে আশির শ্রোতাদের ।বাংলাদেশের চট্টগ্রামের জাতীয় গীতা শিক্ষা কমিটি আমাকে ব্র্যান্ড আম্ব্যাসেডর করেছে। এটা আমার কাছে বড় রকম পাওয়া। আমি প্রথম যখন ওখানে যাই আমি জানিই না যে ওরা আমাকে এইভাবে সংবর্ধনা দেবে। একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল আমার। আমি যখন চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামলাম, দেখলাম অনেক মানুষ একটা বিশাল ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি ভাবলাম, বাহ্‌ কোনও ভিআইপি টিআইপি এসেছে হয়তো।  ভিআইপি হলে কত স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট। তো স্বাভাবিক ভাবেই ভাবলাম গোটা প্লেন খালি হয়ে যাক তারপর নামব। গোটা প্লেন খালি, তবুও লোকগুলো যাচ্ছে না। আমি ভাবলাম এখনও তাঁরা দাঁড়িয়ে মানে পাইলটকে হয়ত উইশ করবে। বা, কিছু একটা ব্যাপার আছে। তারপর যখন নামলাম, দেখছি ফুলের বুকেটা আমার জন্যই। তখন মনে হচ্ছিল যারা প্র্যাক্টিক্যালি সেলিব্রিটি হয়, যাঁদের আমারা সোনালি পর্দা রূপোলি পর্দায় দেখতে পাই তাঁদের লাইফে হয়ত পার্সোনালি কোনও প্রবলেম হতে পারে, কিন্তু ভক্তদের কাছ থেকে এমন সংবর্ধনা আমি প্রথম বার পেয়েছি।


বাংলাদেশের মানুষ আমাকে দেখতে চাইছে, গান শুনতে চাইছে, আমাকে ঘিরেই একটা সঙ্গীত বলয় তৈরি হচ্ছে,সে  অনুভূতি  ব্যক্ত করার ভাষা নেই আমার । আমার বয়সী, কিংবা আমার থেকেও ছোট বয়সীরা যখন আমার কীর্তন শুনে হাত তুলে হরি বল হরি বল বলছে, এটা  আমি বলে বোঝাতে পারব না। আমার কাছে এমন কোনও শব্দ নেই যা দিয়ে আমি  আমার অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারবো।আরও বলেন,অদিতি তো এখন রাই কিশোরীও। আমি কিন্তু অদিতি হয়েই পুরো বিষয়টা এনজয় করেছি। মঞ্চে  অদিতির গান  কিন্তু শ্রোতার কাছে রাই কিশোরীর প্রেমরাগ!

অদিতি-র মতে, মঞ্চে আমি যখন থাকি, মাইক্রোফোন যখন আমার হাতে, সামনে অডিয়েন্স তখন কোথা থেকে কী হয় আমি একেবারেই জানি না। আমি কী বলি, কী গাই, সেটা হয়ত আমার হাতে থাকে না। আমি প্ল্যানিং করে যাই ঠিকই, কিন্তু গুরুবন্দনা করে আমি যখন মঞ্চে উঠি তারপর থেকে কীভাবে আমি এগোই আমি জানি না। আমার গান গেয়ে আমি খুব আনন্দ পাই। ‘এসো মা লক্ষ্মী’, ‘বৃন্দাবন বিলাসিনী’, ‘ছি ছি লাজে মরে যাই’ এই গানের রিকোয়েস্টগুলো যখন আসে তখন মনে হয় আমি আমার গান গাইছি। পদকর্তা যেই হন, তবে আমি গেয়েছি এই গানটা। এটা ভীষণরকম ভালোলাগা। তবে আমি অবশ্যই বলব অভিজিৎ দা, কালিকাদা, দোহার এবং অবশ্যই জি-এই জায়গাটা তৈরি করেছে, আমার একার কিছু নয়।

বাস্তবের রাই কিশোরীর কৃষ্ণ কে গানেই খুঁজে ফেরে কারন খুব সিলেক্টিভ বন্ধু বান্ধব অদিতির ।বলেন,কৃষ্ণ দর্শনই এখনও পেলাম না।যদি ও রাইকিশোরী গাইছে, ‘মিলন হবে কত দিনে?’ ‘আমি কোথায় পাব তাঁরে, আমার মনের মানুষ যে রে?’
গানের সঙ্গে  সম্প্রতি, অ্যান্টি ড্রাগ প্রচারে অদিতি  নিজেকে যুক্ত করেছে,প্রচার অভিযানে অদিতি প্রধান মুখ।আর সাথে শখের  ফটোগ্রাফি।ছোট ভাই এই বিষয়ে অদিতির গুরু ।প্লে ব্যাকের সুযোগ আসলে অদিতির ইচ্ছে  শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে গান গাওয়ার ।পার্বতী দাস বাউলের সঙ্গে আমি কোনও দিন প্লে ব্যাক করতে চাই না। কারণ, উনি আমার একজন আইডল মানুষ। আমি ওনার গান বসে শুনতে চাই। আমি ওনার গানটা দেখতে চাই। ওনার পাশে দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার মত সাহস আমার নেই।বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে যেভাবে ফোক সং জায়গা করে নিয়েছে কীর্তনও  এক সময় স্থান পাবে। অদিতির মতে  এটা হওয়াটা অবধারিত। আজ না হোক কাল হবেই। আমি কেনও আরও যারা স্বনামধন্য শিল্পীরা রয়েছেন তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেও এই একই কথাই তাঁরা বলবেন। আমাদের জন্ম তো এখানেই। মাটি এক একটা কথা বলে। গানের প্রেজেন্টেশনটাই এখন আসল কথা। আমাদের ভিতরেই তো ফোক রয়েছে।

কলকাতা প্রতিনিধি