রাখে আল্লাহ মারে কে!

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

নতুন বাসায় ওঠার পরে যখন দেখলাম একাউন্টে মাত্র বারোশত টাকা তখন স্বভাবতই চিন্তা হচ্ছিলো।ভাবছিলাম আল্লাহ গো,কি হবে! আমার সাহেব বলেন ধুর,এতো চিন্তা কইরো না।যখন আমাদের কিছু ছিলো না তখনও আল্লাহ আমাদের ফেলে দেন নাই।এখনো ফেলবেন না ইনশাআল্লাহ ।কিন্তু প্রায় পনের বিশ দিন কোন প্রোগ্রাম নাই, ছবির গান নাই।আমি খুবই বিস্মিত হচ্ছিলাম।এমন তো হবার কথা নয়! প্রতিমাসে দশ পনেরোটা বা তারচেয়ে ও বেশি গান করি।মঞ্চানুষ্ঠান থাকে আর না হলেও গড়ে দশটা! সেখানে এমন নীরবতা, তাও আবার হাত খালি! কি যন্ত্রণা! আমার সাহেব খুবই নির্ভার। কিন্তু আমি অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। এর মধ্যেই আত্মীয় স্বজন এসে নতুন ফ্ল্যাট দেখে যান।একজন গুরুজন স্থানীয় নিকটাত্মীয় আরেকজনকে বলেছেন এতো সুন্দর করে বাসা বানাইছে, এতো সুন্দর খোলা রান্নাঘর আর রান্নাঘরের কুকিং প্ল্যাটফর্ম এ এমন এল্যুমিনিয়ামের কলস রেখেছে, এমন কেউ রাখে কখনও! যিনি বলেছেন তিনি তো বলেছেনই আর তা আবার আরেকজন আমাকে বলার জন্য কথাটা বয়ে এনেছেন। আমি স্তম্ভিত! বছর তিনেক সময় নিয়ে আবাসস্থল তৈরি করেছি যেখানে সবার অথবা অনেকের ধারণা আমরা সংসারই চালাতে পারবো না এবং তাদের কারো কারো ঘাড়ে গিয়ে পড়বো। সে ভয়ে তারা দূরে দূরে আলগা আলগা থেকেছেন খুব যত্ন করে এবং এই ক্রাইসিস সময়ে একজন মানুষ ও ( আমার বাবা-মা এর হিসাব আমি ধরিনা কারণ তাঁদের সে সামর্থ্য নাই) জিজ্ঞেস করেন নাই যে তোমাদের কোন সহযোগীতা লাগবে?কয়টা টালির পয়সা দেই অথবা একসেট পর্দা? এই পুরো কর্মকাণ্ডে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা বরেণ্য সঙ্গীত শিল্পী লিনু বিল্লাহ ভাই ও শ্রেষ্ঠতম বিউটি এক্সপার্ট গীতি বিল্লাহ ভাবী আমাদের নতুন ফ্ল্যাট এ ওঠা উপলক্ষে এমন খুব সুন্দর কার্পেট উপহার দিয়েছিলেন যা প্রায় পনেরো বছর পরেও আমার ড্রইংরুমে শোভা পায়! আর যারা কিছুই জিজ্ঞেস করেন নাই অথচ আজ আমার বাসার কলস রাখার জায়গার ভুল ধরা হচ্ছে! হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না।তবে এটুকু বুঝেছি যে যিনি ভুল ধরেছেন তার যেমন বিমাতৃসুলভ ভাবনা আর যিনি ভাবনা বয়ে আনলেন তিনিও একই পথের পথিক। মানে তাদের গায়ে অজানা কারণে অথবা বিশেষ কারণে গাত্রদাহ হচ্ছে।

ওই মাসেই আমাদের আন্তর্জাতিক প্রমোটর ও কণ্ঠশিল্পী আবু সাঈদ জাহাঙ্গীর ভাই সাউণ্ডটেকের জন্য দুইটা অডিও অ্যালবামের চুক্তি করতে এলেন। দুটোই হারানো দিনের গান।একটা মিক্সড শিল্পীর গান,আরেকটা শচীন দেব বর্মন সাহেবের গান।আমরা চুক্তিবদ্ধ হলাম এবং কিছু অগ্রিম পেলাম এবং সেই বারোশত টাকার ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পেলাম। আমার জীবন সঙ্গী বললেন তোমাকে বলেছি না এতো অস্থির হবে না কখনো! আল্লাহ একটা এ্যামিবারও রিজিক লিখে রেখেছেন এবং সেটা কখন দিতে হবে কখন রাশ টানতে হবে সেটা তিনিই জানেন এবং এটা শুধু তাঁরই ভাবার বিষয়! তোমার কাজ তুমি করে যাও।

এর মধ্যেই প্রায় পাশাপাশি সময়েই মেরিল-প্রথম আলো ২০০২ সালের জন্য পুরস্কার পেলাম এবং আরেকটি জাতীয় পুরস্কার পেলাম! আমি বিস্মিত, অভিভূত, আমার চেয়েও বেশি অভিভূত আমার জীবন সঙ্গী। জাতীয় পুরস্কারের খবর আসতেই ঘর ফুলে ফুলে ভরে গেল। সাংবাদিক ভাইয়েরা ফোনের পরে ফোন করতে থাকলেন।শ্রদ্ধেয় শাকিলা জাফর আপা একটা শাড়ি ও একটা অপূর্ব সুবাসের পারফিউম পাঠালেন। ঠিক ওইদিন আমার এক কাজিন আমাদের ল্যান্ড ফোনে ফোন করে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে তারপর বললো আপা,শুনলাম তোমার নাকি ইদানীং কাজ কর্ম নাই! এখন নাকি অমুক শিল্পী খুব ব্যাস্ত! আমি বুঝতে পারছিলাম না এমন প্রশ্ন কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় কি না! অথবা কোন দৃষ্টিভঙ্গী,কোন হিংসাপরায়ণ মানসিক অবস্থায় এমন প্রশ্ন আসে! আমি এমন কথায় সবসময়ই নিজেকে গুটিয়ে নেই কিন্তু সে যেহেতু আমার ছোট এবং সারাটাক্ষন কুনজর দেয়ার দৃষ্টিতে আমার জীবনচক্র অবলোকন করার জন্য চোখ দিয়েই রাখে তাই তাকে কষে উত্তর দেয়ার লোভ না সামলে বললাম, শোন,কে কেমন ব্যাস্ত সে হিসাব আমি রাখিনা তবে আজ আমি খুবই ব্যাস্ত।সে শুধায় কেন কেন আপা? আমি বলি আমার ঘরে অনেক সাংবাদিক,অনেক ফোন, অনেক ফুল , গিফট আর মিষ্টি কারণ আজ আমি দ্বিতীয়বারের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। সে বিস্মিত ( হয়তো দুঃখিত হিংসিত লজ্জিত ও) হয়ে বললো কোন গানের জন্য? আমি না শোনার ভান করে আস্তে করে লাইন কেটে রিসিভারটা রাখলাম। ওপাশে তখনও নিশ্চয়ই হ্যালো হ্যালো হচ্ছে!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box